banner

শেষ আপডেট ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,  ১৯:৫৯  ||   শনিবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০২১ ইং, ৩ আশ্বিন ১৪২৮

স্বাগত হিজরিবর্ষ ১৪৪৩ মুসলিম জাতির ঐতিহ্য-সংস্কৃতির স্মারক

স্বাগত হিজরিবর্ষ ১৪৪৩ মুসলিম জাতির ঐতিহ্য-সংস্কৃতির স্মারক

১০ অগাস্ট ২০২১ | ১০:৫০ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • স্বাগত হিজরিবর্ষ ১৪৪৩ মুসলিম জাতির ঐতিহ্য-সংস্কৃতির স্মারক

পীরজাদা মাওলানা গোলামুর রহমান আশরফ শাহ:  করোনার বৈশ্বিক অভিঘাতের এই দুঃসময়ে বছর ঘুরে ফিরে এলো একটি নতুন বছর। স্বাগত হিজরি নববর্ষ ১৪৪৩। করোনার বিষাদময় কালো ছায়ায় বিশ্ববাসীর আজ নাকাল ও নাভিশ্বাস অবস্থা। এই করোনার ভয়াল থাবা থেকে নিষ্কৃতি ও পরিত্রাণ মিলবে এই আশা ও প্রত্যাশায় বিশ্ব মুসলিম হিজরি নববর্ষ বরণে আজ উদগ্রীব। নতুন বছরে বিগত দিনের গ্লানি, অপ্রাপ্তি, হতাশা, বঞ্চনা ও ব্যর্থতা ঝেড়ে মুছে নতুন স্বপ্ন ও অঙ্গীকারে যেন আমরা ঘুরে দাঁড়াই। আমরা জানি, মানবজাতির ইহজাগতিক শান্তি ও পরকালীন অনন্ত জীবনে মুক্তির জন্য ইসলামকে আমাদের জীবন বিধান হিসেবে পেশ করেছেন মানবজাতির মুক্তির দিশারী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শনের নাম। শুধু বিধিবদ্ধ কিছু ধর্মীয় নিয়ম নীতি ও নির্দেশনা পালনই ইসলামের লক্ষ্য নয়। ইসলাম যেহেতু পূর্ণাঙ্গ দর্শনের নাম তাই বিনোদন তথা নির্মল সংস্কৃতির অনুমোদনও দেয় ইসলাম। সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে একটি জাতি তার পরিচিতি খুঁজে পায়। যে জাতির সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-ইতিহাস যতো সমৃদ্ধ, জাতি ও গোষ্ঠী হিসেবে সেই ধর্ম সম্প্রদায়ের খ্যাতি ও সমৃদ্ধিকে কিছুতেই উপেক্ষা করা যায় না। মুসলমান হিসেবে আমরা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ঐতিহ্য-সংস্কৃতির অধিকারী। ১ মহররম হিজরি নববর্ষ আমরা পালন করে আসছি। মহররম মাসে আশুরা পালন, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, শবে মেরাজ, শবে বরাত, শবে কদর, ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.), ফাতেহায়ে ঈয়াজদাহুম ইত্যাদি উপলক্ষে আমরা যে সভা, মিলাদ মাহফিল-কনফারেন্সের আয়োজন করি তাই হচ্ছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি তথা ইসলামী সংস্কৃতি। এসব ইসলামী দিবস ও আচার অনুষ্ঠানকে ঘিরে মুসলমানরা অতীব আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। তাই এসব ইসলামী সংস্কৃতি লালনের মধ্য দিয়ে আমরা যেমন অশেষ করে পুণ্যের অধিকারী হতে পারি, তেমনি মুসলিম বিশ্বে আমরা মুসলমানরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। মুসলমানরা নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধারণ করে যদি সামনে এগিয়ে যায় তাহলে কোনো অপশক্তি তথা ইসলাম বৈরি গোষ্ঠী আমাদের পদানত করে রাখার সাহস পাবে না। এই দিকটি স্মরণে রেখে আমরা হিজরি নববর্ষে ইসলামী সংস্কৃতির আয়োজন করে আসছি। ১ জানুয়ারি খ্রিস্টিয় নববর্ষ ও ১ বৈশাখ বাংলা নববর্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠ আমাদের এই মুসলিম দেশে বেশ সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়ে আসছে। অথচ মুসলমান হিসেবে আমাদেরও আছে নিজস্ব সন। তা হচ্ছে হিজরি সন। হিজরি সনকে আমাদের জীবনধারা থেকে পৃথক করার সুযোগ নেই। হিজরি নববর্ষ পালনে আমাদের আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস থাকা দরকার।
