banner

শেষ আপডেট ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,  ১৯:৫৯  ||   শনিবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০২১ ইং, ৩ আশ্বিন ১৪২৮

প্রশ্নপত্র ফাঁস, লক্ষ-লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সাগর-তুষার চক্র !

প্রশ্নপত্র ফাঁস, লক্ষ-লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সাগর-তুষার চক্র !

৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১০:৫১ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রশ্নপত্র ফাঁস,  লক্ষ-লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সাগর-তুষার চক্র !

বিশেষ প্রতিবেদক ::

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মাষ্টার ও ড্রাইভারশীপ পরীক্ষায় আবার অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী,সচিব ও দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের দপ্তরে জমা পড়েছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা অভিযোগ প্রাপ্তির সত্যতা স্বীকার করেছেন।
অভিযোগসুত্রে জানাগেছে, নৌখাতে যুবলীগ নেতা পরিচয়দানকারী জনৈক সাগর, তুষার ও মুন্নার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়েছেন নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী মন্জুরুল ,ক্যাপ্টেন দেলোয়ার ও ক্যাপ্টেন আহসান। এই ৩ কর্মকর্তা মাষ্টার ও ড্রাইভারশীপ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে সরাসরি জড়িত রয়েছেন।
অভিযোগের বর্ণনামতে, নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের ওই ৩ কর্মকর্তা লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরী ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহনের দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের ২ জনের চাকুরী এখনও স্থায়ী হয়নি। অপরজন প্রায় ৩ বছর প্রেষনে রয়েছেন। তারা পরীক্ষার আগের দিন মাষ্টার ও ড্রাইভারশীপ পরীক্ষার প্রশ্ন সিন্ডিকেট সদস্য সাগর ও তুষারের হাতে পৌছে দেন। তখন তারা রাজধানীর জয়কালী মন্দির এলাকার ওসমানী ইন্টারন্যাশনাল হোটেল, কাকরাইলের ঈশাখাঁ ও ইসলামী হোটেলসহ আরো বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেলে ৬/৭ টি রুম ভাড়া নিয়ে ওই সব রুমে ২৫/৩০ জনের এক একটি গ্রুপে পরীক্ষার্থী রেখে গোপনে কোচিং করায়। পরবর্তীতে তাদেরকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ২ বছর ধরে পরীক্ষা পদ্ধতিতে এই দুর্নীতি চলে আসছে।
সাগর ও তুষার চক্রের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশলী আলমগীর নারায়ণগঞ্জ ডিপিটিসির ক্যাপ্টেন আরশাদ,ক্যাপ্টের আলমগীর,ক্রাউন সিমেন্ট কোম্পানীর জাহাজ ড্রাইভার কামরুল,আকিজ কোম্পানীর জাহাজ মাষ্টার তুহীন,সিটি গ্রুপের জাহাজ ড্রাইভার মহসীন ও টিপু -৭ এর জাহাজ মাষ্টার হাসান এবং সদর ঘাটের লঞ্চ মাষ্টার জামাল অন্যতম।

