banner

শেষ আপডেট ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,  ১৯:৫৯  ||   শনিবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০২১ ইং, ৩ আশ্বিন ১৪২৮

শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে বিচার চাই

শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে বিচার চাই

৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৫:৪১ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে বিচার চাই

 

মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন :
বর্তমান সরকারের বড় সফলতা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে তা কার্যকর করা। বিচারে কারও ফাঁসি, কারও যাবজ্জীবন এবং অনেকের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকি বাহিনীকে তারা যেমন সহযোগিতা করেছিল, তেমনি দেশবিরোধী কার্যে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল। পাকিরা যা না করেছে, তার বেশি ক্ষতি করেছে তারা। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে নিঃসন্দেহে একটি ভাল কাজ করেছেন। এ জন্য বর্তমান সরকার দেশে-বিদেশে প্রশংসিতও হয়েছেন। এ বিচার প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানসহ ২/১টি দেশ বিরোধিতা করে বক্তব্য দিয়েছিল, যার জন্য তারা ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

আমাদের স্বাধীনতার ৪৯তম বছর চলছে। এতোটি বছরে আমাদের মাতৃভূমি যতটুকু উন্নতি বা দেশবাসী যতটুকু প্রত্যাশা করেছিলেন তা হয়নি বা একটি গোষ্ঠী তা হতে দেয়নি। তারা বারবার বাঁধা দিয়েছে প্রত্যাশিত উন্নয়নের পথে। প্রশ্ন হল, তারা কারা? জবাবে বলবো, তারা হলো Ñ দুর্নীতিবাজরা। প্রশ্ন আসবে Ñ কারা দুর্নীতিবাজ? জবাবে বলবো, যারা জনসাধারণের অর্থ-সম্পদ চুরি করে, যারা কালোবাজারি করে, যারা মাদক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা করে, যারা ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, যারা রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদ অবৈধপথে আয় ও দখল করে এবং যারা ঘুষ খায় তারা দুর্নীতিবাজ। এরা দেশের সাধারণ মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে খাচ্ছে এবং ব্যক্তিগত সহায়-সম্পত্তি, অর্থ-বিত্তের পাহাড় গড়ছে। এরা দেশবাসীর চরম শত্রু। রাষ্ট্র এদেরকে রুখতে পারেনি।

এরা রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পেয়ে ধরাকে সরাজ্ঞান করে আসছে। প্রশ্ন হল Ñ সরকার যদি এদেরকে রুখতেই না পারে বা বিচারের ব্যবস্থা না করতে পারে তাহলে জনগণই কি এদের বিচারের ভার নেবে? বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল Ñ মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী , মেয়র ও সংসদ সদস্যসহ প্রজাতন্ত্রের বিশেষ-বিশেষ কর্মচারীদের এবং তাদের পরিবারের অর্থ-সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে; কিন্তু বড়ই দুর্ভাগ্য মন্ত্রী পরিষদের কেউ বা এমপিরা কেউই তাদের অর্থ-সম্পদের হিসেব দেয়নি।

যতদূর জানা যায়, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ Ñ বিগত মহাজোট সরকারের সময় ২০১১ সালের মার্চ মাসে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের অর্থ-সম্পদের হিসাব বিবরণী প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেয়ার ব্যাপারে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ প্রজ্ঞাপনে মন্ত্রীদের আরও অর্থ-সম্পদের বিবরণীসহ ১৭টি তথ্য দিতে বলা হয়। এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে আয়, গৃহ-সম্পত্তির আয়ের অর্থ, ব্যবসার পুঁজি বা মূলধনের জের, অকৃষি জমি ও অর্জিত মোট তহবিল ইত্যাদি। অবশ্য প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তাদের অর্থ ও সম্পদ বিবরণী জনসমক্ষে কিংবা ওয়েবসাইটে প্রকাশের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যাস্ত ছিল। এ ছাড়াও প্রজ্ঞাপন অনুসারে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত সমমর্যাদাসম্পন্ন অথবা তুলনীয় মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, যারা সরকার অথবা প্রজাতন্ত্রের কাজে নিযুক্ত, তারাই প্রতিবছর আয়কর জমা দেয়ার এক মাসের মধ্যে নির্ধারিত ছকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের আয় ও অর্থ-সম্পদের বিবরণী জমা দেয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রী স্বীয় বিবেচনায় আয় ও অর্থ-সম্পদের বিবরণী প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেবেন।