প্রতিটি বর্ষপঞ্জির পত্তনের পেছনে রয়েছে কিছু ঘটনা ও প্রাসঙ্গিক নানা বিষয় আশয়। তেমনি আরব দেশের প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে ওই সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রপরিস্থিতির আলোকে প্রবর্তিত একটি বর্ষপঞ্জি হলো হিজরি সন। ওই সময় আরব দেশের তারিখ হিসেবে শুধু মাসের নাম লেখা হতো। বারো মাসে বছর এই রীতি প্রচলিত থাকলেও নির্ধারিত কোনো সন বা বর্ষপঞ্জির হিসেব ছিল না। গণকল্যাণমূলক বহুজাতিক ইসলামী রাষ্ট্রের কর্ণধার দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর রাদ্বিআল্লাহু আন্হুর খিলাফতকালে বিস্তৃত অর্ধেক পৃথিবীর শাসনব্যবস্থা সুষ্ঠু ও গতিশীল করার প্রয়োজনে এবং দায়িত্বমুখী জবাবদিহি প্রশাসন গড়ে তোলার অংশ হিসেবে ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হিজরি সন প্রবর্তিত হয়। হিজরি সন প্রবর্তনের এটি একটি কারণ। তবে এর সাথে আরেকটি বড় কারণও লক্ষ্য করা যায় ইতিহাসের পাতায়। নতুন প্রবর্তিত বর্ষপঞ্জির নামকরণ ‘হিজরি’ কেন হয়েছে এবং ’হিজরি’ শব্দটিই বা এলো কীভাবে তা জানতে গেলে এই কারণটি অনুধাবন করা যায়।
৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে হিজরি সনের গণনা শুরু হলেও পৃথিবীতে বছর গণনার দুটো রীতি সুদূর অতীত থেকে চলে আসছে। একটি হলো সৌর রীতি, অন্যটি চান্দ্র রীতি। সূর্যের পরিক্রমের হিসেবে যে বর্ষ গণনার উদ্ভব ঘটে তা সৌর সন। চন্দ্রের পরিক্রমের হিসেবে যে বর্ষ গণনা শুরু হয় তাই চান্দ্র সন। সূর্যের নিজ কক্ষপথে এক চক্র ঘুরে আসতে সময় লাগে প্রায় তিনশ পঁয়ষট্টি দিন পাঁচ ঘণ্টা আটচল্লিশ মিনিট ছেচল্লিশ সেকেন্ড। এই হচ্ছে সৌরবর্ষের দৈর্ঘ্য। অন্যদিকে চন্দ্রকলার হ্রাস ও বৃদ্ধিতে সময় লাগে প্রায় ঊনত্রিশ দিন বারো ঘণ্টা। যে কারণে এক চান্দ্র বছর হতে সময় লাগে ৩শ ৫৪ দিন ৮ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট। হিজরি সন চান্দ্র বছরের সাথে সম্পৃক্ত একটি বহুল প্রচলিত সন যা সারাবিশ্বে কম বেশি অনুসৃত হয়ে আসছে। হিজরি সন চান্দ্র সন হওয়ায় কোনো ঋতুর সাথে এর মাসগুলো স্থির থাকতে পারে না। সকল ঋতুকে ঘিরে এই হিজরি সন আবর্তিত হয়ে থাকে। এটি হিজরি সনের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য। বলাবাহুল্য, বাংলা সনের উৎস হিজরি সন থেকেই। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল মহানবীর (দ.) দুনিয়ায় শুভাগমনের ঠিক ৫০ বছর আগে ইয়েমেনের খ্রিষ্টান রাজা আবরাহা কা’বা শরিফ ধ্বংস করার ফন্দি আঁটে। এক বিরাট হস্তিবাহিনীসহ মক্কার কাছাকাছি তিন মাইল দূরে আবরাহার সৈন্য সামন্ত এসে পৌঁছলে এক ঝাঁক আবাবিল পাখি ঠোঁটে কংকর এনে সেই বাহিনীর ওপর এমন প্রচণ্ড বেগে নিক্ষেপ করে যে আল্লাহর হুকুমে সমস্ত হস্তিবাহিনী মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন ও ধ্বংস হয়ে যায়। তখন থেকে আরবদের কাছে আমুল ফিল বা হস্তিবর্ষ নামে একটি বর্ষ গণনা চালু হয়। কিন্তু তা আনুষ্ঠানিকতা পায়নি। মহানবী (দ.) মদীনায় হিজরত করে আসার পর ইসলামের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী বিজয়ের নতুন নতুন অধ্যায় সংযোজিত হতে থাকে। ইসলামের অনুশাসন পালনের নানা বিধি বিধান অবতীর্ণ হতে লাগল। হিজরতের আগেই সালাতের বিধান নাযিল হলেও তা যথাযথ নিয়মে নির্বিঘ্নে আদায় শুরু হয় মহানবীর (দ) মদিনায় হিজরতের পর থেকে।
মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা, ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন যাকাত, রমজান মাসে ত্রিশ ফরয রোজা, সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারের বিধান এবং হজ্ব্রে বিধান অবতীর্ণ হওয়াসহ ইসলামের পরিপূর্ণতা এসেছে হিজরতের ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে। এ কারণে প্রিয় নবীর (দ.) হিজরত ইসলামের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। মুসলমানদের আত্মজাগরণের গৌরবময় স্মারক হিজরত। মহানবীর (দ.) তিরোধানের পর দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) এর খিলাফতের সময় গণকল্যাণমূলক খেলাফত শাসন ব্যবস্থা ওই সময়ে জানা পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃতি ঘটে। বিভিন্ন প্রদেশের আমির গভর্নরদের প্রশাসনিক কাজে চিঠিপত্র লেখার ক্ষেত্রে কিংবা নথি ফরমান, দলিল দস্তাবেজ ইত্যাদির ক্ষেত্রে তারিখ হিসেবে শুধু মাসের নাম লেখার রীতি চালু ছিল। নির্দিষ্ট কোনো সন না থাকায় মাসের নামটি যে কোন বছরের তা জানা বা বুঝার কোনো উপায় ছিল না। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায়, প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হতো। এ অসুবিধার কথা জানিয়ে একটি প্রদেশের গভর্নর হযরত আবু মুসা আল আশয়ারী (রা.) শুধু শাবান মাস লেখা একটি চিঠির উল্লেখ করে লিখলেন-শুধু মাসের নাম লেখা থাকার কারণে প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে সময় গণনা দিনক্ষণ নির্ণয়ে জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। গর্ভনরের এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সকলেই একটি বর্ষপঞ্জি বা সন প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে হযরত ওমর (রা.) শীর্ষস্থানীয় সাহাবাদের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করলেন। ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনার পর অবশেষে হযরত আলী (রা.) এর প্রস্তাবে মহানবীর (দ.) হিজরতের ঘটনা প্রবাহকে স্মরণীয় করে রাখতে হিজরত শব্দ থেকেই হিজরি সন নামে নতুন চান্দ্রসনের প্রবর্তন করা হয়। হিজরতের ১৬ বছর পর ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হিজরি সনের প্রবর্তন হয়। ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল হিজরতের ঘটনা ঘটলেও আরবের প্রচলিত মাসগুলোর ক্রম ঠিক রাখার জন্য প্রথম মাস মুহাররম থেকেই হিজরি নূতন সন গণনা নির্ধারিত হলো। ঘটনাবহুল মহররম মাস, আশুরা ও শাহাদাতে কারবালার ট্রাজেডির মাস মহররম হিজরি সনের প্রথম মাস শুধু নয়, পৃথিবীর অস্তিত্ব ও বির্বতনের বিভিন্ন ঘটনা এবং নানা উত্থান পতনের সাক্ষী মহররম মাস। এই মহররমই হিজরি বর্ষের সূচনার সাথে জড়িয়ে আছে। মহানবীর (দ.) মদিনায় হিজরতকে মহিমান্বিত করার প্রয়োজনে এবং মুসলমানদের স্বতন্ত্র জীবনধারা ও ইতিহাস ঐতিহ্য নির্মাণের সাথে হিজরি সন ও মহররমের আলাদা বৈশিষ্ট্য স্বীকার করতেই হয়। ২০১০ সালে দেশে প্রথমবারের চট্টগ্রামের ডিসি হিলে হিজরি নববর্ষ সাড়ম্বরে বরণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সন থেকে হিজরি নববর্ষ উদযাপন পরিষদের ব্যানারে চট্টগ্রামে হিজরি নববর্ষ পালিত হচ্ছে। এইবার ২০২১ সনে হিজরি বর্ষবরণের যুগপূর্তি করোনাকালে সীমিত পরিসরে ভার্চুয়ালি আয়োজিত হবে। আসুন! সকলে ইসলামী সংস্কৃতির আলোকে জীবন গড়ি। প্রাত্যহিক জীবনধারায় ইসলামী আচার অনুষ্ঠান পালনে এগিয়ে আসি।
বর্তমান পৃথিবীতে চলছে অশান্তি, যুদ্ধ-সংঘাত, হানাহানি ও মানুষে মানুষে বিভেদ-বিদ্বেষ। ফলে মানুষের শান্তি স্বস্তি আজ উধাও। এই উত্তপ্ত সংঘাতময় পৃথিবী আমরা চাই না। চাই মানুষে মানুষে প্রেম ও সম্প্রীতপূর্ণ সম্পর্ক। দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে চাই ঐক্য ও মিলন। হিজরি নতুন ১৪৪৩ সনে সংঘাতমুক্ত শান্তিময় মানবিক বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় আমরা যেন আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাই। স্বাগত হিজরি নববর্ষ ১৪৪৩। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
লেখক: চেয়ারম্যান, হিজরি নববর্ষ উদযাপন পরিষদ।