banner

শেষ আপডেট ৫ মে ২০২১,  ২২:১৯  ||   মঙ্গলবার, ১১ই মে ২০২১ ইং, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮

অমুসলিমের সঙ্গে নবীজির আচার-ব্যবহার

অমুসলিমের সঙ্গে নবীজির আচার-ব্যবহার

৪ মার্চ ২০২১ | ১১:০৫ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • অমুসলিমের সঙ্গে নবীজির আচার-ব্যবহার

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা : জীবনে চলতে গেলে হরেক রকম মানুষের সঙ্গে উঠাবসা করতে হয়। পরিবার, অধীনস্থ, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, কত রকমের মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়, কত শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়। এত রকম মানুষের সঙ্গে মিশতে গিয়ে যাতে কারো সঙ্গে যেন খারাপ ব্যবহার না হয়, সেদিকে যত্নবান হওয়া উচিত। এ বিষয়েও রাসুল (সা.)-এর আদর্শ আমাদের জন্য অনুকরণীয়।নিম্নে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর আচরণ কেমন ছিল, তা সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হয়েছে।

পরিবারের সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর আচরণ : মহানবী (সা.) তাঁর স্ত্রীদের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। তিনি প্রতিদিন সব স্ত্রীর খোঁজ নিতেন এবং তাঁদের সময় দিতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে, ‘ফজরের নামাজের পর নবী করিম (সা.) নামাজের স্থানে বসে থাকতেন। সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত লোকেরাও তাঁর চারপাশে বসে থাকত। অতঃপর তিনি তাঁর প্রত্যেক স্ত্রীর কাছে যেতেন, তাঁদের সালাম দিতেন, তাঁদের জন্য দোয়া করতেন আর যাঁর দিন থাকত তাঁর কাছে গিয়ে বসতেন।’ (তিবরানি, হাদিস : ৮৭৬৪)

এমনকি তিনি স্ত্রীদের সংসারিক কাজে সহযোগিতাও করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) জুতা ঠিক করতেন, কাপড় সেলাই করতেন এবং তোমরা যেমন ঘরে কাজ করো তেমনি কাজ করতেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৫৩৮০)

অমুসলিমের সঙ্গে নবীজির ব্যবহার : প্রিয় নবী (সা.) এতটাই উদার ছিলেন যে তিনি কখনো অহেতুক কোনো অমুসলিমের সঙ্গেও রূঢ় আচরণ করেননি এবং সাহাবায়ে কেরামকেও এ ব্যাপারে সচেতন করেছেন। আবু বকর (রা.)-এর কন্যা আসমা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.)-এর যুগে আমার অমুসলিম মা আমার কাছে এলেন। আমি নবী (সা.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করব কি না?

তিনি বললেন, হ্যাঁ। ইবনে উয়াইনাহ (রহ.) বলেন, এ ঘটনা প্রসঙ্গেই আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেন, ‘দ্বিনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেনি, আর তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করতে, আর ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৭৮)

সাহাবাদের সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর আচরণ : সাহাবায়ে কেরামের প্রতি রাসুল (সা.) অত্যন্ত সদয় ছিলেন। তাঁর নম্র আচরণে মুগ্ধ হয়েই অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। দুই জাহানের বাদশা হয়েও তিনি এতটাই সাধাসিধে জীবন যাপন করতেন, যে কেউ খুব সহজে তাঁর কাছে যেতে পারত। তিনি সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আবু আউফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জিকির অত্যধিক পরিমাণে করতেন এবং অনর্থক কাজ একেবারেই করতেন না; আর নামাজ দীর্ঘ করতেন ও খুতবা সংক্ষেপ করতেন। তিনি বিধবা ও গরিবদের সঙ্গে চলাফেরায় সংকোচবোধ করতেন না; যাতে তিনি তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন। (নাসায়ি, হাদিস : ১৪১৪)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর গৃহে প্রবেশ করতে কোনো দিন আমাকে বাধা প্রদান করেননি এবং যখনই আমাকে দেখেছেন, মুচকি হাসি দিয়েছেন। (বুখারি, হাদিস : ৩৮২২)

নেতা হিসেবে রাসুল (সা.) : পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক প্রভাবশালী নেতা ছিলেন রাসুল (সা.)। তাঁর উপমা তিনি নিজেই। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নেতা হয়েও তিনি তাঁর সঙ্গীদের ছোটখাটো কাজেও আত্মনিয়োগ করতে সংকোচ করতেন না। বারাআ (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) খন্দক যুদ্ধের দিন মাটি বহন করেছিলেন। এমনকি মাটি তাঁর পেট ঢেকে ফেলেছিল অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তাঁর পেট ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। (বুখারি, হাদিস : ৪১০৪)

আবার মুসলিমসমাজকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে তিনি কখনো কখনো কঠোরও হয়েছেন। মুসলিম বাজারে মানসম্মত খাবার বিক্রয় হচ্ছে কি না তা নজরদারি করতে তিনি নিজেই বাজারে গিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) খাদ্যশস্যের একটি স্তূপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তিনি স্তূপের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিলেন, ফলে হাতের আঙুলগুলো ভিজে গেল। তিনি বলেন, হে স্তূপের মালিক, এ কী ব্যাপার? লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, এতে বৃষ্টির পানি লেগেছে। তিনি বলেন, সেগুলো তুমি স্তূপের ওপরে রাখলে না কেন? তাহলে লোকেরা দেখে নিতে পারত। জেনে রাখো, যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি করে, আমার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। (মুসলিম, হাদিস : ১৮৫)

সেবকের সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর আচরণ : মানুষ সাধারণত নুন থেকে চুন খসলেই সেবক ও অধীনস্থদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, গায়ে হাত তুলে বসে। কিন্তু রাসুল (সা.) কখনো এমন করেননি। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো সেবককে এবং কোনো নারীকে মারধর করেননি। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৭৮৬)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আনাস (রা.) বলেন, আমি ১০ বছর নবী (সা.)-এর খিদমত করেছি। কিন্তু তিনি কখনো আমার প্রতি উঃ! শব্দটি করেননি। এ কথা জিজ্ঞেস করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না? (বুখারি, হাদিস : ৬০৩৮)