banner

শেষ আপডেট ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,  ১৯:৫৯  ||   শনিবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০২১ ইং, ৩ আশ্বিন ১৪২৮

স্বীয় যূগের গউস হযরত শাহ জাহাঁগীর শমছুল আরেফীন (কঃ)

স্বীয় যূগের গউস হযরত শাহ জাহাঁগীর শমছুল আরেফীন (কঃ)

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৪:১৯ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • স্বীয় যূগের গউস হযরত শাহ জাহাঁগীর শমছুল আরেফীন (কঃ)

প্রতিবেদক ::
পবিত্র মির্জাখীল দরবার শরীফ আউলিয়া কেরামের পূণ্যভূমি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার অন্তর্গত মির্জাখীল গ্রামে অবস্থিত জগত উদ্ভাসিত করা এক আধ্যাত্মিক মারকায হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ। ‘শাহ জাহাঁগীর’ খেতাবপ্রাপ্ত এই দরবারের প্রতিষ্ঠাতা হযরত শাহ জাহাঁগীর শেখুল আরেফীন মৌলানা মোখলেছুর রহমান সাহেব কেবলা (কঃ)। যিনি স্বীয় যূগের গউস হিসেবে বিশ্বে সমাদৃত। তাঁর মহামান্য পিতার নাম হযরত সৈয়দ গোলাম আলী (রঃ)।
এই বংশের পূর্বপুরুষগন সূদুর আরব হতে ভারতে আগমন করে রাজকর্মকর্তা হিসেবে দিল্লীতে অবস্থান করেন। ইসলাম প্রচারের মানসে দিল্লীর রাজন্যবর্গ বাংলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলে তাঁদের সাথে ফাতেমী বংশোদ্ভূত দুইজন মহাত্মা সৈয়দ বাংলায় আগমন করেন।
তাঁহারা প্রথমে চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার দেয়াং গ্রামে অবস্থান গ্রহন করে সেথা হতেই ইসলাম প্রচারের কাজ আরম্ভ করেন। পরবর্তীতে তাঁদেরই বংশধরগণ সাতকানিয়া থানার মির্জাখীলে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করেন।
“সিলসিলায়ে আলীয়া জাহাঁগীরিয়া”
হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বংশের সনদ তথা আওলাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশ শাজারা সম্বলিত এই সর্বোচ্চ বংশধারাতেই আগমন ভূবন বিখ্যাত আলেম, ফকীহ, বরেন্য মুজতাহিদ, আধ্যাত্মিক জগতের শাহবাজ হযরত শাহ জাহাঁগীর শেখুল আরেফীন মৌলানা মোখলেছুর রহমান সাহেব কেবলার (কঃ)। রূহানী জগতে যিনি “শেখুল আরেফীন (আরেফগণের সর্দার)” উপাধিতে ভূষিত এবং মহান রাব্বুল আলামীন কর্তৃক ‘সিলসিলায়ে আলীয়া জাহাঁগীরিয়া’ নামক আযীমুশশান আধ্যাত্মিক তরীকা দ্বারা পুরষ্কারপ্রাপ্ত। উল্লেখ্য যে, সিলসিলায়ে আলীয়া জাহাঁগীরিয়ার মসনদ নসীন সম্রাটদেরই ‘শাহ জাহাঁগীর’ লক্ববে সম্বোধন করা হয়।
“হযরত শাহ জাহাঁগীর শেখুল আরেফীন (কঃ)”
হযরত শেখুল আরেফীন সাহেব কেবলা (ক) তাঁহার পীর-মুর্শীদ ভারতের ভাগলপুর নিবাসী তৎকালীন কাজীউল কুজ্জাত (প্রধান জজ) কুতবে যমান হযরত মৌলানা এমদাদ আলী ভাগলপুরী (কঃ) এর নিকট হতে পূর্ণ খেলাফত প্রাপ্ত হয়ে ‘শাহ জাহাঁগীর’ উপাধী প্রাপ্ত হয়ে জাহাঁগীরি রাজ মসনদে আরোহন করেন।
হযরত শাহ জাহাঁগীর আউয়াল (প্রথম) মৌলানা শেখুল আরেফীন (কঃ) সেকালে জ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করেছিলেন। সমগ্র উপমহাদেশেই ‘বড় মৌলানা’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি বহু বিখ্যাত কিতাবের রচয়িতা। বাতিল ফেরকার বিরুদ্ধে শানিত তরবারি হয়ে আহলে সুন্নতের জন্য অটল ঢাল স্বরূপ ছিলেন। দেওবন্দি-ওহাবী আলেমদের সহিত তাঁহার অগনিত মুনাযারা এবং গাজী বেশে সুন্নীয়তের ঝান্ডা পবিত্র হস্তে ধারন করার মত বহু ঘটনাবলী এখনও লোকমুখে ঘুরে-ফিরে। আউলিয়া কেরামগণের কারামত এবং বাতিল আক্বীদার বিরুদ্ধে সমাজ ও আলেম শ্রেণীকে সচেতন করার লক্ষ্যে তাঁহার রচিত দলিল সমৃদ্ধ গ্রন্থ “শরহুস সুদূর ফি দাফইশ শুরুর” বাতিলগণের বিরুদ্ধে লিপিবদ্ধ এক অদ্বিতীয় কিতাব হিসেবে সারাবিশ্বেই গণ্য করা হয়।
১৩০২ হিজরীর ১২ই যিলক্বদ মোতাবেক ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দের ২৪শে আগস্ট পবিত্র সোমবার দিবসে ৭৩ বছর বয়সে হযরত সাহেব কেবলা প্রভূমিলনে দুনিয়া হতে পর্দা করেন। ওফাত শরীফের পূর্বে হযরত কেবলা তাঁহার সর্বকনিষ্ঠ সাহেবজাদা হযরত মৌলানা মুহাম্মদ আবদুল হাই (কঃ) কে জাহাঁগীরি মসনদের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন।
“হযরত শাহ জাহাঁগীর ফখরুল আরেফীন (কঃ)”
হযরত শাহ জাহাঁগীর ফখরুল আরেফীন মৌলানা মুহাম্মদ আবদুল হাই (কঃ) ১২৭৬ হিজরীর ৪ শাওয়াল মোতাবেক ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দে নিজ পবিত্র পিত্রালয়ে জন্মগ্রহন করেন। ‘শাহ জাহাঁগীর’ তাঁহার মহান পিতা এবং পীর মুর্শিদ হতে প্রাপ্ত খেতাব। আর ‘ফখরুল আরেফীন (আরেফগণের গর্ব)’ তাঁহার খোদা মারফত প্রাপ্ত রূহানী লক্বব।
পিতার নিকট প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহন পূর্বক তিনি কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপন করেন। তথাপি বিভিন্ন শাস্ত্রে আলাদা সনদ লাভের জন্য তিনি তৎকালীন আরবী শিক্ষার প্রসিদ্ধ মারকাজ লক্ষ্ণৌ এর ফেরেংগীমহলে গমন করেন। সেখান হতে গংগুহ গমন করে তথাকার বিখ্যাত পন্ডিতগণের নিকট হতে সকল বিষয়ে সনদ গ্রহন করে শিক্ষার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই গভীর পান্ডিত্য অর্জন করেন। দূর্লভ কিতাবাদি পাঠের উদ্দেশ্যে তিনি স্থান হতে স্থানে, লাইব্রেরী হতে লাইব্রেরী ভ্রমন করতেন। দিবা-নিশি কিতাবাদির মধ্যেই আত্মমগ্ন থাকতেন।
১৩০৭ হিজরীতে গাজীপুর এর তৎকালীন জগত বিখ্যাত চশমায়ে রহমত নামক মাদ্রাসার অধ্যক্ষের পদ শূণ্য হলে হযরত কেবলাকে উক্ত পদে আসীন হবার জন্য অনুরোধ করা হয়। তিনি অনুরোধ রাখেন এবং ছয় বছর উক্ত পদে থেকে তাঁর জ্ঞানের বিকাশ ঘটান। পরবর্তীতে ঐশী নির্দেশে নিজ পিত্রালয়ে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দে আমীরুল হুজ্জাজ হিসেবে পবিত্র হজ্ব পালন করেন। হজ্বের সকল কর্ম সমাপনের পর ৪৫ বছর বয়সে জাহাঁগীরিয়া সিলসিলায়ে আলীয়ার পবিত্র মসনদে অধিষ্ঠিত হয়ে শাহ জাহাঁগীর সানী (দ্বিতীয়) হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দরবারের সাজ্জাদানশীন রূপে প্রকাশিত হন।
তিনি দূর্লভ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তাঁহার জীবন চরিত এবং আধ্যাত্মিক অবস্থা নিয়েই ভারতের অধিবাসী বিশিষ্ট খলিফা হযরত খাজা হাকীম সৈয়দ সিকান্দার শাহ (কঃ) কর্তৃক চার খন্ডে রচিত “সিরতে ফখরুল আরেফীন” তাসাউফ সম্পর্কিত আধ্যাত্মিক দিক-নির্দেশনায় পরিপূর্ণ কিতাব হিসেবে সারা বিশ্বে পঠিত হয়।
তাঁহার বহু কিতাব বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠানে পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি পড়ানো হয়। আজও বহু কিতাব সুন্নীয়তের কাজে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ব্যবহৃত হয়। ফতোয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মুফতীগণের শেষ ভরসা। তৎমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তাহকীকুল আজাবীর ফী ছেমা ইল মজামীর।
শেরে বাংলা ইমামে আহলে সুন্নত হযরত আল্লামা গাজী সৈয়দ মুহাম্মদ আযীযুল হক্ব আল ক্বাদেরী (রাঃ) তাঁহার এবং তাঁহার মহাত্মা পিতার শানে কতইনা সুন্দর বলেছেন,
“শায়খ আব্দুল হাই, সন্দেহাতীতভাবে আরিফগণের গর্ব। আলিম, ফাদিল ও কামিল ব্যক্তিগণের মধ্যকার নেতৃস্থানীয় বুজুর্গ।
নিঃসন্দেহে জেনে রাখ, তিনি তাঁর জাহেরী ও বাতেনী জ্ঞান দ্বারা ভারতবাসীদের বশীভূত রেখেছিলেন।তিনি ছিলেন পরশপাথর। সারা ভারতবর্ষে তাঁর বিশাল খ্যাতি।
তোমরা সারা দুনিয়ায় তাঁর শত-সহস্র মুরীদ দেখবে।
তাঁর পিতাও (হযরত শেখুল আরেফীন সাহেব (ক) শীর্ষস্থানীয় আরিফ। তিনি আলেম সমাজের গর্ব। সুন্নীদের জন্য তিনি বিরল লাল গন্ধকতূল্য । কাশফ ও কারামতের ধারক ও বাহক। পবিত্র মির্যাখীলে তাঁর নূরানী মাজার। নিঃসন্দেহে তাঁর পবিত্র সত্ত্বা হতে অগনিত মানুষ প্রতিনিয়ত ফয়যপ্রাপ্ত হয়। তাঁর দ্বারা সমগ্র বাংলাদেশ আলোকিত হয়েছে। এ অধম ‘আযীয’ কিরূপে তাঁর প্রশংসা করতে পারে!”
জগত আলো করা এ মহান জ্ঞান সাধক, আধ্যাত্মিক জগতের মহারাজ, ভূবন বরেণ্য পীর ১৩৩৯ হিজরীর ১৭ই যিলহজ্ব, ১৯২১ ইং সনের ২২শে আগষ্ট পবিত্র সোমবার দিবসে ৬৩ বছর বয়সে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে যাত্রা করেন।
ওফাত শরীফের পূর্বেই তিনি বিভিন্ন সময়ে তাঁহার পরবর্তী সাজ্জাদানশীন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইংগিত করে যান। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁহার পরবর্তী সাজ্জাদানশীন হিসেবে মসনদ নশীন হন জগতপীর, যুগের গউস, বেলায়ত সম্রাট, রূহানী জগতের মধ্যমণি হযরত শাহ জাহাঁগীর শমছুল আরেফীন মৌলানা মুহাম্মদ মখছুছুর রহমান সাহেব (কঃ)।
“হযরত শাহ জাহাঁগীর শমছুল আরেফীন সাহেব (কঃ)”
“হযরতের বেলাদত শরীফ”
হযরত শমছুল আরেফীন সাহেব কেবলার (কঃ) মহিয়সী মাতা শ্রেষ্ঠ তাপসী, যুগের রাবেয়া বসরী হিসেবে পরিগনিত ছিলেন। তাঁহার খোদাভীরুতা ও পরহেজগারী লোকমুখে গুঞ্জরিত ছিলো। ১৩৩৩ হিজরির ২৭শে রমজান লাইলাতুল ক্বদর এর প্রারম্ভে পবিত্র সোমবার রাত্রিতে হযরত ফখরুল আরেফীন সাহেব (ক) তাঁহার বিবিগনকে এক বিশেষ সৌভাগ্যের ইংগিত করে স্বীয় পিতৃবর মহামান্য পীর-মুর্শিদ হযরত শেখুল আরেফীন (ক) এর পবিত্র মাজার শরীফে জেয়ারত করার আদেশ করলেন।
বিবিগন সকলেই মাজার শরীফ জেয়ারত করতে গেলেন। তাঁহাদের মধ্য হতে হযরতের ছোট বিবি সাহেবা জেয়ারতকালে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। স্বপ্নে একজন সুন্দর ফুটফুটে শিশুকে নিজ কোলে খেলতে দেখলেন।
উক্ত স্বপ্ন অবহিত করলে হযরত ফখরুল আরেফীন সাহেব কেবলার (কঃ) বুঝতে বাকী রইলো না যে তাঁহার ছোট বিবির কোলেই আগমন করবেন জগতের খাজা, মাহবুবে রব তা’আলা, মারেফত সাম্রাজ্যের অনন্য এক যুবরাজ।