সুত্রমতে, সাগর -তুষারের দালাল সিন্ডিকেট এক একজন পরীক্ষার্থীকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করানোর জন্য প্যাকেজ চুক্তিতে আবদ্ধ করে ১ম শ্রেণীর মাষ্টার ও ড্রাইভার প্রার্থী থেকে ১লক্ষ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রার্থী থেকে ৮০ হাজার টাকা ও তৃতীয় শ্রেণীর প্রার্থী থেকে ৬০ হাজার টাকা আদায় করছে। এ পথে তারা গত ২ বছরে কোটিপতি বনেগেছে।
আরো জানাগেছে, সাগর ও তুষারের দালাল সিন্ডিকেটের দেওয়া রোল নম্বর বিশেষ মাধ্যমে পরীক্ষকদের কাছে পৌছে দেবার পর তারা খাতায় সাংকেতিক চিহ ব্যবহার করে পাশ নম্বর দিয়ে দিচ্ছেন। পরবর্তীতে মৌখিক পরীক্ষার সময়ও তারা রোল নম্বর ও সাংকেতিক চিহ মোতাবেক পাশ করিয়ে দিচ্ছেন। বিনিময়ে প্রার্থী প্রতি তারা ৫০/৬০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। প্রশ্ন ফাঁস করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিটি পরীক্ষায় এভাবে ৫০/৬০ জন পরীক্ষার্থী প্যাকেজ চুক্তিতে পাশ করিয়ে লক্ষ -লক্ষ টাকা অবৈধপথে ইনকাম করছেন। বিগত ২ বছরের পরীক্ষা সংক্রান্ত ফাইল পরীক্ষা- নীরিক্ষা করলেই তাদের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়বে বলে অভিযোগে দাবী করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগ থেকে আরো জানাগেছে, দালাল তুষারের সাথে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী মন্জুরুলের সাথে গভীর দহরম মহরম সম্পর্ক রয়েছে। তুষার নাকি ছাত্রলীগের একজন নেতার মাধ্যমে নৌ-প্রতিমন্ত্রীর কাছে তদবীর করে প্র্রেষনে থাকা ওই শীর্ষ কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকার মেয়াদ আরো ৬ মাস বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। ফলে তুষারের কথামত তিনি বিধিবর্হিভুতভাবে পরীক্ষার্থী পাশ, ছোট নৌযানের নকশা অনুমোদন, বেক্রসিং সনদ ইস্যু, জাহাজের মালিকনা পরিবর্তন, সার্ভে টোকেন ইস্যু, ক্যাডেটদের এনওসি প্রদানসহ যে কোন কাজ অবলীলায় করে দিচ্ছেন। প্রতিটি পরীক্ষার সময় তুষার ও সাগর পরীক্ষা কেন্দ্রে স্বশরীরে উপস্থিত থাকছে । তারা প্রায় সময়ই ওই ৩ কর্মকর্তার সাথে মোবাইল ফোন, ইমো, ভাইভার, ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার,ও হোয়াটসআপে যোগাযোগ করে থাকে। এমনকি নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরেও তাদেরকে প্রায়ই দেখা যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরে এর আগেও ড্্রাইভার পরীক্ষায় এরকম দুর্নীতির আশ্রয় নিলে সেটি ধরা পড়ে এবং বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সে সব তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজঅব্দি আলোর মুখ দেখেনি।
কে এই তুষার ও সাগর?
খোঁজখবর নিয়ে জানাগেছে, তুষারের বাড়ী বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায় । বাবা’খোর তুষার বলে মতিঝিল এলাকায় তার পরিচিতি রয়েছে। সে সব সময় ইয়াবার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। মাষ্টার ও ড্রাইভার পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেবার কথা বলে শতাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে অগ্রীম টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছে। তারা এখন টাকা ফেরৎ চেয়ে পিছু পিছু ঘুরছে। কয়েকবার তাদের হাতে মারও খেয়েছে। নিজেকে সে যুবলীগ নেতা হিসাবে পরিচয় দেয়।
অপরদিকে সাগর সাহার বাড়ী শরিয়তপুর জেলায়। পুর্বে সে মোহামেডান ক্লাবে ক্যাসিনো ও জুয়ার বোর্ডের কর্মচারি ছিলো । ক্যাসিনো জুঁয়া বন্ধ হয়ে যাবারপর নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের একজন সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর সুপারিশে মাষ্টার ও ড্রাইভার পরীক্ষার দালাল হিসাবে আবির্ভুত হয়। প্রতিদিন হাজার টাকার মদ না খেলে সে নাকি অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। সে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাকে আত্মীয় হিসাবে পরিচয় দিয়ে মানুষকে প্রতারণা করে থাকে।
নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর কর্মকর্তাদের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ-পবিহন অধিদপ্তরের অভিযুক্ত কর্মকর্তারা বলেন, এসব অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। এখন শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে মাষ্টার ও ড্রাইভারশীপ পরীক্ষা হচ্ছে। পরীক্ষার মাত্র একঘন্টা আগে প্রশ্নপত্র তৈরী করা হয়,তাই প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া পরীক্ষার সময় নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও উপস্থিত থাকেন। এখানে অনিয়ম-দুর্নীতি করার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া-তুষার ও সাগর নামের কাউকে তারা চেনেন না বলেও দাবী করেন।