banner

শেষ আপডেট ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,  ১৯:৫৯  ||   শনিবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০২১ ইং, ৩ আশ্বিন ১৪২৮

ভাসাভি ফ্যাশনের গ্রাসে বেসিক ব্যাংকের ৩১৭ কোটি টাকা !

ভাসাভি ফ্যাশনের গ্রাসে বেসিক ব্যাংকের ৩১৭ কোটি টাকা !

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৭:১৮ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ভাসাভি ফ্যাশনের গ্রাসে বেসিক ব্যাংকের ৩১৭ কোটি টাকা !

বিশেষ প্রতিবেদক ::

ফ্যাশন হাউজ ভাসাভির উত্থান আর রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের লুণ্ঠন এ দুটি একই সূত্রে গাঁথা। ২০১২ সাল-পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই একের পর এক ফ্যাশন শোর আয়োজন করে ভাসাভি। এসব ফ্যাশন শোতে ভিড় বাড়তে থাকে দেশী-বিদেশী অভিনেতা, অভিনেত্রী ও মডেলদের। একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক থেকে ভাসাভি গ্রুপের নামে বেরোতে থাকে শত কোটি টাকার ঋণ। যদিও ঋণ হিসাবে নেয়া সে অর্থ আর বেসিক ব্যাংকে ফেরেনি। সুদসহ বর্তমানে ভাসাভি গ্রুপের কাছে বেসিক ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩১৭ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের মধ্যে ভাসাভি গ্রুপের সব ঋণই ব্যাংকটির খেলাপির খাতায় উঠেছে।
শুধু বেসিক ব্যাংকই নয়, ভাসাভি ফ্যাশনের চেয়ারম্যান ইয়াসির আহমেদ খান তানিম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল জামান মোল্লা বড় অংকের অর্থ বের করেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক থেকে। ২০১২ সাল-পরবর্তী সময়ে নেয়া এ ঋণের অর্থও ব্যাংক দুটিতে ফেরেনি। এর মধ্যে রূপালী ব্যাংকে কামাল জামান মোল্লার দুটি কোম্পানির ঋণের পরিমাণ ১৩৫ কোটি টাকা। আর অগ্রণী ব্যাংকে ইয়াসির আহমেদ খান তানিমের কোম্পানির ঋণ রয়েছে ২০০ কোটি টাকার বেশি। বেসিকের মতো ভাসাভি ফ্যাশনের এ দুই কর্ণধারের কাছ থেকে অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকও ঋণ আদায় করতে পারছে না।
ভাসাভি ফ্যাশন দেশের অভিজাত শ্রেণীর কেনাকাটার সুপরিচিত একটি ব্র্যান্ড। এ ফ্যাশন হাউজটির একমাত্র শোরুম রাজধানীর গুলশানে। শাড়ি-পাঞ্জাবি, গহনাসহ বিদেশী পণ্য আমদানি করে উচ্চমূল্যে দেশে বিপণন করে ফ্যাশন হাউজটি। ২০০৬ সালে ভাসাভি ফ্যাশনের যাত্রা হলেও ২০১২ সালে হঠাৎ করেই আলোড়ন তোলে ভাসাভি। একের পর এক ফ্যাশন শো আয়োজনের মাধ্যমে শোবিজ পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে ভাসাভির নাম। প্রতিষ্ঠানটির যেকোনো অনুষ্ঠানেই ভিড় করতে থাকেন দেশের নামিদামি সব অভিনেত্রী-মডেল। বিদেশী মডেলরাও যোগ দিতে আসেন ভাসাভি আয়োজিত বিভিন্ন ফ্যাশন শোতে। এখনো ফ্যাশন হাউজটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে অভিজাত শ্রেণীকে ঘিরে। বর্তমানে শোরুমটিতে ৫ হাজার থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত দামের পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে। শাড়ি-লেহেঙ্গা পাওয়া যায় সর্বনিম্ন ২৫ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকায়। তবে শুরু থেকেই ভাসাভি ফ্যাশনের কার্যক্রম থেকেছে রহস্যাবৃত। নানা বিতর্ক রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা ইয়াসির আহমেদ খান তানিম ও কামাল জামান মোল্লার তৎপরতা নিয়েও।
সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা ও মরিয়ম আক্তার মৌ। এ দুই কথিত মডেলের গ্রেফতারের সঙ্গে নাম জড়িয়েছে ভাসাভি ফ্যাশনের। এ ঘটনায় ভাসাভি ফ্যাশনের ব্যবসায়িক কর্মকান্ডের পাশাপাশি ইয়াসির আহমেদ খান তানিম ও কামাল জামান মোল্লার তৎপরতার বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ একজন কর্মকর্তা বলেন, ভাসাভি ফ্যাশনের চেয়ারম্যান ও এমডির সঙ্গে দেশের অনেক মডেল-অভিনেত্রীর নিবিড় সম্পর্কের তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকার ঋণ বের করে নেয়ার ক্ষেত্রে এসব মডেল-অভিনেত্রীর কোনো প্রভাব ছিল কিনা, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভাসাভির বিভিন্ন ফ্যাশন শোতে বিদেশী মডেলরাও অংশ নিত। ফ্যাশন শোর বাইরে বিদেশী মডেলরা আর কোথায় কোথায় যেত, সেগুলোর বিষয়েও খোঁজ নেয়া হচ্ছে।

 
ব্যাংকাররা বলছেন, বেসিক ব্যাংক লুটের অর্থে ভাসাভি ফ্যাশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির দুই উদ্যোক্তা রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকগুলো থেকেও নামে-বেনামে ঋণ বের করে নিয়েছেন। কিন্তু সে ঋণের অর্থ তারা ফেরত দেননি। দুর্নীতি দমন কমিশন বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের মামলায় ইয়াসির আহমেদ খান তানিম ও কামাল জামান মোল্লাকে গ্রেফতার করেছিল। ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেয়ার শর্তে তারা জামিন পেলেও অনেক আগেই শর্ত ভঙ্গ করেছেন। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেও ভাসাভি উদ্যোক্তাদের বিলাসী জীবনযাপনে কোনো ছেদ পড়েনি। উল্টো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে তারা নামে-বেনামে আরো ঋণ বের করে নেয়ার চেষ্টা করছেন।
বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণ বের করতে ভাসাভি উদ্যোক্তারা ব্যবহার করেছেন পাঁচটি কোম্পানির নাম। এর মধ্যে ভাসাভি ফ্যাশন লিমিটেডের নামে ৮৭ কোটি, তাহমিনা ডেনিম লিমিটেডের নামে ৫২ কোটি, তাহমিনা নিটওয়্যার লিমিটেডের নামে ৬০ কোটি, ওয়াটার হ্যাভেন করপোরেশনের নামে ৬৭ কোটি এবং ট্রেড হাউজের নামে ৫০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। বেসিক ব্যাংকের তথ্য বলছে, মোট ৩১৭ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটির কাছে ১১৫ কোটি টাকার জামানত রেখেছে ভাসাভি গ্রুপ। যদিও জামানত হিসেবে থাকা সম্পদের প্রকৃত মূল্য নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। ২০০৯ সাল-পরবর্তী সময়ে চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন পর্ষদ যেসব ঋণের অনুমোদন দিয়েছে, তার জামানতের মূল্য কয়েক গুণ বেশি দেখানো হয়েছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে।
ট্রেড হাউজের নামে ২০ কোটি টাকার সিসি ঋণ নেয়ার মাধ্যমে বেসিক ব্যাংক লুণ্ঠনে অংশ নেয় ভাসাভি গ্রুপ। ২০১২ সালের ৩১ মে এ ঋণ অনুমোদন দেয় বেসিক ব্যাংক পর্ষদ। এরপর ২০১৩ সালের ২ এপ্রিল ভাসাভি ফ্যাশনের নামে ৪৪ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। তাহমিনা ডেনিম, তাহমিনা নিটওয়্যার ও ওয়াটার হ্যাভেন করপোরেশনের নামে ঋণ বের করা হয় ২০১৪ সালের অক্টোবর ও ডিসেম্বরে। কিন্তু কিস্তি পরিশোধ না করায় ২০১৪ সালের মে থেকে খেলাপির খাতায় উঠতে শুরু করে ভাসাভি গ্রুপের ঋণ। খেলাপি হওয়ার পর থেকে গত ছয় বছরে গ্রুপটি মাত্র ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। এ ঋণের অর্থ আদায় করার জন্য ইয়াসির আহমেদ খান তানিম ও কামাল জামান মোল্লাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বেসিক ব্যাংক।

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় ভাসাভি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এমডির বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় বেসিক ব্যাংকের উপ মহাব্যবস্থাপক শিফার আহমেদ, উপব্যবস্থাপক এসএম জাহিদ হাসান (চাকরিচ্যুত) ও সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মঞ্জুর মোরশেদসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়। মামলার এজহারে বলা হয়, আসামি ইয়াসির আহমেদ খান ও কামাল জামান মোল্লা গুলশানের বেসিক ব্যাংক লিমিটেডের শাখা থেকে ভুয়া জামানত দিয়ে এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ৪৯ কোটি ৯৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। একই দিন আসামিদের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ আত্মসাতের অভিযোগে আরো দুটি মামলা হয়। পরে ২০১৬ সলের ৭ ডিসেম্বর ইয়াসির আহমেদ খান তানিম ও কামাল জামান মোল্লাকে গ্রেফতার করে দুদক। যদিও কিছুদিনের মধ্যেই তারা জামিনে মুক্ত হয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন।
এ বিষয়ে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনিসুর রহমান বলেন, গত এপ্রিলে আমি বেসিক ব্যাংকে যোগদান করেছি। এরই মধ্যে ব্যাংকের ঋণখেলাপিদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। ভাসাভি গ্রুপের ঋণগুলো ২০১৪-১৫ সালের মধ্যেই খেলাপি হয়ে গিয়েছিল। বেসিক ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব নেয়ার পর আমি ভাসাভির চেয়ারম্যান ইয়াসির আহমেদ খান তানিমকে ডেকেছিলাম। তাকে ব্যাংকঋণ পরিশোধের বিষয়ে তাগিদ দিয়েছি। তিনি ঋণটি পুনঃতফসিলের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন।

২০১০ সাল-পরবর্তী ছয় বছর রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের এমডির দায়িত্বে ছিলেন এম ফরিদ উদ্দিন। অনিয়ম-দুর্নীতি ও বাছবিচার ছাড়াই ওই সময়ে বড় বড় ঋণ বিতরণ করেছিলেন তিনি। এম ফরিদ উদ্দিনের বিতরণ করা অনেক ঋণ বারবার পুনঃতফসিলের পরও ফেরত আসছে না। খেলাপি হওয়ার পথে থাকা এ রকমই একটি ঋণ হলো ভাসাভি ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল জামান মোল্লার। ওয়াটার হ্যাভেন করপোরেশন ও মেগা ট্রেডার্স নামের দুটি কোম্পানির মাধ্যমে রূপালী ব্যাংক থেকে ঋণ বের করেছেন তিনি। এর মধ্যে ওয়াটার হ্যাভেন করপোরেশনের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি টাকা। আর ৬৫ কোটি টাকা ঋণ আছে মেগা ট্রেডার্সের নামে। রাজু আহমেদ ও জহুরুল ইসলাম নামের দুই ব্যক্তি এ কোম্পানির স্বত্বাধিকারী দেখানো হলেও ঋণের সুবিধাভোগী কামাল জামান মোল্লা বলে রূপালী ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে রূপালী ব্যাংকের আগামী পর্ষদ সভায় পর্যালোচনা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল্ মাসুদ বলেন, ওয়াটার হ্যাভেন করপোরেশন ও মেগা ট্রেডার্স যথা সময়ে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেনি। এ ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও ত্রুটিবিচ্যুতি ছিল। দুটি প্রতিষ্ঠানের ঋণই খেলাপি হওয়ার পথে।
সামগ্রিক বিষয়ে ভাসাভি ফ্যাশনের চেয়ারম্যান ইয়াসির আহমেদ খান তানিম বলেন, আমি ভাসাভি গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ভাসাভি ফ্যাশন, তাহমিনা ডেনিম ও তাহমিনা নিটওয়্যারের চেয়ারম্যান। বেসিক ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ওয়াটার হ্যাভেন করপোরেশন ও ট্রেড হাউজের সঙ্গে আমি নেই। এ দুটি প্রতিষ্ঠান কামাল জামান মোল্লার। অগ্রণী ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনো ব্যাংকে আমার ঋণ নেই। বেসিক ব্যাংকের ঋণ পুনঃতফসিল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য ডাউন পেমেন্ট জমা দেয়া হয়েছে। তবে চেষ্টা করেও ভাসাভি ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল জামান মোল্লার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার সেলফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।