২০১১ সালের মার্চে জারি করা এই প্রজ্ঞাপন এখানো বহাল আছে এবং এর কোন পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা হয়নি। এ বিষয়ে নতুন কোন সিদ্ধান্তও নেয়া হয়নি। ওই প্রজ্ঞাপন জারির পর তৎকালীন মহাজোট সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের একাধিকবার নির্দেশনা দেয়ার পরও অধিকাংশ মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা তাদের আয় বা অর্থ-সম্পদের হিসাব-বিবরণী জমা দেয়নি। ২০১৩ সালের শেষ দিকে মন্ত্রীসভার ২৫জন সদস্য তাদের সম্পদের হিসাব বিবরণী সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেন বলে জানা যায়। তাদের জমাকৃত তথ্য বিবরণী নবম সংসদে অংশগ্রহণের সময় নির্বাচন কমিশনে তথ্য বিবরণী দেয়া হয়েছিল তার পুনরুল্লেখই করা হয়। অন্যরা তাদের অর্থ ও সম্পদের কোন বিবরণী জমাই দেননি।

সংসদ সদস্যদের অর্থ ও সম্পদ বিবরণী স্পিকারের কাছে জমা দেয়ার জন্য বলা হলেও তাতে কেউ সাড়া দেননি। যদিও ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিশ্রুতি ছিল প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, তাদের পরিবারের অর্থ-সম্পদ এবং আয়ের উৎস প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশ করার কথা। ওই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে ঘোষিত ইশতেহারে ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মন্ত্রী-এমপিদের অর্থ সম্পদ, আয়-রোজগার সম্পর্কে সর্বস্তরের নাগরিকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু বড়ই দুর্ভাগ্য ২০১৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পুনরায় সরকার দায়িত্বভার নেয়ার পর মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী সংসদ সদস্য সমপর্যায়ের পদস্থ ব্যক্তিরা গত ৩/৪ বছরেও অর্থ-সম্পদের কোন হিসাব দেননি বা দেবার মত কোন ভানও করেননি। এমনকি বর্তমান সরকারের এ মেয়াদে মন্ত্র, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ সমমর্যাদার ব্যক্তিদের অর্থ-সম্পদের হিসাব দেয়ার ব্যাপারে সরকারের উচ্চ পর্যায় হতে কোন তাগিদও নেই। এর ফলে কেউই অর্থ-সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেয়নি। যদিও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতিই হচ্ছে অর্থ-সম্পদের হিসাব-বিবরণী জমা দেয়া।

শেষ কথা হল দুর্নীতি চলেছে, চলছে এবং এর সাথে যারা জড়িত তারা অপরাধী, দেশের শত্রু ও মানবতার শত্রু। যারা দুর্নীতিবাজ তারা যুদ্ধাপরাধীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর ব্যক্তি। যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষতি করেছে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কিন্তু দুর্নীতিবাজরা ক্ষতি করে আসছে এবং যাচ্ছে অনন্তকাল ধরে। দুর্নীতিবাজ যারাই হোক বা যে দলেরই হোক তারা মা মাটি মানুষের শত্রু।

এ জন্য অতি প্রয়োজন যুদ্ধাপরাধীদের জন্য যে আদলে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল করে তাদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে Ñ সে আদলে একটি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দুর্নীতিবাজদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা। আশা করছি আমার এ দাবীর সমর্থনে সচেতন দেশবাসী এগিয়ে আসবেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ চালাতে গিয়ে তার চারপাশের লোকদের খাশলত বা আচরণ দেখে বলেছিলেন, ‘সবাই পায় স্বর্ণের খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি, এই চোরগুলো নিয়ে গেলে আমি বাঁচতাম’। তাই চোর বা দুর্নীতিবাজদের বিচার করতে পারলেই দেশ রক্ষা হবে এবং জাতির জনকের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবেন।