banner

শেষ আপডেট ১৬ এপ্রিল ২০২১,  ২২:২১  ||   শনিবার, ১৭ই এপ্রিল ২০২১ ইং, ৪ বৈশাখ ১৪২৮

আমি ৭১’র বিজয় দেখিনি, দেখেছি যুদ্ধাপরাধী’র বিচার

আমি ৭১’র বিজয় দেখিনি, দেখেছি যুদ্ধাপরাধী’র বিচার

১৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৪:২০ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আমি ৭১’র বিজয় দেখিনি, দেখেছি যুদ্ধাপরাধী’র বিচার

রাজিব শর্মা: বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে যে রাজনৈতিক দলটির অবদান সবচেয়ে বেশি, সেটি আওয়ামী লীগ৷ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় সবক্ষেত্রে বিভক্ত একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন, যার ফলে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ স্থান করে নেয় ন’মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর৷

সুমনের একটা গানের লাইন আছে – ‘কয়েকটা দিন ভীষণ রঙিন’।  খুব প্রিয় একটি গানের লাইন।  আজ বিজয় দিবসের দিনে এই লাইনটি বারে বারেই মনের আঙিনায় উঠে আসছে।

আমি যুদ্ধ দেখিনি, দেখেনি সবুজশ্যামল ঘাষের উপর রক্তাক্ত বাংলাদেশ। আমি দেখেছি যেন এক অন্যরকম বিজয়। ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার’ – যে আপাত অসম্ভব ঘটনাকে চিরসত্য  ভেবে নিয়ে দেশে বড় হয়েছি। বাংলার ইতিহাস মতে আশি এবং নব্বইয়ের দশকেও, যে সময়গুলোতে ‘জয় বাংলা’কে দেখা হত অস্পৃশ্য অচ্ছুৎ এক শব্দাবলী হিসেবে, ইতিহাসগুলো পড়লে খুব কষ্ট হত।

আজ একুশ শতাব্দীর এক স্বাধীন অতিক্রান্ত তরুণ আমি। ছোটবেলার সে অলুক্ষণে সময় – যে সময়টাতে আমার চারপাশের বন্ধুবান্ধবেরা জোর গলায় বিএনপি করার কথা বলত, ইসলামী ছাত্র শিবির আর জামায়েতে ইসলামীর ‘হে তরুণ এস সত্যের পথে’ টাইপের চিকা মারা থাকতো বাড়ির আশে পাশের দেয়ালগুলোতে, আর আওয়ামিলীগকে দেখা হত ‘রুশ ভারতের দালাল হিসেবে’,   কিংবা ‘হিন্দুদের পার্টি’ হিসেবে। বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ ছিল রেডিও টেলিভিশন থেকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ ছিল ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ এর মত অসংখ্য গানও। টিভির নাটকে আর চলচ্চিত্রে রাজাকার শব্দটি পারতপক্ষে মুখে তোলা হত না। পাকিস্তানের নাম না নিয়ে বলা হত ‘শত্রুরা’।সেই সময় এক অখ্যাত তরুণ বুকের মধ্যে লালন করছিল  যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের স্বপ্ন। মনের গহীন কোনে আশা করে যাচ্ছিল  ঘুরে দাঁড়াবার। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কি ভাবতে পেরেছিল সেই স্বপ্নগুলো সত্যি হয় উঠবে দুই দশকের মধ্যেই? যা আমরা ইতিহাস পড়লে জানতে পারি।

আমি গর্ববোধ করি আমি বাঙ্গালি, আমার জন্ম বাংলাদেশে। আমার বাবা একজন চিকিৎসক সেইসব গুটিকয় অন্যতম যিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক। মার্চের কাল রাত্রি, যুদ্ধ, রক্তাক্ত বাংলাদেশ সম্পর্কে যখন আমাদের বলা হতো আমরা ভয়ে কেঁপে উঠতাম। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের বর্ননা বলতেন, বলতেন বঙ্গবন্ধুর কথা, দেশের কথা। দেশ, মাতৃভূমির কথা কিন্তু সেই যুদ্ধের সুফল কি তিনি তার ছেলের প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে যেতে পেরেছিলেন?  তার ছেলেরা বড় হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে এক ঘৃণ্য পতিত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেখে, আর জেনেছে বঙ্গবন্ধুদের হত্যাকারীরা সবাই ‘সূর্যসন্তান’। বড় বড় রাজাকারেরা কেউ মন্ত্রীসভায়, কেউবা লাখ লাখ মুরীদ জুটিয়ে ওয়াজ মাহফিলের দোকান খুলে বসেছে, কেউ বা দাঁড়িতে মেহেদী লাগিয়ে দাপিয়ে কুপিয়ে ইসলামী অনুষ্ঠান করে যাচ্ছে বিটিভিতে।  মুখচেনা রাজাকারদের মধ্যে কেউ কেউ এমনকি চোখের সামনে পেয়ে যাচ্ছে স্বাধীনতা পদকও।  দেশের মিডিয়াগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের কথা যত না শোনা যাচ্ছিল, তার চেয়ে বেশি প্রচারিত হত এক রাষ্ট্রপতির চোখে রেবন সানগ্লাস পরে খাল খনন বিপ্লবের কথা, কিংবা এক প্লেবয় রাষ্ট্রপতির প্রেমের কবিতা আর আবেগাপ্লুত দেশাত্মবোধক গানের কথা। মুক্তিযুদ্ধ যেটা কিনা বাঙালি জাতির জন্য হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম অর্জন বললেও অত্যুক্তি হয়না, তার চেতনা এবং ইতিহাস যেন ক্রমশঃ বিলীন হয়ে যাচ্ছিল মহাশূন্যে।

সেখান থেকেই, সেই ধ্বংসস্তূপ আর ছাইভস্ম থেকে যেন ফিনিক্স পাখির মতোই উত্থান আমাদের। শুরুটা করেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম; নব্বইয়ের দশকে গোলাম আজমের জন্য গণআদালত গঠন করে। শেষটা করলেন শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরের অসম সাহসী উদ্দীপ্ত তরুণ তরুণীরা। কাদের মোল্লাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে।  হাতের ফাঁক গলে বেরিয়েই যাচ্ছিলেন কাদের মোল্লা। অজস্র গুমখুন, হত্যা ধর্ষণের নায়ক, কসাই কাদেরের সেই বিখ্যাত দাম্ভিকতাপূর্ণ  ‘ভি’ সাইনের ব্যাপারটা কেউ সহজভাবে নিতে পারেননি। মোল্লাজি ভেবেছিলেন একাত্তরের পর যেভাবে মানুষকে ঘোল খাইয়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, এবারেও তাই হবে। কিন্তু বিধিবাম। ফুসে উঠা তারুণ্য তৈরি করল শাহবাগে এক অমর ইতিহাস।

আরো আনন্দের ব্যাপার, কোন রাজনৈতিক দল এর নেতৃত্ব দেয়নি, দিয়েছে -আমরা যারা লেখালিখি করি তাদের মধ্যে থেকে উঠে আসা এবং সামাজিক মাধ্যম এক্টিভিস্টরা। যারা এতদিন ভার্চুয়াল লেখালিখি আর ইন্টারনেটে চেঁচিয়ে কিছু হবে না বলে কথার তুবড়ি ফোটাতেন, তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে আজ দেখিয়ে দেয়া হয়েছে – ‘আমরাও পারি’। আমরাই পারি!

হ্যাঁ যে কাজটি আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন, আবদ্ধ হয়েছিলেন, বিক্ষত হয়েছিলেন রুদ্ধ হতাশ্বাসে, সেই কাজটি আমাদের প্রজন্ম সমাধান করেছে, খুব সুচারু ভাবেই।  আমরা পুরো জাতিকে উপহার দিতে পেরেছি এক ভিন্ন স্বাদের বিজয়।    আজ গাইতে ইচ্ছে করছে সুমনের মতোই –

ইচ্ছে করে অন্য একটা আকাশ দেখি
একই মাটির উপর অন্য দিক দিগন্ত
অন্য শস্য অন্যরকম ফুল ফুটন্ত
অন্য সময় আসুক এবার ইচ্ছে করে
আমার দেশে সবার দেশে সবার ঘরে…

ফুল গুলোকে তাই বলে কি বাদ দিতে চাই?
শস্য এবং ফুলের জন্য গান গেয়ে যাই
ইচ্ছে করে স্বপ্ন ধরুক অন্য মানে
বেচে থাকার অন্য কথায় অন্য গানে।।
সবাইকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা। সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামাত-শিবিরের রাজনীতি চিরতরে নিষিদ্ধ করার দাবী হয়ে উঠুক এবারকার বিজয় দিবসের অঙ্গীকার।

লেখকঃ রাজিব শর্মা, সাংবাদিক (দি ক্রাইম), নারীবাদী ও সমাজসেবক। রকভ্যালী মিনিষ্ট্রির একজন ছাত্র।