পরদিন ফজরের নামাজ সম্পাদনের পর ভক্ত-মুরীদগণকে উদ্দেশ্য করে আগ্রহভরে সেই শুভ সংবাদ জানালেন, আল্লাহর পবিত্র ইচ্ছায় ছোট বিবি সাহেবার গর্ভে এক বিরল পুত্র-সন্তান আগমন করেছে। নিঃসন্দেহে এই সন্তান দ্বারাই বহু মহান কার্য্য সাধিত হবে। তাঁরই ভবিষ্যতবাণীর নিমিত্তে গাউসে জমান, কুতবে দাওরান, তাপসকূল শিরোমণি, মুর্শিদে বরহক্ব, সুলতানুল আরেফীন, হযরত মৌলানা শাহ মুহাম্মদ মখছুছুর রহমান ওরফে তোয়াহা মিয়া সাহেব বামুলক্ক্ববে গায়েব শমছুল আরেফীন কাদ্দাসা সিররাহুল আযীয মা’রূফ শাহ জাহাঁগীর ছালেছ (তৃতীয় শাহ জাহাঁগীর কেবলা) ২৭শে জমাদিউচ্ছানী ১৩৩৪ হিজরী মোতাবেক ১৯ই বৈশাখ ১৩২৩ বাংলা ১লা মে ১৯১৬ইং, পবিত্র সোমবার দিবসে জোহরের ওয়াক্তের প্রারম্ভে পবিত্র মির্জাখীল গ্রামে আস্তানায়ে আলীয়া জাহাঁগীরিয়ায় স্বীয় পবিত্র পিত্রালয়ে শুভ জন্মগ্রহন করেন।
“শিশু হযরত (কঃ)”
ধরাগমনের পর হতে হযরত শমছুল আরেফীন সাহেব কেবলা (কঃ) কোনদিন মায়ের স্তন্যপান করেন নি। তাঁহার জন্যে ধাত্রীমাতা নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি তাঁহার দেখা-শোনা করতেন। হযরতের পাক অস্তিত্বে জাহান মাতোয়ারা হয়ে উঠলো, ফুলে-ফলে সুশোভিত দরবার অত্যধিক প্রাণোচ্ছল হলো। ভক্তবৃন্দের হৃদয় অজানা আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে রইলো। বেহেশতি সৌরভে চারপাশ সুরভিত হল। হযরতের উপস্থিতিতে প্রকৃতির উচ্ছলতা বৃদ্ধি পেল। হযরত কেবলা সমগ্র আস্তানা পাক, ভক্ত-মুরিদানদের নিজ উপস্থিতিতে মাতিয়ে রাখলেন। সকল কিছুই যেন তাঁহার পবিত্র কদমে লুটিয় পড়তে লাগলো। যেন তিনিই সব, তিনিই আশা, তিনিই ভরসা। কারও কোন প্রয়োজন দেখা দিলে হযরত দৌড়ে গিয়ে পিতার হুজরা শরীফে উপস্থিত হয়ে তার জন্য প্রার্থনা করতেন। ছোট্ট শিশুর এমন ভক্তপ্রাণ হওয়া তৎকালীন মুরীদগণকে বিস্মিত করতো। হযরত ফখরুল আরেফীন সাহেব (কঃ) স্বয়ং পুত্রের আকাংক্ষার বাস্তবায়নে ব্যস্ত হতেন।
“শিশুকালেই বায়াত গ্রহন”
হযরতের বয়স সবেমাত্র দেড় বছর। স্বীয় পিতা মহাত্মা হযরত ফখরুল আরেফীন (কঃ) তাঁহাকে দোলনায় মুরীদ করালেন। তরীকতের শিক্ষাও দোলনায় থাকা অবস্থাতেই চলতে লাগলো। হযরতের বয়স যখন মাত্রই ৫ বছর অতিক্রম করেছে তখনই স্বীয় পিতৃবর মহাত্মা হযরত ফখরুল আরেফীন (কঃ) এর প্রভুমিলন ঘটলো। আর তরীকতের পবিত্র শিক্ষা গোপনেই চলতে লাগলো।
“বিদ্যাশিক্ষা”
হযরতের প্রাথমিক বিদ্যাশিক্ষার শুভ সূচনা হয় আস্তানায়ে আলীয়া জাহাঁগীরিয়ার পবিত্র শিক্ষাকেন্দ্রেই। প্রবল ধী-শক্তি, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অসাধারণ জ্ঞান শক্তির কারনে তিনি সকলের মাঝে অনন্য ছিলেন। শিশু বয়সেই প্রাথমিক জ্ঞানের পাশাপাশি তত্ত্ব-জ্ঞানের শূভ সূচনাও পিতার তত্ত্বাবধানেই হয়। অতি স্বল্প সময়েই তিনি পবিত্র কুরআন, হাদীসসহ প্রায় সকল গ্রন্থের উপর বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। অতঃপর তৎকালীন চট্টগ্রাম শহরে অবস্থিত প্রসিদ্ধ বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে সকল প্রকার শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জন করে চতুর্দিকে সাড়া ফেলেন। এরপরই পূর্ববর্তী মহাত্মাগণের অনুকরনে মাত্র ১৫ বছর বয়সে উচ্চতর বিদ্যা শিক্ষার্জনের নিমিত্তে কলকাতা গমন করেন।
তিনি সারারাত কিতাব পাঠে ব্যস্ত থাকতেন। রাতের আহার যথাস্থানে রয়ে যেত। কিতাব পাঠ হতে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করতেন। সাধারন মানুষ তাঁহার অবস্থা দেখে আশ্চর্যাম্বিত হতেন। সকল পরীক্ষায় প্রথম হতেন। তৎকালীন পন্ডিতগণ তাঁহাকে অসাধারণ পুরুষ হিসেবে মান্য করতেন। শিক্ষকগণ তাঁহাকে অত্যাধিক স্নেহে ও অপরিসীম যতেœ শিক্ষাদান করতেন। তাঁহাকে ছাত্র হিসেবে পেয়ে সকলেই নিজেদের ভাগ্যবান জ্ঞান করতেন।
“দরবারে আগমন”
শিক্ষাক্ষেত্রে হযরত ২৪ বছর বয়সে উপনীত হলেন। ঐশী বাণী আসলো, এবার ফিরতে হবে। রব তা’আলা স্বীয় ঐশী জ্ঞানে জ্ঞানী করবেন। দুনিয়াবী জ্ঞান সম্পন্ন হল বটে তথাপি জ্ঞানের পূর্নতা পাবে জ্ঞানরাজ্য আস্তানা পাকেই।
মান্যবর পীর-মুর্শিদ পিতা হযরত ফখরুল আরেফীন (কঃ) তাঁহার মাতৃগর্ভে থাকাকালীনই ফর্মায়েছিলেন, তাঁহার সম্পূর্ণ শিক্ষা আধ্যাত্মিক জগত হতে পরিচালিত হবে। এবার সেই ক্ষণ উপস্থিত হল। জ্ঞান সম্পূর্ণ করার সময় এলো। ভক্তগন আকূল হলেন। আর বাইরে থাকা নয়। ঐশী বাণী জানান দিচ্ছে এবার ফেরার পালা। হযরত দরবারে ফিরলেন।
“তরীকতের রাজ সিংহাসনে আরোহন”
হযরত ফখরুল আরেফীন সাহেব কেবলার (কঃ) লোকান্তরের ঊনিশটি বছর গত হল। এক্ষনে বহু বছর পর্দার অন্তরাল হতে পরিচালিত জাহাঁগীরি দরবারের আকাশ বাতাস মুখরিত। এক তিনি যার আগমণের আকাংখায় জগত তৃষ্ণার্ত। আরিফগণের অন্তর বেচয়েন। কার বিহনে মানবসমাজের এত আকূলতা। পশু-পাখি, গাছ- গাছালি, জলতরঙ্গ সকলের এত ব্যাকুলতা। কোথায় আছেন সেই লুক্বায়িত রতœ। ভেদরাজ্যের মহাসম্রাট, কোথায় তিনি!
ভূবন বরেন্য মুর্শীদ আরেফগণের গর্ব হযরত শাহ জাহাঁগীর ফখরুল আরেফীন (কঃ) ফরমায়েছিলেন, ২০ বছর অতিক্রান্ত হতেই সাজ্জাদানশীন হবার সকল গূনাবলি প্রকাশ পাবে। পূর্ববর্তী মুর্শিদ তথা পিতা এবং পিতামহের হুবহু সুরত তাঁহার অবয়বে প্রকাশিত হবে। চাল-চলন, আচার-আচরনে, কথা-বার্তায় জনসাধারন পূর্ববর্তী পীরানগনের পবিত্র অস্তিত্ব তাঁহার মাঝেই বিদ্যমান বলে বিশ্বাস করবে। এটাই জাহাঁগীরি সিলসিলার নিয়ম। ঠিক এটাই হল। হযরত শমছুল আরেফীন (ক) এর পবিত্র বয়স ২০বছর অতিক্রান্ত হতেই তাঁহার মাঝে ঐশী গুণাবলীসমূহ বিকশিত হতে লাগলো। দরবারের খলিফাগণ এবং পূন্যাত্মাগনের বিশেষ নজর তাঁহার উপর পড়তে লাগলো। সকলেই তাঁহার মাঝে দাদাপীর হযরত শেখুল আরেফীন (ক) এবং মুর্শিদ হযরত ফখরুল আরেফীন (ক) কেবলাদ্বয়ের হুবহু সুরত দর্শন করতে লাগলেন। তাঁহার কথা-বার্তা, চাল-চলন, আচার-আচরনে সকলের বুঝতে বাকী রইলো না যে শুভসময় অত্যাসন্ন। সুদীর্ঘ ঊনিশটি বছরের অবর্ণনীয় অপেক্ষার ক্ষান্ত দেবার সময় এসেছে। যুবরাজের মহাসম্রাটে প্রকাশিত হবার কাল ঘনিয়েছে। সেই স্পষ্ট ‘তোয়াহা’ খচিত চন্দ্রের মানব পরিচয়ে যমীনে অবতরনের ক্ষন এসেছে।
অবশেষে হযরত তাঁহার পবিত্র বয়সের চব্বিশ বছরে পদার্পন করলেন। সে বছরেই তদীয় পীর-মুর্শীদ হযরত ফখরুল আরেফীন সাহেব কেবলার (ক) ওরশ শরীফের ৩য় দিন সোমবার দিবসে মহান জাহাঁগীরিয়া ছিলছিলায়ে আলীয়ার পবিত্র মসনদে তিনি আরোহন করলেন আর আধ্যাত্মিক জগতের মহাসম্রাট হিসেবে নিজের আত্মপ্রকাশ ঘটালেন। চারপাশ স্তব্ধ, সুনসান, নিরব। মোহিত নয়নগুলো দৃষ্টাবদ্ধ শুধুমাত্র মসনদ পানেই। আজ সকলের চোখ জুড়িয়ে নেবার পালা। সিংহাসনে আরোহন করেই মহান আল্লাহর আদেশে জনসমূদ্র সম্মুখে ফরমালেন, জেনে রাখ! আমি পূর্ব-পশ্চিমের বাদশাহ হই।
কি বড়-কি ছোট, বয়স্ক- কি শিশু, জ্ঞানী- কি মূর্খ্য সকলেই একাকার। উপস্থিত-অনুপস্থিত সকলেই অবনত মস্তকে তাঁহার বশ্যতা স্বীকার করে নিলো। ‘জয় জাহাঁগীর’ রবে আকাশ-বাতাশ প্রকম্পিত হল। সারা জাহানে ছড়িয়ে পড়লো জাহাঁগীরি তখতে সমাসীন নব বাদশাহের নাম।
হযরত ফরমালেন, আমার পরম মহাত্মা পীর-মুর্শিদ(ক) তাঁহার প্রভুমিলনের পর প্রকাশ্যে শিক্ষাদানের পরিবর্তে গোপনীয়ভাবে রূহানী শিক্ষা প্রদান করলেন আর আমাকে লক্ষ লক্ষ লোকের পীর বানিয়ে দিলেন।
উল্লেখ্য আরও বহু প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ঘটনাবলি, প্রমাণাদি তাঁহার খেলাফত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঘটেছিল। বিভিন্ন কিতাবাদিতে এবং সিলসিলার পীরানে এযামগণ দ্বারা এসব সাব্যস্ত। সকল কিছুই এখানে সন্নিবেশিত হয় নি।
“হযরতের পবিত্র বদন”
শাহ জাহাঁগীর হযরত শমছুল আরেফীন (ক) অত্যন্ত সুন্দর ও সুগঠিত শারীরিক সৌন্দর্য্যের অধিকারী ছিলেন। মুখমন্ডল গোলাকার ও পূর্ণ চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ছিল। উচ্চতা মধ্যমাকার। সাধারনের মাঝে দাঁড়ালে তাঁহাকেই সকলের চাইতে উচ্চ মনে হত। তাঁহার মস্তক অত্যন্ত সম্ভ্রমযুক্ত। যাহাই তাঁহার মাথায় পড়ানো হত তাহাই তাজ সদৃশ্যরূপে শোভা পেত। চোক্ষুজোড়া পদ্মফুলের মতন যাহার সাদা অংশ অত্যন্ত পরিষ্কার হালকা রক্তিমবর্ণ বিশিষ্ট ছিলো। চওড়া বাহুদ্বয় তাঁহার পবিত্র শরীরের বিশেষ সৌন্দর্য্য বর্ধন করেছিলো। তাঁহার পদযূগল মধ্যমাকৃতির, দীর্ঘ, কোমল এবং মাংসপরিপূর্ণ ছিলো। দাঁড়ি মোবারক শরীয়ত সম্মত দীর্ঘ এবং পবিত্র চুল কাঁচা-পাকা ছিলো। কন্ঠস্বর গুরুগম্ভীর এবং শ্রুতিমধুর ছিলো। সব দিক দিয়ে নিরীক্ষা করলে এমন সুগঠিত আকৃতির সৃষ্টি লক্ষ্যে মেলা ভার। তাঁহার পবিত্র চেহারার প্রতিপত্তি এতই প্রখর ছিলো যে তাঁহার চেহারায় তাকিয়ে থাকা কাহারও পক্ষে সম্ভবপর ছিলো না। তাঁহার পবিত্র চক্ষুদ্বয়ের এমন প্রভাব ছিলো, চোখে চোখ রেখে কথা বলা দুঃসাধ্য ছিলো।
“হযরতের দৈনন্দিন জীবন যাপন”
হযরত অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন জীবন-যাপন করতেন। পবিত্র মস্তকে সর্বদা শুভ্র চাঁদটুপি থাকতো। সাদা পাঞ্জাবী আর লুংগি তাঁহার অংগে শোভা পেত। তবে নামাজের ক্ষেত্রে তিনি সর্বদা ভিন্ন পরিচ্ছেদ গ্রহন করতেন যা তাঁহার নামাজ ও এবাদতের জন্যই নির্দিষ্ট ছিলো। ওরশ শরীফের সময়ে, জুমার ইমামতিতে, ঈদের জামাতে এবং অন্য কোন বিশেষ দিনে তিনি চন্দ্র খচিত জাহাঁগীরি তাজ সম্বলিত পাগড়ি পরিধান করতেন। শেরওয়ানীর সাথে উজ্জ্বল চৌগা এবং পায়জামা পড়তেন। সাথে নাগড়া জুতা মিলিয়ে এক অনন্য বেশ গ্রহন করতেন।হযরত কেবলা অত্যন্ত গোপনীয় এবাদতকারী ছিলেন। নিজেকে গোপন রাখতেন এবং লোকজনের অন্তরালে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকতেন। এমনভাবে ঘুমাতেন যেন জেগে আছেন। কেউ ডাকলেই সে ডাকে সাড়া দিতেন যেন ঘুমন্ত অবস্থাতেও সজাগ হয়ে সকলের দেখ-ভাল করছেন।
সকল বিষয়ে হযরত রাসূল মাক্ববুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের অনুসরনকারী ছিলেন। একেবারে সূক্ষ্ণ বিষয়েও সুন্নতের গায়রে পায়রবী হচ্ছে কি-না তটস্থ থাকতেন।
যদিও অত্যন্ত নিচু একটি পালংক তাঁহার হুজুরা শরীফে বিদ্যমান ছিল তথাপি তিনি তাঁহাতে অতি অল্প সময় আরাম করতেন এবং বেশিরভাগ সময় নিচে বিছানা পেতে শয়ন করতেন। যেকোন খাবারই গ্রহন করতেন। খাবার এবং পরিধানে তাঁহার কোন ফরমায়েশ ছিল না। মাঝে মধ্যে দু-তিনদিন অনাহারেই কাটিয়ে দিতেন। তবে ফাতেহা বিহীন কিছুই গ্রহন করতেন না। এই দরবারের চিরাচরিত এটাই নিয়ম যে এখানে ফাতেহাবিহীন কিছুই খাওয়া হয়না। সকল কিছুই খাবার পূর্বে ফাতেহা দেওয়া হয়। চাই তা ছোট্ট একখানা বিস্কিটই হোক না কেন।
অত্যন্ত ভোরে শয্যা ত্যাগ করে ফজরের নামাযান্তে সিলসিলার সকল অজিফা সম্পাদন করে আগন্তুক জনসাধারনের সাথে আলাপ করতেন। এরপর পবিত্র খানকা শরীফের ঘরবাড়ি, গাছ-পালা, পুকুর-দিঘী, ক্ষেত-খামার, রাস্তা-ঘাট ইত্যাদি তদারকি করতেন। দরবারে অবস্থিত এবং আগন্তুকগণের খাবার-দাবারের বন্দোবস্ত করতেন। খানকাহের সকল কাজ, দরবারের ভক্ত মুরীদানের দেখভাল স্বয়ং করতেন।
রোগ-শোক কখনো তাঁহাকে কাবু করতে পারতো না। তিনি সন্তুষ্টচিত্তে সব ধরনের অসুস্থতাকে প্রভূর রহমতজ্ঞান করে সয়ে যেতেন। চিকিৎসার প্রয়োজন হলে চিকিৎসা-পথ্য গ্রহন করতেন এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর শোকরানা আদায় করতেন। হযরত ফরমাতেন, রোগ তিন প্রকার। এক, আল্লাহ তা’আলার অভিশাপ, যদ্বারা পূর্বের পাপের শাস্তি প্রদান করা হয়। দুই, এমন রোগ যদ্বারা আল্লাহ পাক ধার্মিক লোকদের পাপ বিমোচন করেন। তিন, আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে রহমত। এই প্রকার রোগ দ্বারা আল্লাহ পাক প্রিয়জনদের উন্নতি দান করেন। যতই তাঁহাদের শরীরে রোগ জন্মে ততই তাঁহাদের গোপনীয় এবং বাহ্যিক অবস্থার উন্নতি সাধিত হয়। ইহাই আউলিয়া কেরামগণের রোগ।

 আস্তানা শরীফের সকলের আদর-অভ্যর্থনা, আবেদন-নিবেদন, থাকা-খাওয়া-পরা সকল কিছুই তাঁহার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ছিল। খানকাহ শরীফের পবিত্র মসজিদ, পীর মুর্শীদ মহাত্মা পিতা হযরত ফখরুল আরেফীন (ক) এবং পিতামহ জগত শ্রেষ্ঠ ওলী হযরত শাহ জাহাঁগীর শেখুল আরেফীন (ক) এর পবিত্র রওজা পাকই ছিলো তাঁহার ধ্যান-জ্ঞান। দায়রা শরীফ সংলগ্ন সুবিশাল দূর্লভ গ্রন্থরাজি সমৃদ্ধ লাইব্রেরীর তত্ত্বাবধান নিজ পাক হস্তে পরিচালনা করতেন। রওজা পাকের চারপাশে ফুলের বাগানের তত্ত্বাবধানও তাঁহার সুচারুহস্তে পরিচালিত হত। আস্তানা শরীফ সম্পর্কিত কোন কিছুই তাঁহার যতেœর বাইরে থাকতো না। ভক্ত-মুরিদ, লোক-জন, পশু-পক্ষী, গাছ-গাছালী, ফুল-ফলাদি তথা সকল কিছুই তাঁহার কৃপাদৃষ্টির অন্তরীন ছিল।
সেকালে ব্যাংক এর ব্যবস্থা না থাকায় লোকেরা তাঁহার দায়িত্বে টাকা-পয়সা গচ্ছিত রাখতেন। অতি যত্নসহকারে তিনি সেসবের তত্ত্বাবধান করতেন। যখনই প্রয়োজন হত ফেরত দিতেন। এতদপ্রসংগে একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য, এক ব্যক্তি ব্রিটিশ আমলের দশ-বিশ টাকার নোট মিলিয়ে এক হাজার টাকা হযরত কেবলার নিকট আমানত হিসেবে গচ্ছিত রেখে দূরবর্তী অঞ্চলে গিয়ে থিতু হলেন ষ এমতাবস্থায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে সরকার কর্তৃক বৃটিশ আমলের নোট বদলিয়ে পাকিস্তানি নোটে পরিবর্তন করে নেবার তারিখ নির্ধারন করা হল। ঠিক শেষদিন ঐ ব্যক্তির খেয়াল হল যে হযরতের নিকট তার এক হাজার ব্রিটিশ নোট রয়েছে। কিন্তু এক্ষনে সেথায় উপস্থিত হয়ে তাহা সংগ্রহ করে ব্যাংক এ গিয়ে পাকিস্তানি নোটে পরিবর্তন করা সম্ভবপর নয়। সুতরাং এ টাকা জলে গেল ভেবে সে অস্থির হয়ে গেল। হঠাৎ একটি ফার্সী কবিতা তার মনে পড়লো, ‘নিসত নিসয়ান ওয়া ফারামুশী বা-যাতে পাকে দোস্ত অর্থাৎ, বন্ধুর পবিত্র সত্ত্বার কোন ভুল-ত্রুটি নাই’। পরক্ষণেই সে চিন্তামুক্ত হয়ে গেল। হযরতের নিকটই গচ্ছিত। কল্যানকর বৈ কিই-বা হবে। নিশ্চিন্ত থেকে উক্ত টাকার আর খোঁজ নিল না। বহু মাস পর দরবারে উপস্থিত হলে হযরত কেবলা ব্রিটিশ টাকার পরিবর্তে পাকিস্তানি টাকা তাঁহাকে প্রদান করলেন। মূল ঘটনা এই যে, হযরত কেবলা টাকা পরিবর্তনের সে সময়েই তাঁহার নিকট গচ্ছিত ব্রিটিশ টাকাগুলি পাকিস্তানি টাকাতে নিজ দায়িত্বে পরিবর্তন করে রেখেছিলেন। এতে তার টাকাগুলো রক্ষা পেল। এমন আমানতদারীতাই হযরতের বৈশিষ্ট্য ছিলো।
একান্নবর্তী পরিবারে সকলের ভরন-পোষন, পাঠদান ইত্যাদি হযরত কেবলা স্বয়ং ব্যবস্থা করতেন। সকলের উচ্চ শিক্ষার ব্যয়ভার নিজেই বহন করতেন। তিনি সকলেরই তত্ত্বাবধানকারী ছিলেন। দরিদ্র মেহমানদের অকাতরে দান করতেন। দুস্থ যিয়ারতকারীদের যাতায়াতের ব্যবস্থাও করতেন। পাড়া-প্রতিবেশী গরীব আত্মীয়-স্বজনদের বিবাহের দায়িত্ব নিজে পবিত্র কাঁধে তুলে নিতেন। আর্থিক সাহায্য ছাড়াও নিজে পাশে দাঁড়িয়ে তদারকি করতেন। এসকল কিছুই পূর্ববর্তী পীরানে এযামগণের দেওয়া গুরুদায়িত্ব জ্ঞানে সম্পাদন করতেন।
“সমাজের অনন্য সেবক হযরত কেবলা (কঃ)”
হযরত সদা-সর্বদা গরীব-দুখীদের অভাব মোচন, কন্যা দায়গ্রস্থ পিতার ব্যয়ভার বহন, অসুস্থদের শুশ্রুষা ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকতেন। এছাড়া সমাজসেবার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের অপেক্ষা না করে জনহিতৈষী কাজসমূহ নিজ দায়িত্ব জ্ঞানে সুচারুরূপে সম্পাদন করতেন। এসবের বাস্তব সুফল আজও সকলে ভোগ করছে।
মির্জাখীল দরবার শরীফ সড়ক কয়েক গ্রামেরই প্রধান সড়ক হিসেবে বিবেচ্য। কিন্তু সড়কের দুরাবস্থার জন্য লোকজন নিতান্তই কষ্ট ভোগ করছিলো। হযরত এই দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিলেন। আশ্চর্য্যের বিষয়, মাত্র এক দিনেই দুই মাইল দৈর্ঘ্যের এবং ৩৩ফুট প্রস্থের এই রাস্তাটি পাঁচ ফুট উঁচু করে বারোটির মত ছোট পুল সহ সন্ধ্যার মধ্যেই সমাধা করে ফেললেন। এখনও পর্যন্ত এই রাস্তাটিই প্রধান সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাতকানিয়া থানা শহরে তখনও বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। কিন্তু হযরত কেবলা নিজ গ্রামে বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের ব্যবস্থা করে নেন। আশ্চর্য্যের বিষয়, পরবর্তীতে বিদ্যুতের ঐ লাইন হতেই থানা শহর এবং অন্যান্য গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা হয়। এ যেন জাহাঁগীরি রৌশনীতে চারপাশ আলোকজ্জ্বল হবার মতন ব্যাপার!
কয়েকগ্রাম মিলিয়ে কোন টেলিফোন লাইনের ব্যবস্থা ছিলো না। নিজ গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য হযরত টেলিফোন লাইনের ব্যবস্থা করেন। এছাড়া পত্র-যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের খাতিরে একটি পোস্ট অফিস স্থাপন করেন।
টেলিফোন লাইন এবং পোস্ট অফিসের মাধ্যমে হযরত কেবলা চারপাশের কয়েকগ্রামকে মুহূর্তেই সারাদেশ এবং পরবর্তীতে সারাবিশ্বের সাথে জুড়ে দিলেন। গ্রামের ব্যবসায়ীদের ব্যবসা-বানিজ্যের জন্য এবং লোকজনের বাজার-সদাইয়ের জন্য বহুদূর কস্ট করে যেতে হত। হযরত নিজ উদ্যোগে দরবার শরীফের গেটের অদূরে একটি সাপ্তাহিক বাজার স্থাপন করেন। উক্ত সময়ে ‘দরগাহ বাজার’ এবং বর্তমান সময়ে ‘বাংলা বাজার’ নামে প্রসিদ্ধ এই বাজারটি কয়েকগ্রামের ব্যবসা বানিজ্যের মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বলাবাহূল্য, এতসব সামাজিক কার্য্য সমাধা করার ক্ষেত্রে তিনি জনসাধারণের নিকট হতে কানাকড়ি অনুদান গ্রহন করেন নি!
এছাড়াও হযরত কেবলা নিজ তত্ত্বাবধানে স্বশরীরে অথবা একেবারে অসম্ভব হলে পরামর্শ এবং নির্দেশের মাধ্যমেই বহু মসজিদ মক্তব তৈরি, কূপ খনন ইত্যাদি কার্য্যের মাধ্যমে জনকল্যানমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
বলা যায়, এসব কর্মের মাধ্যমেই সমাজ সম্পর্কে হযরতের তীক্ষ্ণ জ্ঞান, সুদুরপ্রসারী চিন্তা এবং ভবিষ্যত প্রয়োজন সম্পর্কে হযরতের দৃষ্টিভংগী সকল কিছুই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
“পবিত্র হজ্ব পালন”
সন ১৯৬৩ইং। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পবিত্র কা’বা শরীফে গিলাফ পরানোর সৌভাগ্য লাভ করে। কার পবিত্র হস্তে এই গিলাফ শরীফ পরানো যায় এ বিষয়ে বহু ভাবনার পর অবশেষে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক যুগের শ্রেষ্ঠ তাপস হযরত শাহ জাহাঁগীর শমছুল আরেফীন (ক) এর নেতৃত্বে এবং তাঁহার পবিত্র হস্তেই এই মহান কার্য্য সমাধা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
হযরত কেবলার নিকট আর্জি পেশ করা হলে তিনি সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। তিনি তাঁহার ছয়জন সফরসংগী সহকারে সৌদি সরকারের রাজকীয় মেহমান হিসেবে পবিত্র হজ্জ্ব পালনে গমন করেন। তৎকালীন সরকারী নিয়মানুযায়ী হজ্বের পূর্বে পবিত্র মদীনা শরীফ গমন আইন বিরোধী ছিলো। কিন্তু হযরত দৃঢ়কন্ঠে জানিয়ে দিলেন, যাকে বাদ দিলে এই দুনিয়ার কিছুরই অস্তিত্ব থাকেনা তাঁহার দুয়ারে হাজেরি না দিয়ে কোনমুখে পবিত্র কা’বার সম্মুখে দাঁড়াব?

হযরত সায়্যিদুল মুরসালিনের দরবারে হাজেরি ব্যতীত কা’বায় উপনীত না হবার সিদ্ধান্তে অটল থেকে আল্লাহ পাকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে লাগলেন। তাছাড়া তাঁহার উপরস্ত পীরানগণের ক্ষেত্রেও এমনই হয়েছিলো। এটাই তাঁহাদের সুন্নত। আল্লাহর ওলীগনের আকাঙ্ক্ষাই আল্লাহর ইচ্ছা! অবশেষে সৌদি সরকারের নিয়ম পরিবর্তন করা হল। হযরত প্রথমে মদীনা শরীফ যেয়ারত সম্পন্ন করে সেখান থেকেই পবিত্র হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে কা’বা ঘরের দিকে রওয়ানা দেন। পবিত্র হজ্ব সম্পাদন করে আবারও তিনি মদীনা পানে ছুটে যান। সেথায় যেয়ারত শেষে দেশে ফিরেন।
“হযরতের ওফাত পূর্ববর্তী গোপন সংবাদ”
খুব কম সংখ্যক আউলিয়া কেরামগণই ইন্তেকালের পূর্বসংবাদ পেয়ে থাকেন। হযরত গৌছে পাক রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক এরূপই বর্ণিত আছে। এই সংবাদ অত্যন্ত বিরল আউলিয়াগণকেই দেওয়া হয়। হযরত শমছুল আরেফীন সাহেব কেবলার (ক) ক্ষেত্রে এমনটিই হয়েছিল। নিঃসন্দেহে তিনি বিরল আউলিয়াগণেরই একজন ছিলেন। ওফাত শরীফের পূর্বে হযরত কেবলা (কঃ) তাঁহার একজন ঘনিষ্ট মুরীদকে ডেকে ফরমালেন, আগামীকাল কত তারিখ, কোন দিবস হয়? ভক্ত উত্তর দিলেন, ভাদ্র মাসের প্রথম সোমবার। হযরত ফরমালেন, ঐ দিনই আমার মুর্শিদ পিতা সাহেব কেবলা এবং মহাত্মা দাদা সাহেব কেবলার ওফাত হয়েছিল। রাসূল মাকবূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র পর্দাও এই দিবসেই হয়েছিলো। অতএব, এই সোমবার দিবসই আমার ওফাতের দিবস হবে।
“হযরতের বেসাল শরীফ”
আলমে গায়ব হতে সংবাদ প্রাপ্তির পর হতেই হযরত শাহ জাহাঁগীর শমছুল আরেফীন সাহেব কেবলা (কঃ) প্রভূমিলনে অস্থির হয়ে পড়লেন। ধীরে ধীরে তাঁহার শারিরীক শক্তি হীন হয়ে আসতে লাগলো। তিনি শয্যাশায়ী হলেন। দূর-দূরান্ত হতে লোকজন, ভক্ত-মুরীদান দরবারে ভীড় জমাতে লাগলেন। সোমবার দিবাগত রাতে তাঁহার শারীরীক দূর্বলতা আরও বৃদ্ধি পেল। সোমবার সকালে তিনি ফরমালেন, সূর্য্য ভালোভাবে উদিত হয়েছে কি? খাদেম উত্তর দিলেন, অনেক্ষন হয় হযরত, সূর্য্য উদিত হয়েছে।
হযরত যেন সেই অপেক্ষাতেই ছিলেন। তাঁহার পবিত্র ওষ্ঠদ্বয় খানিক নড়ে উঠলো এবং সাথে সাথেই সকল জগতকে, জগতের সৃষ্টিকূলকে কাঁদিয়ে পরম করুনাময়ের সহিত মহামিলন প্রাপ্ত হলেন। (আল্লাহ তাঁহার বরকতে আমাদের বরকতময় করুন)।
১৩৯১হিজরীর ২৪শে জমাদিউসসানী, ১৬ই আগস্ট, ১৯৭১ইংরেজী, ১লা ভাদ্র, ১৩৭৮বংগাব্দ পবিত্র সোমবার দিবসে হযরত শাহ জাহাঁগীর শমছুল আরেফীন সাহেব কেবলা বেসালপ্রাপ্ত হলেন।
বেসাল শরীফের পরপরই তাঁহার পবিত্র মুখমন্ডল সূর্য্যের ন্যায় জ্যোতির্মান, পূর্ণ চাঁদের ন্যায় আলোকোজ্জ্বল হল। পবিত্র শরীর হতে অত্যধিক সুবাসিত ঘাম নির্গত হল। স্বর্গীয় সৌরভে চতুর্দিক সুরভিত হল। উপস্থিত সকলেই এই দৃশ্য দেখে এমন মহাত্মার জগৎ বিদায়ে হুঁশ হারালেন। জল-তরঙ্গ হু হু করে উঠলো। বাতাস ক্রন্দনে ভারী হয়ে উঠলো।
সারাদেশে মূহুর্তেই সংবাদ পৌঁছে গেল। ভারত, পাকিস্তান, আরব, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ ধীরে ধীরে সারাবিশ্বে সংবাদ পৌছুল। তাঁহার বিয়োগে কেহ রাস্তাধারে, কেহবা গৃহে ক্রন্দনে বুক ভাসালো। কেহ বা প্রিয়জন হারানোর ব্যাথা সইতে না পেরে মুর্ছা গেল।
মঙ্গলবার জোহরের নামাজের পরে পবিত্র হুজরা শরীফে হযরত কেবলার (কঃ) গোসল দেওয়া হল। তাঁহার পবিত্র অসিয়ত অনুযায়ী তাঁহারই সুযোগ্য, মনোনীত পরবর্তী সাজ্জাদানশীন, তাঁহারই তত্ত্বাবধানে লালিত শাহ জাহাঁগীর হযরত সৈয়দুনা মৌলানা তাজুল আরেফীন সাহেব কেবলা (কঃ) বিশাল জমায়েতে নামাজে জানাযার ইমামতি করলেন।
হযরত শমছুল আরেফীন (কঃ) পরবর্তী মির্জাখীল দরবার শরীফ – মির্জাখীল দরবার শরীফের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য এই যে, এ স্থানের মুরীদানদের কখনো পিতৃহারা হতে হয় নি। হয় গায়বীভাবে তাদের তত্ত্বাবধান করা হয়েছে, নয়তো সরাসরি।
“হযরত শাহ জাহাঁগীর তাজুল আরেফীন (কঃ)”
হযরত শাহ জাহাঁগীর শমছুল আরেফীন (ক) দুনিয়াবী জীবনেই তাঁহার পরবর্তী সম্রাট নির্বাচন করে গিয়েছিলেন। তিনিই যুগশ্রেষ্ঠ তত্ত্বজ্ঞানী, যুগের শিবলী, চৌদ্দ তরীকার মহারাজ হিসেবে বর্তমানে জাহাঁগীরি শাহী মসনদে অধিষ্ঠিত শাহ জাহাঁগীর রাবে’ (চতুর্থ) হযরত মৌলানা মুহাম্মদ আরেফুল হাই সাহেব কেবলা (কঃ)।
দুনিয়ায় আগমনের পর হতেই যিনি হযরত শমছুল আরেফীন সাহেব কেবলার (কঃ) সরাসরি তত্ত্বাবধানে লালিত। তিনিই অভিভাবক হয়ে তাঁহাকে পরিচালনা করেছেন। যখনই কেহ হযরত শমছুল আরেফীন সাহেবকে (কঃ) তাঁহার পরবর্তী সাজ্জাদানশীন সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করতেন, হযরত কেবলা তাঁহার ভাতুষ্পুত্র হযরত মৌলানা আরেফুল হাই সাহেব কেবলার (কঃ) প্রতি ইংগিত করতেন।
আস্তানা শরীফের সকল কাজের আঞ্জাম তাঁহার পবিত্র হস্তে সম্পাদনের মাধ্যমে আস্তানা শরীফ সংশ্লিষ্ট সকল কিছুর দেখভালের এবং নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষার তলকীন দিতেন। একদা তাঁহার হুজরা শরীফ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ফরমালেন, আমার হুজরা শরীফে কামাল মিয়াই (হযরত তাজুল আরেফীন সাহেব কেবলার ডাক নাম) থাকবেন। পূর্বের মহাত্মাগণের অনুকরনে ভক্ত-মুরিদগন, দরবারের মনোনীত দেশ-বিদেশের বুজুর্গান, আউলিয়া কেরামগন তাঁহার মাঝেই পূর্ববর্তী পীরানগনের ছায়া দেখতে লাগলেন। তিনি যেন পূর্ববর্তী শাহ জাহাঁগীর হযরত মৌলানা শেখুল আরেফীন (ক), মৌলানা ফখরুল আরেফীন(ক) এবং মৌলানা শমছুল আরেফীন (ক) কেবলাগণের সমন্বিত রূপ।
