banner

শেষ আপডেট ২৪ অক্টোবর ২০২১,  ১২:২৮  ||   রবিবার, ২৪ই অক্টোবর ২০২১ ইং, ৯ কার্তিক ১৪২৮

জ্যোতি ও রবীন্দ্রনাথ – এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

জ্যোতি ও রবীন্দ্রনাথ – এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

৫ অক্টোবর ২০২১ | ১৪:২১ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • জ্যোতি ও রবীন্দ্রনাথ – এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

রাজিব শর্মা :

পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য বিখ্যাত মানুষ জন্মগ্রহন করেছেন।অবশ্যই তাঁদের মধ্যে ছিল অফুরন্ত প্রতিভা। তথাপি তাঁদের এই প্রতিভাকে বিকশিত করার কাজে প্রায়ই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অবদান থাকে অনেকের যাদের কথা হয়তো সবাই কোনদিন জানতেও পারেন না কিন্তু তাঁদের অবদান সর্বদাই অনস্বীকার্য। রবীন্দ্রনাথের জীবনেও এরকম দুজন হলেন নতুনদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও কাদম্বরীদেবী। এই লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে কীভাবে তাঁরা কিশোর রবিকে গড়ে দিয়েছিলেন,রবীন্দ্র জীবনে তাঁদের প্রভাব ও রবীন্দ্রনাথের মনস্তত্ত্ব গঠনে তাদের অবদান যা ঠাকুরবাড়ির ছোট্ট রবি থেকে পরিণত করেছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথে।

সূচনাঃ ১৮৬১ সালে যখন রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয় তখন বাংলার সংস্কৃতির পালে লেগেছে নতুন হাওয়া। সে হাওয়া ছিল আধুনিকতার, পালাবদলের। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা,দেবেন্দ্রনাথের একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মধর্ম প্রচার,সামাজিক সংস্কার আন্দোলন, নারী শিক্ষার প্রসার, দেশীয় নাট্যশালা স্থাপন নানা ধারার মধ্য দিয়ে অবিভক্ত বাংলায় আধুনিকতার উত্তরণের প্রক্রিয়া চলছিল। বিশেষ করে ব্রাহ্মধর্মের প্রভাবে ঠাকুরবাড়িতে এক নতুন সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হচ্ছিল।

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেনঃ “দ্বারকানাথ ঠাকুর বিলাতি জিনিসপত্র দ্বারা বাড়ির চেহারা বদলে দেন।তাঁর আগে ঠাকুরবাড়ির অন্দর ছিল আর দশটা মধ্যযুগীয় বাঙালি বাড়ির মতোই।দ্বারকানাথ ঠাকুরবাড়ীতে শুধু আভিজাত্যই আনেননি,এনেছিলেন রুচিশীলতা,আধুনিকতা ও পরিবর্তনের জোয়ার যা সঞ্চারিত হজয়েছিল তাঁর উত্তরাধিকারদের মাঝে।‘
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঞ্চম পুত্র ও রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৪৯ সালে।বয়সে তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের চেয়ে ১২ বছরের বড়। জ্যোতি ছিলেন একাধারে নাট্যকার, বহুভাষাবিদ, অনুবাদক, গীতিকার, স্বরলিপিকার, অভিনেতা, চিত্রশিল্পী ও যন্ত্রসংগীতশিল্পী। মুখ্যত জ্যোতিরিন্দ্রনাথের উদ্যোগেই ঠাকুরবাড়িতে গড়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন ও উদ্যোগ যেমন জোড়াসাঁকো নাট্যশালা, বিদ্বজ্জন সমাগম, সারস্বত সমাজ, সঞ্জীবনী সভা ইত্যাদি।বিখ্যাত ভারতী পত্রিকা ছিল তাঁরই স্বপ্নফসল।তরুণসমাজকে স্বাদেশিকতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ছিল বিপুল প্রণোদনা।

কিশোর রবীন্দ্রনাথ নিজের প্রতিভা বিকাশের যে অনুপম সুযোগ পেয়েছিলেন সেক্ষেত্রে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও কাদম্বরীর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। পরে তা জীবনস্মৃতি ও ছেলেবেলা থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায়।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “জ্যোতিদাদা সম্পূর্ন নিঃসংকোচে সমস্ত ভালোমন্দের মধ্য দিয়ে আমাকে আমার আত্মোউপলব্ধির ক্ষেত্রে ছাড়িয়া দিয়াছেন, তখন হইতেই আমার আপন শক্তি নিজের কাঁটা ও নিজের ফুল বিকাশ করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া পড়িয়াছে।“

রবীন্দ্রনাথের শৈশব কৈশোর গড়ে উঠেছিল ঠাকুরবাড়ির মনমাতানো উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক পরিবেশে।তখন গানে নাটকে সরগরম করতো গোটা ঠাকুরবাড়ি। মাঘ উৎসব ও অন্যান্য উৎসবে চলতো গানের আসর। মাঝেমাঝে বাইরে থেকে ও নামিশিল্পীরা গান গাইতে আসতেন। রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলা থেকেই এই স্রোতে নিজের গা ভাসিয়ে দিয়েছিলেন।

আরো চলতো নাটক অভিনয় । আর তার মধ্যমণি ছিলেন জ্যোতিদাদা।জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর’ না থাকলে সংস্কৃত নাটকের বিপুলভাণ্ডার অধরাই থেকে যেত। অনেকটা বঞ্চিত থাকা হতো পাশ্চাত্যসাহিত্যের রসআস্বাদন থেকেও।
‘গিরিশঘোষের’ আগে ‘বঙ্গরঙ্গালয়ের জনপ্রিয়তা’ কে তিনিই গড়ে দিয়েছিলেন।তাঁর কাছে বাঙালি ‘স্বদেশিয়ানা’র প্রথম পাঠ নিয়েছিল। ‘অরবিন্দঘোষের’ হাত ধরে ‘বিপ্লবীযুগ’ শুরু হওয়ার অনেক আগে তিনিই প্রথমবাঙালিকে ‘গুপ্তসমিতি’ গড়তে শিখিয়েছিলেন।‘হামচুপামুহাফ’ গঠনের মধ্য দিয়ে। নিজের অন্তঃপুরিকা স্ত্রী ‘কাদম্বরী’কে চিৎপুরের রাস্তা দিয়ে ‘ইডেনগার্ডেনে’ ঘোড়া ছুটিয়ে ‘নারীস্বাধীনতা’ সম্বন্ধে সচেতন করেছিলেন। বাঙালিও যে চাইলে ব্যবসা করে প্রতিপক্ষ ইংরেজব্যবসাদারদের পাততাড়িগোটানোর ব্যবস্থা করতে পারে, তাও প্রমাণ করে দিয়েছিলেন তিনি। ‘বিদ্বজ্জনসমাগম’, ‘সঞ্জীবনীসভা’, ‘সারস্বতসমাজ’ গঠনের মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্য সেবার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।আর সেই সঙ্গে গড়ে দিয়েছিলেন বাঙালির গর্বের ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ কে।

কিশোর বয়স থেকেই জ্যোতিদাদা খেলার ছলে নাটক রচনায় উজ্জীবিত হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি প্রণোদনা পেয়েছিলেন গুণেন্দ্রনাথ এর থেকে।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ
“গুনুদাদা ও আমি একি বয়সী। তিনি রোজ সকালে আমাদের বাড়ি আসিতেন, আমাদের বাড়ীর বারান্দায় আমরা আড্ডা বসাইতাম। একদিন কথা হইলো আমাদের ভিতর ঊীঃৎধাধমধহুধ নাট্য নাই। আমি তখনই পুরাতন সংবাদপ্রভাকর হইতে কয়েকটি মজার কবিতা জুড়িয়া একটি অদ্ভুত নাট্য খাড়া করিয়া তাহাতে সুর বসাইয়া মহা আনন্দের সহিত ও বাড়ীর বৈঠকখানায় মহা উৎসাহের সহিত পাঠ আরম্ভ করিলাম।“

রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন , প্রতিদিন দুপুরে গুণদাদার বড়ো বৈঠকখানা ঘরে তাহার রিহার্সালচলিত। আমরা এ বাড়ির বারান্দায় দাড়াইয়া খোলা জানালার ভিতর দিয়া অট্টহাস্য সহিত মিশ্রিত অদ্ভুতগানের কিছু কিছু পদ শুনিতে পাইতাম।“
ঠাকুরবাড়িতে মঞ্চায়নের জন্য রামনারায়ণ তর্করতœ লিখেছিলেন ‘নবনাটক।‘ নাটকটি মঞ্চায়িত হয় বৈঠকখানা বাড়ির দোতলায়। নাটকটি রবীন্দ্রনাথের মনে যে গভীর দাগ কেটেছিল তা জীবনস্মৃতি পড়লেই বোঝা যায়।
এই নাটক ও গানের আবহাওয়া রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশে গুরত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছিল।
১৮৬৮ সাল। রবি ও জ্যোতির জীবনে ছিল সবচেয়ে স্মরনীয় বছর। সে বছর ঠাকুরবাড়িতে বউ হয়ে আসেন কাদম্বরীদেবী। কাদম্বরী ৯, জ্যোতি ১৯।
ছেলেবেলায় তিনি লিখেছেন-
“এমন সময় একদিন বাজলো সানাই বারোয়া সুরে।বাড়িতে এল নতুনবউ, কচি শামলা হাতে সরু সোনার চুড়ি।বউ ঠাকুরণের জায়গা হলো বাড়ির ভেতরে ছাদের লাগাও ঘরে।“
রবীন্দ্রনাথ তখন বয়সে তরুণ। সবেমাত্র কবি হিসেবে তাঁর নাম একটু একটু করে ছড়াচ্ছে। সেই সময় তিনি নতুন কবিতা লিখেই প্রথম শোনাতেন তাঁর ‘নতুন বৌঠান’ কাদম্বরীদেবীকে। কাদম্বরী রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী। তিনিও ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী। ‘ভোরেরপাখি’ কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতা তিনি খুব পছন্দ করতেন।নতুন বৌঠানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছিল মধুর সম্পর্ক।ঠাকুরপো রবির লেখা কবিতা শুনে তিনি বলতেন, ‘রবি তুমি বিহারীলালের মতো লেখো না কেন?’ বিহারীলালকে রবি নিজের গুরু মনে করতেন। নতুন বৌঠানের মুখে এই কথা শুনে রবি আরো ভালো কবিতা লেখার চেষ্টা করতেন, যাতে নতুনবৌঠান সন্তুষ্ট হন।নতুন বৌঠান কাদম্বরীদেবী এই ভাবের বিরল লেখার মান উত্তরণের চেষ্টা করতেন। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী নিয়মিত আসতেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে।কাদম্বরী দেবী তাঁকে নিমন্ত্রণ করে নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াতেন। বিহারীলালকে কাদম্বরী দেবী একবার নিজের হাতে একটি সুন্দর আসন বুনে দিয়েছিলেন। সেই আসন উপহার পেয়ে খুশি হয়ে বিহারীলাল কিছুদিন পরে ‘সাধেরআসন’ নামে একটি কাব্য রচনাকরেন।বিহারীলালের সঙ্গে ভোজসভায় নিয়মিত ডাক পড়ত রবীন্দ্রনাথের। কাদম্বরীদেবী দুজনকেই যতœ করে রেঁধে খাওয়াতেন। একদিন রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালের সঙ্গে খেতে বসেছেন। বিভিন্ন রকমের সুস্বাদু পদ তৃপ্তি করে খাচ্ছেন দুই কবি।কাদম্বরী দেবী পরিবেশন করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রবি রান্না কেমন হয়েছে?’ রবীন্দ্রনাথ খেতে খেতেই উত্তর দিলেন, ‘বৌঠান, পাক তো ভালোই হয়েছে। এখন পরিপাকহলেই বাঁচি!’

রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতি তে লিখেছেন-“সাহিত্যে বউ ঠাক্রুানির প্রবল অনুরাগ ছিল।তিনি যে শুধু সময় কাটানোর জন্য বই পড়িতেন তা নয়,যথার্থই তিনি সেসব মন দিয়া উপভোগ করিতেন।তাঁহার সাহিত্যচর্চায় আমি প্রধান অংশী ছিলাম।“
নিজের লেখার হাত ছিল না কাদম্বরীদেবীর কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে উৎসাহিত করেছেন প্রচুর।একে তো রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্নেহভাজন ছিলেন ই তাছাড়াও রবির ভেতর থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল আসাধারন সম্ভবনাময় প্রতিভার আভাস।তাই কাদম্বরী বেশি করে চাইতেন রবীন্দ্রনাথের সৃজনশক্তিকে জাগাতে ও নিরন্তর সক্রিয় রাখতে।
শিলাইদহে থাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথ যে কেবল কবিতা লিখে খাতা ভরিয়েছেন তা কিন্তু নয়, যুক্ত হয়েছেন নানা মজার কাজে, অর্জন করেছেন নানা অভিজ্ঞতা। রবীন্দ্রনাথ কে কাছে পেয়ে জ্যোতিদাদা ছোটভাইয়ের শারিরীক ও মানসিক শিক্ষার জন্য নানাপ্রকার আয়োজন শুরু করলেন। রবীন্দ্রনাথকে টাট্টুঘোড়া আনিয়ে তাতে চড়া শেখালেন। পরে কোলকাতায় নিজের বাড়িতে থাকা ঘোড়াতে চড়েও রবীন্দ্রনাথ ঘুরে বেরিয়েছেন। শিলাইদহের জঙ্গলে সে সময় মাঝে মাঝেই বাঘ আসার খবর শোনা যেত। জ্যোতি রবিকে নিয়ে বাঘ শিকারেও গিয়েছিলেন। শিলাইদহের জঙ্গলে তারা বাঘের মুখোমুখি ও হয়েছিলেন। ছেলেবেলা গ্রন্থে সেই বাঘশিকারের গল্পের উল্লেখ রয়েছে।
শিলাইদহে মালী এসে প্রতিদিন ফুল সাজিয়ে দিয়ে যেত।একদিন রবীন্দ্রনাথের খেয়াল হলো ফুলের রস দিয়ে কবিতা লিখবেন। জ্যোতিদাদার তাতেও সায়। ছুতোর ডেকে ফুল থেকে রস বের করার যন্ত্র তৈরি করা হলো।অনেক চেষ্টার পরেও ফুল পিছলো বটে কিন্তু পর্যাপ্ত রস বেরোলো না তাই সেবারের মতো ফুলের রস দিয়ে লেখালেখির কাজে ক্ষান্ত দিতে হলো।