ভারত, পাকিস্তানসহ যেখানেই তিনি সফর করেছেন সকলেই তাঁহার মাঝে পূর্বতন মহাত্মাগনদের প্রতিকৃতি খুঁজে পেয়েছেন। সকলেই অবনত মস্তকে তাঁহার বশ্যতা স্বীকার করেছেন। (তাঁহার কৃপাদৃষ্টি অধমের উপরেও পতিত হোক)।
হযরত শাহ জাহাঁগীর শমছুল আরেফীন সাহেব কেবলার (ক) লোকান্তরের পর তাঁহার পরিচালিত নিয়মেই তিনি দরবার পরিচালনা অব্যাহত রাখলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে মসনদে উপবেশনের আগেই তিনি পূর্ববর্তী মহাত্মাগনের অনুসরনে শিক্ষার সকল পর্ব সমাপন করে দেশ-বিদেশ সফর, সামাজিক কর্মকান্ড, আস্তানা পাকের দেখভাল সকল কিছুই জারী রাখলেন।
দরবারের দেড়শত বছর ধরে চলমান কোন নিয়মের এতটুকু ব্যত্যয় ঘটতে দিলেন না। দরবার সংলগ্ন বাজারে হযরত শমছুল আরেফীন (ক)এর ব্যাংক প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে নিজ স্বপ্নজ্ঞানে বাস্তবায়ন করেন। তাঁরই স্ব-উদ্যোগে দরগাহ বাজারে প্রথম প্রতিষ্ঠা হয় ‘অগ্রনী ব্যাংক’। গ্রামে তিনি স্ব-উদ্যোগে আনসার ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করে তার পরিচালনা করেন। এক্ষেত্রে তিনি স্বয়ং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আনসার ট্রেনিং সম্পন্ন করে নিজেকে প্রস্তুত করে নেন। এলাকার ক্রস-ড্যাম্প নির্মাণেও তিনি অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন।
চট্টগ্রামের সাথে মির্জাখীল সড়ক যোগাযোগ স্থাপনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা এবং পদক্ষেপের কারনে সমগ্র সাতকানিয়াবাসী তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে আজীবন।
বর্তমানেও তিনি আধ্যাত্মিক কার্য্য সাধনের পাশাপাশি বেকারের কর্মসংস্থান, এলাকার উন্নয়ন, নারীশিক্ষার সু-ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনে কাজ করে চলেছেন।
এক্ষেত্রে তাঁহাকে পূর্ণ সহযোগীতা করছেন তাঁহারই জানশীন, সুযোগ্য সাহেবজাদা, জাহাঁগীরি দরবারের যুবরাজ, আধ্যাত্মিক জগতের মহারাজ, আস্তানা আলীয়া জাহাঁগীরিয়ার সাহেবে সাজ্জাদাহ, শাহ জাহাঁগীর ইমামুল আরেফীন হযরত মৌলানা ডক্টর মুহাম্মদ মকছুদুর রহমান সাহেব কেবলা (কঃ)।
“হযরত শাহ জাহাঁগীর ইমামুল আরেফীন (কঃ)”
মহাত্মাগণের খেতাব ‘শাহ জাহাঁগীর’ আর আলমে গায়বের লক্বব ‘ইমামুল আরেফীন (আরেফগণের ইমাম) দ্বারা তিনি ইতিমধ্যেই ভূষিত হয়েছেন। তিনি যেন পুর্ববর্তী পীরানপীরদের বাস্তব হুবহু প্রতিচ্ছবি। তিনি হযরত ডক্টর মৌলানা মুহাম্মদ মকছুদুর রহমান (কঃ) শিক্ষা-দীক্ষা-আধ্যাত্মিক সাধনায় যাঁহাকে ভারতবর্ষেও গউসে যমান হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রেই বুজুর্গ মুহাদ্দিস কর্তৃক যিনি কুতুব হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। যাঁহার প্রতি পদক্ষেপেই পূর্ববর্তী মহাত্মাগনের স্মরণ হয়। স্বীয় পূজনীয় পিতার ন্যায় তিনিও দুনিয়াবী শিক্ষা, আধ্যাত্মিক জ্ঞান সাধনার পাশাপাশি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন জনহিতৈষী কর্মকান্ডে।
পিতার প্রদত্ত সকল দায়িত্ব নিপুন কর্মে সম্পাদন করে চলেছেন। পবিত্র আস্তানাপাকের দেখভাল, ভক্ত-মুরিদানদের হাল-হাকীকত সামলানো, পীরানপীরগণের ফাতেহা-ওরশ শরীফের এন্তেজাম করা, প্রতিদিনের ফাতেহা শরীফ পরিচালনা করা, মাজার শরীফ হতে আরম্ভ করে একটি ছোট্ট ফুলের পরিচর্যায়ও নিজেকে ব্যস্ত রেখে তিনি উপরস্তগণের সঁপে দেওয়া দায়িত্বকে সুচারুরূপে সম্পাদন করে চলেছেন।
জ্ঞান চর্চায় তাঁহার জুড়ি মেলা ভার। জ্ঞানের এমন কোন শাখা নেই যেথায় তাঁহার বিচরন নেই! খোদ জ্ঞান তাপসগণ তাঁহাতে আচ্ছন্ন থাকেন। শ্রেষ্ঠ শিক্ষকগন তাঁহার সান্নিধ্যে সময় কাটানোয় গর্ববোধ করেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে বহু স্বর্ণপদকসহ সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী এই মহান ব্যক্তিত্ব সুফি তত্ত্বের চর্চা, শরীয়ত-তরীকতের সুষ্ঠু পরিপালন, সামাজিক দায়িত্বে নিষ্ঠাবান চরিত্র হিসেবে সারা জাহান মাতোয়ারা করে রেখেছেন। যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ হিসেবে শ্রেষ্ঠ মনীষীগন তাঁহাকে মেনে নিয়েছেন। সিলসিলার পীরানপীরগণ তাঁহাকে আধ্যাত্মিক সাম্রাজ্যের গর্ব-জ্ঞানে মেতে উঠেছেন। রূহানী জগতের মহান নেয়ামতরূপে তাঁহাকে সম্বোধন করছেন।
দেশ-বিদেশের যেথায় তিনি সফর করেন, সকলেই তাঁহার পবিত্র অস্তিত্ব সম্মুখে মস্তক অবনত করে নেয়। ভাল কি মন্দ, বিশ্বাসী কি অবিশ্বাসী সকলেই তাঁহার পবিত্র হাজেরিতে লুটিয়ে পড়ে। জ্ঞানীগণ তাঁহার পবিত্র জ্ঞানের প্রভাবে জ্ঞান হারায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সুন্নতের অনুসরন, পূর্বতন মহাত্মাগণের অনুসরন, বিনয়-নম্রতায় তাঁহার মতন দ্বিতীয় মেলা ভার। নিঃসন্দেহে কেহ যদি হযরত মৌলানা শেখুল আরেফীন (কঃ), হযরত মৌলানা ফখরুল আরেফীন (কঃ), হযরত মৌলানা শমছুল আরেফীন (কঃ) এবং হযরত মৌলানা তাজুল আরেফীন (কঃ) সাহবেগণকে এক দর্পনে দেখতে চান তবে হযরত শাহ জাহাঁগীর ইমামুল আরেফীন সাহেব কেবলার (কঃ) দর্শনেই তাহা সম্ভব। শরীয়ত-তরীকতের মেল-বন্ধনে বিরল মৌচাক হয়ে যিনি অকাতরে মধু বিলিয়ে যাচ্ছেন।
ধন্য এদেশ, ধন্য এদেশের মাটি। এদেশের ধুলি-কণা, আলো-বাতাস, ধন্য আমরা সকলেই। এমন পাক মহাত্মাগণের কদম ধুলি চোখের সুরমা রূপে আমরা ধারন করার সুযোগ পাচ্ছি।
রাব্বুল আলামীন এমন আস্তানা পাক হতে কল্যাণ অর্জন করার তৌফিক দান করুন। তাঁহার প্রিয় আউলিয়া কেরামগণের অনুসরন এবং তাঁহাদের ভালোবাসার মাধ্যমে আমাদের উভয় জগতে কামিয়াব করুন।