দ্বিতীয় বার বিলেত যাত্রা স্থগিত হওয়ায় ১৮৮১ সালের মে মাসের দিকে রবীন্দ্রনাথ চন্দননগরের জংগলঘেরা এক বাড়িতে জ্যোতি ও কাদম্বরী কে নিয়ে কিছুদিন ছিলেন।এই বাগানাবাড়িতে থাকার সময়ে বিদ্যাপতির গানে রবীন্দ্রনাথ নিজে যে সুর দিয়েছিলেন সেকথা তিনি বাকীজীবন মনে রেখেছেন।

পিতার দেখাদেখি জ্যোতি ও শরতকালে পুজোর সময় ঘুরতে বেরোতেন। ১৮৮২ সালে জ্যোতি রবীন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী কে নিয়ে দার্জিলিং বেড়াতে যান। এটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রথম দার্জিলিং ভ্রমন।শহর থেকে দূরে রোজভিলা নামে এক ব্রিটিশ মেমের বাংলোয় তারা উঠেছিলেন।
১৮৮৩ সাল। রবীন্দ্রনাথের বয়স ২২। তখনো বিয়ে করেননি।মার্চে তিনি, জ্যোতিদাদা ও কাদম্বরী বৌদি যাত্রা করলেন অন্ধ্রপ্রদেশের কারোয়ার বন্দরে। সত্যেন্দ্রনাথ তখন বদলি হইয়ে কারোয়ারে।রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- কিছুদিনের জন্য আমরা সদর স্ট্রিটের দল কারোয়ারে সমুদ্র তীরে ভ্রমনের জন্য গিয়েছিলাম। সেদিন শুক্লপক্ষের রাতে তারা সদল বলে কোন দূর্গ দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে বসে তিনি লেখেন পূর্নিমায় নামে একটি কবিতা ও পরে কয়েকদিনে জ্যোতিদাদার উৎসাহে কারোয়ারের সমুদ্রতটে বসে লিখলেন প্রকৃতির প্রতিশোধ নামে নাট্যকাব্য।কারোয়ার থেকে তারা সমুদ্রপথে আসেন বোম্বাই।সেখান থেকে কোলকাতা।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ দুজনেই ছিলেন বাংলা গানের আধুনিক নির্মাতা।জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন বেহালা,পিয়ানো,সেতার ,বাশি প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের গুণীবাদক।জ্যোতির গানের সুরধারার প্রবাহিত মিশেছিল রবীন্দ্রনাথের মধ্যে। তার সুরের টান মিশেছিল রবির রন্ধ্রেরন্ধ্রে ।চন্দননগরে মোরান সাহেবের বাগানবাড়িতে থাকার সময়ে তাদের সময় কেটেছে সুরের আল্পনায়।ইউরোপীয় সংগীতের পরীক্ষা নিরীক্ষাও হয়েছিল তার হাতে।জ্যোতি সুর সৃষ্টি করতেন আর রবি তাতে কথা বসাতেন।সুর ও কথার অপূর্ব সংমিশ্রন রবীন্দ্রনাথকে উদ্বুদ্ধ করতো আরো নতুন গান রচনায়।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
“সেসময় জ্যোতিদাদা নিয়মিত বেহালা,পিয়ানো বাজান।সে সময়েই জ্যোতিদাদার পিয়ানো যন্ত্রের উত্তেজনায়, কথক বা তাঁহার রচিত সুরে বাল্মীকিপ্রতিভা রচনা করিয়াছিলাম।“
রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্যের রচিত গানগুলোর মধ্যে অন্তত কুড়িটিকে জ্যোতি সুর দেন। সত্যেন্দ্রনাথের সাথে বোম্বাই অবস্থানকালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথ এক মারাঠি সেতারবাদকের থেকে সেতার শেখেন।পরে ঠাকুরবাড়িতে এসে দেবেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ গানের আসর বসান।
এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
“আমার শিশুকাল হতেই গানবাজনার মধ্যেই বাড়িয়া উঠিয়াছি।কবে যে গান গাইতে পারিতাম না তা জানি না।মেজদা ও জ্যোতিদা যখন গান গাইতেন তখন টেবিলের উপর বসিয়া আমিও উচ্চকন্ঠে ‘দেখিলে তোমার সেই অতুল প্রেম আননে’ গান গাহিতেছি বেশ মনে পড়ে।“
ব্রহ্মসংগীত রচনারক্ষেত্রেও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন রবির প্রধানপ্রেরণাদাতা। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আদিব্রাহ্মসমাজের সম্পাদকথাকাকালীন সময়েই রবীন্দ্রনাথ ১১টি ব্রহ্মসংগীত রচনা করেন।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণে রবীন্দ্রনাথের হাতে ব্রহ্মসংগীত লেখার স্বীকৃতি মেলে। তিনি লিখেছেনঃ
“ইহার পরে রবীন্দ্রনাথের আমল।তাঁহার অসামান্য কবি প্রতিভা এখন ব্রহ্মসংগীতকে পূর্নতায় নিয়ে গেছে।নানা সুর,নানা তাল,নানা ছন্দ আজ ব্রহ্মসংগীতে আজ সবই তো তার দেওয়া।“ চিত্রাংকনের ক্ষেত্রেও জ্যোতির তুলির টান আচড় কেটেছিল রবির মনে। সেই আচড়ের টানকেই বুকে লালন করে রবীন্দ্রনাথ শেষ বয়সে চিত্রঅংকনে হাত দিয়েছিলেন।জ্যোতিরিন্দ্রনাথের একটি ‘ছদ্মবিজ্ঞান’ জানাছিল।তাহলো ‘ফ্রেনোলজি’ বা ‘শিরোমিতি-বিদ্যা’। ‘মানুষের মাথার গড়ন’ পরীক্ষা করে তিনি তাঁর ‘মনেরচলন’ বলতে পারতেন। মানুষের মুখের ছবি আঁকার নেশা ছিল তাঁর।তিনি পরিবারের নানা সদস্য, বন্ধু, অভ্যাগতদের অজস্র প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন, যাদের দখলে এখন অবাক হতে হয়। সেকালের অনেক বিখ্যাত মানুষের ছবি ‘ফোটোগ্রাফে’ ধরা না পড়লেও, ধরা আছে তাঁর আঁকা ছবিতে তার মধ্যে বিখ্যাত হলেন লালন শাহ। ১৯১৪ সালে শিল্পী রোটেনস্টাইনের পৃষ্ঠপোষকতায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথের চিত্রস্ংগ্রহ ব্রিটেনে প্রদর্শনী করা হয়।রবীন্দ্রনাথ ও রোদেনস্টাইনের উদ্যোগে ১৯১৪ সালে এই স্কেচগুলি নিয়ে একটি বই প্রকাশিত হয়।জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আঁকা প্রায় দু হাজার ছবির সংগ্রহ বিশ্বভারতী সমিতিতে আছে।রবীন্দ্রনাথের অবচেতন মনে ছবি আঁকার বীজ জ্যোতিই বপন করেছিলেন। ১৮৮০ সালে রবীন্দ্রনাথ প্রথম ছবি আঁকেন।সেটি ছিল টাক মাথা,গোঁফওয়ালা এক প্রৌঢ়ের ছবি।ছবিটি রবীন্দ্রনাথ এঁকেছিলেন জ্যোতির আঁকা দেখেই।

জুন ১৮৮৩ তে রবীন্দ্রনাথ এর জন্য পাত্রী সন্ধান শুরু হয়।বিয়ে হয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর। বিয়ের চারমাস পরেই ঠাকুরবাড়িতে বিপর্যয় দেখা যায়। ১৮৮৪ সালের ২১ শে এপ্রিল কাদম্বরী আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার সঠিক কারন কখনোই জানা যায়নি।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়ঃ
“যাহাকে ধরিয়াছিলাম তাহাকে ছাড়িতেই হইল, এইটা কে ক্ষতির দিক দিয়া দেখিয়ে যেমন বেদনা পাইলাম তেমনি সেইক্ষনেই মুক্তির দিক দিয়া দেখিয়া উদার শান্তি বোধ করিলাম।”
রবীন্দ্রনাথের একথা যেমন সত্য তেমনি এটাও সত্য যে রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন কাদম্বরীর স্মৃতি বেদনায় পীড়িত হয়েছেন।সারাজীবন ধরে তাঁর উদ্দেশ্যে কতোই না গান কবিতা রচনা করেছেন!!
ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীর উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছেন
“ভানুসিংহের কবিতাগুলো ছাপাইতে তুমি আমাকে অনেকবার অনুরোধ করিয়াছিলে।তখন সে অনুরোধ পালন করি নাই।আজ ছাপাইছি কিন্তু তুমি আর দেখিতে পাইলে না।“
কাদম্বরী কে নিয়ে এত বেশি আলোচনা হয়েছে যে তাঁর সম্বন্ধে নতুন করে কিছু বলতে চেষ্টা করা বাহুল্যমাত্র।অবশ্য এই আলোচনা-সমালোচনার কারণ ‘রবীন্দ্রনাথ’। ‘কিশোর রবীন্দ্রনাথের মনোগঠনে কাদম্বরীর দান অসামান্য। তাঁর অকাল মৃত্যু রবীন্দ্র মানসে গভীর ছাপ রেখে গিয়েছিল। একথা কবি নিজেই অসংখ্য কবিতা ও গানের মধ্যে প্রকাশ করেছেন। সুতরাং যাঁরা তাঁদের নিয়ে অনেক ‘কল্পনা’এবং ‘কষ্ট-কল্পনা’বা ‘আকাশ কুসুমকল্পনা’ করেন তাঁদের সুযোগ করে দিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, একথা বললে খুব ভুল বলা হবেনা।কবি নিজেও জানতেন সেকথা।তাই কৌতুক করে শেষ বয়সে বলতেন, ‘‘ভাগ্যিস নতুনবৌঠান মারা গিয়েছিলেন তাই আজও তাকে নিয়ে কবিতা লিখছি – বেঁচে থাকলে হয়ত বিষয় নিয়ে মামলা হত।’’

কাদম্বরীর মৃত্যুসংক্রান্ত যেসব খবরপাওয়া গেছে তাতে নিশ্চিত উত্তর কিছু পাওয়া যায়না। ‘ইন্দিরা’ আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘‘জ্যোতি কাকামশাই প্রায়ই বাড়ি ফিরতেননা। তার প্রধান আড্ডা ছিল বির্জিতলা হয়ে আমাদের বাড়ি। আমার মা জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে ওঁর খুব ভাবছিল।’’ এরই মধ্যে একদিন অভিমানিনী কাদম্বরী স্বামীকে বলেছিলেন তাড়াতাড়ি ফিরতে।গানে গানে আড্ডায় আড্ডায় সেদিন এত দেরি হয়ে গিয়েছিল যে জ্যোতিরিন্দ্রের বাড়িফেরা হয়নি।প্রচণ্ড অভিমানে কাদম্বরী ধ্বংসের পথই বেছে নিয়েছিলেন।বাড়িতে কাপড় নিয়ে আসত ‘বিশু’বা ‘বিশ্বেশ্বরীতাঁতীনী’। সেই বিশুকে দিয়ে লুকিয়ে আফিম আনিয়ে, সেই আফিম খেয়েই কাদম্বরী মর্তজীবনের মায়া কাটিয়েছিলেন। আবার ‘বর্ণকুমারী’কে প্রশ্ন করে ‘অমলহোম’ শুনেছিলেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জোব্বার পকেট থেকে কাদম্বরী পেয়েছিলেন তখনকার দিনের একজন বিখ্যাত অভিনেত্রীর মতান্তরে ‘নটীবিনোদিনী’ র কয়েকখানি চিঠি।চিঠি গুলি ছিল উভয়ের অন্তরঙ্গতার পরিচায়ক।এই চিঠিগুলি পেয়ে কাদম্বরী কয়েকদিন ‘বিমনা’ হয়ে কাটিয়েছিলেন তারপর আত্মহত্যা করেছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি লিখে গিয়েছিলেন যে ‘ঐ চিঠিগুলিই’ তাঁর আত্মহত্যার কারণ।মহর্ষির আদেশে ‘সেসব চিঠি ও তাঁর স্বীকারোক্তি’ নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। ‘কাজী আবদুল ওদুদ’ লিখেছেন যে, তিনি ঠাকুরবাড়ির একজন খ্যাতনামা ব্যক্তির মুখে শুনেছেন, যে মহিলার সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গতা জন্মেছিল তিনি অভিনেত্রী নন তবে সেই অন্তরঙ্গতার জন্য কাদম্বরী নাকি আগেও একবার আত্ম হত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
সমসাময়িককালের অন্যান্য কবিদের কোন কোন লেখা থেকে মনে হয় তাঁরাও ‘জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ’কেই দায়ী করেছেন। ‘নিঃসন্তান স্ত্রীর সঙ্গহীন-শূন্যতা’ ভরিয়ে তোলার জন্যে স্বামীর যতটা মনোযোগী হওয়া উচিত ছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তা ছিলেননা।হয়ত এ ব্যাপারে তিনি খানিকটা উদাসীন ছিলেন। ‘নিত্য নতুন সৃষ্টির আনন্দে মেতে ওঠা’, ‘হঠাৎ একেকটা খেয়ালের বশবর্তী হয়ে চলা’, ‘সত্যেন্দ্র-জ্ঞানদানন্দিনীর সান্নিধ্য’, ‘তাঁদের পুত্র-কন্যার সাহচর্য’ তাঁকে কাদম্বরীর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে এনেছিল।তৎকালীন রুচি ও রীতির পরিপ্রেক্ষিতে জ্যোতিরিন্দ্রর পক্ষে ‘থিয়েটারের অভিনেত্রী’বা ‘নটীদের’ সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনাও বিচিত্র নয়। সেকালে একান্নবর্তী সংসারে ‘বন্ধ্যানারী’ ছিলেন ‘উপেক্ষারপাত্রী’। তাঁর বিশেষ আদর ছিলনা।কাদম্বরী ঠাকুরবাড়ির বৃহৎ সংসারেও তাঁর যথার্থ স্থান টিকোনদিন পাননি।যাইহোক, সবমিলে কাদম্বরীর মনে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল। ‘সযতœস্বামীসেবা’, ‘গৃহপরিচর্যা’, ‘সাহিত্যশিল্প’ নিয়ে তিনি নিজেকে ভুলিয়ে রাখলেও শেষরক্ষা করতে পারেননি। ‘সত্যেন্দ্র-জ্ঞানদানন্দিনীর কলকাতায় প্রত্যাবর্তনও বির্জিতলাও বাস’এবং ‘রবীন্দ্রনাথের বিবাহ’- দুটি ঘটনায় তাঁর নিঃসঙ্গতা প্রচণ্ড বৃদ্ধি পায়।সেই অবস্থায় স্বামীর অবহেলায় কাদম্বরী ‘মানসিক ভারসাম্য ’হারিয়ে ফেলেন ও ‘আত্মহননেরপথ’বেছেনেন। এর পটভূমিতে ‘ইন্দিরা-কথিত’বা ‘বর্ণকুমারী-কথিত’ যেকোন একটি বা দুটি কাহিনীই থাকতে পারে তবে তৃতীয় কোন অনুমানের অবকাশ বোধ হয় নেই।

কাদম্বরীদেবীর আত্মহত্যা তে রবি-জ্যোতির সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল বলে কেউ কেউ মতপ্রকাশ করেছেন।সাম্প্রতিককালেরও কোন কোন সমালোচক কারণ হিসেবে ও নিয়েছেন ‘রবীন্দ্রনাথের ক্রমবর্ধমান খ্যাতি’টি কে।কিন্তু এ সম্ভাবনাই ‘অসার’ বলে মনে হয়, কারণ রবীন্দ্রের প্রতি জ্যোতিরিন্দ্র কোনদিন ঈর্ষান্বিত হবেন ভাবা যায়না।জ্যোতির বা রবির আত্মজীবনীতে তার কোন প্রকারলক্ষন চোখে পড়েনা। সেখানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তার মহাপ্রতিভাবান ভাইয়ের আকুন্ঠ প্রশংসা রয়েছে।বিশেষ করে পরবর্তীকালে যখন তিনি জীবন থেকে সরে গিয়েছিলেন।তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর যোগ স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তো ছিলই, অন্য সময়েও বিচ্ছিন্ন হয়নি। ‘সরোজিনী জাহাজে ভ্রমণকরা’ ছাড়াও তাঁরাদুই ভাই বহুদিন ‘সত্যেন্দ্রনাথের বাড়িতে’ পাশাপাশি ঘরেবাস করেছিলেন।তাঁর শেষ বয়সের ডায়রিতেও দেখা যাবে দু-তিনবার ‘রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ’ আছে। ‘রবিরবক্তৃতা’, ‘রবির দাড়িরাখা’, ‘রবির নতুন গান’কিছুই তাঁর চোখ এড়ায়নি। এমন তিনি কি দাড়িরাখা রবীন্দ্রনাথের ছবিও এঁকেছিলেন।তবে এসময় জ্যোতিরিন্দ্র সবকিছু থেকেই অনেক দূরে সরে যাচ্ছিলেন।

অপরদিকে রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠিতেও দেখা যাবে ‘অন্তরঙ্গতার সুর’। ‘জ্যোতি দাদার ছবির এ্যালবাম’ ছাপার ব্যাপারে তিনিই ছিলেন ‘উদ্যোক্তা এবং আগ্রহী’। পরবর্তী জীবনে রবীন্দ্রনাথ হয়েছিলেন ‘বিশ্বকবি’। তাঁর পারিবারিকজীবনে ও নেমে এসেছিল নিয়মিত ‘দুর্বারদণ্ড’। ‘স্ত্রী ও পুত্রকন্যাদের মৃত্যু’, ‘শান্তিনিকেতনের সমস্যা’নিয়ে ‘বিব্রতকবি’ তখন নিজের কোন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে পারছিলেন না, ‘জীবনবিরাগী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ’ তো সেখানে তাঁর কাছে আরো দূরের মানুষ ছিলেন।সুতরাং ‘কাদম্বরীর মৃত্যু’ দুই ভাইয়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেনি।এইমৃত্যুরমধ্যেই ‘জ্যোতিরিন্দ্রনাথ’খুঁজেছিলেন ‘কাদম্বরীর বিদেহীসত্তাকে’ আর ‘রবীন্দ্রনাথ’ নতুন করে চিনেছিলেন নিজেকে।আর ‘কাদম্বরীর দেহহীনসভা’মিশে গিয়েছিল তাঁর ‘কবিতায়’, ‘গানে’, ‘ছবিতে’।

জীবনস্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের সেই ভাষ্যঃ
“সাহিত্যের শিক্ষায়,ভাবের চর্চায়,বাল্যকাল হইতেই জ্যোতিদাদা আমার প্রধান সহায় ছিলেন।অন্যকে উৎসাহ দিতেই তাহার আনন্দ।আমি অবাধে তাহার সাথে ভাবের জ্ঞানের আলোচনায় প্রবৃত্ত হইতাম-তিনি আমাকে বালক বলিয়া অগ্রাহ্য করিতেননা।তিনি আমাকে বড়ো রকমের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তাহার সংস্রবে আমার সমস্ত সংকোচ ঘুচিয়া গিয়াছিল। তার সঙ্গে তর্ক করিয়াছি বয়স্যের মতো। তিনি বালককেও শ্রদ্ধা করিতে জানতেন।আমার চিত্ত বিকাশ তাহার স্বাধীনতা দ্বারাই সম্ভব হয়েছে।এইরুপ স্বাধীনতা আমাকে আর কেহ দিতে সাহস করেন নাই।“

জীবন সায়াহ্নে এসে খ্যাতির শিখরে পৌছে রবীন্দ্রনাথ আত্মপরিচয়ে লিখেছেনঃ
“জ্যোতিদাদা, যাকে আমি সবার চেয়ে বেশি মানিতুম, তিনি কখনোই আমাকে বাইরে থেকে বাঁধন পরান নি।তিনি বালককেও শ্রদ্ধা করিতে জানিতেন।আমার আপন মনের স্বাধীনতার দ্বারাই তিনি আমার চিত্ত বিকাশে সহায়তা করেছেন। রাচির শান্তিধামে জ্যোতি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ১৯২৫ সালের ৮মার্চ।জ্যোতির মৃত্যুর সময় তাঁর নিকটাত্মীয়দের মধ্যে কেউই ছিলেন না।রবীন্দ্রনাথও আসেন নি।অবশ্য রবীন্দ্রনাথ তখন আর জ্যোতির ছোট্ট রবিটি নেই।তিনি তখন ভারতবর্ষ তথা সারা পৃথিবীর গর্ব বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।তিনি তখন সবদিক থেকেই ছাড়িয়ে গেছেন জ্যোতিকে। তবে রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর চিহ্নিত হয়ে আছে অগ্রজ জ্যোতির কোনো কোনো সৃষ্টিতে।মহাপ্রতিভাধর রবীন্দ্রনাথের ‘মেন্টর’ যদি কেউ থেকে থাকেন, তিনি হলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ।কিশোর রবি থেকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ হবার পেছনে নতুনদাদার যে অবদান তা অক্ষয়,অমলিন।

তথ্যসূত্রঃ
১. জীবনস্মৃতি- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
২. ছেলেবেলা- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩. ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল,চিত্রা দেব,আনন্দ পাবলিসার্চ,কলকাতা।
৪. রবিজীবনী, প্রশান্তকুমার পাল,আনন্দ পাবলিসার্চ, কলকাতা,অগ্রহায়ন ১৪২২।
৫. রবীন্দ্রজীবনী,প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়,বিশ্বভারতী।
৬. আত্মজৈবনিক রবীন্দ্রনাথ, বেগম আকতার হোসেন, অবসর প্রকাশনী,ঢাকা।
৭. ঠাকুরবাড়ির বঞ্চিতা নারী,পৃথ্বীরাজ সেন, প্রিয়া বুক হাউজ, কলকাতা।
৮.রবীন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, মাহবুবুল হক, মূর্ধন্য প্রকাশনী, (২০১২),(।
৯. জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি: নাট্যচর্চা ও বিবিধ প্রসঙ্গ, মুহম্মদ শফি, এশিয়া পাবলিকেশন্স,ঢাকা, ২০১৫।

লেখকঃ সাংবাদিক, অনলাইন এ্যাক্টিভিটিস্ট। রক ভ্যালী মিনিষ্টির শিক্ষার্থী। চট্টগ্রাম।।