banner

শেষ আপডেট ১০ জানুয়ারী ২০২১,  ২১:০৯  ||   বুধবার, ২০ই জানুয়ারী ২০২১ ইং, ৭ মাঘ ১৪২৭

ইয়া নবী (দ) সালাম আলাইকা

ইয়া নবী (দ) সালাম আলাইকা

২৮ অক্টোবর ২০২০ | ২২:৩৩ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ইয়া নবী (দ) সালাম আলাইকা

আলহাজ্ব আ ব ম খোরশিদ আলম খান: বছর ঘুরে এলো বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী রাহমাতুল্লিল আলামিন হুজুর পুরনুর হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বসুন্ধরায় শুভাগমনের দিন ঐতিহাসিক ১২ রবিউল আউয়াল। দিনটি ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) হিসেবে সারা বিশ্বে সমধিক পরিচিত। তপ্ত রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজপথে কিংবা মফস্বলের অলি গলি মুখরিত করে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) উপলক্ষে জশনে জুলুসে শামিল হবেন অজস্র নবীপ্রেমি জনতা। নবীপ্রেমী লাখো লাখো মানুষের মুখে মুখে ধ্বনিত হবে ইয়া নবী (দ) সালাম আলাইকা, ইয়া রাসূল (দ) সালাম আলাইকা কিংবা নবীপ্রেমী জনতা সমস্বরে রাজপথে হেঁটে হেঁটে গাইবেন ‘সবছে আলা ওয়ালা হামারা নবী (দ), সবছে বালা ওয়ালা হামারা নবী (দ)। প্রতি বছর ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) উপলক্ষে বিভিন্ন দরবারের সাজ্জাদানশিনদের নেতৃত্বে বের হয় জশনে জুলুস। বিশেষ করে ৯ রবিউল আউয়াল ঢাকায় আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের উদ্যোগে মোহাম্মদপুর কাদেরিয়া তৈয়বিয়া আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ থেকে এবং চট্টগ্রামে ১২ রবিউল আউয়াল এশিয়াখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ থেকে আওলাদে রাসূল (দ) মুরশেদে বরহক গাউসে জমান রাহনুমায়ে শরিয়ত ও তরিকত শাহসূফি আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মজিআ) এর নেতৃত্বে যে আজিমুশ্বান জশনে জুলুস বের করা হয় তাতে লাখো লাখো নবীপ্রেমী জনতা অংশগ্রহণ করে থাকেন। আওলাদে রাসূল (দ) গাউসে জমান শাহসূফি আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ) এর নির্দেশে ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম শহরের বলুয়ার দীঘি খানকা থেকে শাহসূফি নূর মোহাম্মদ আলকাদেরীর (রহ) নেতৃত্বে দেশে বৃহৎ আয়োজনে সর্বপ্রথম জশনে জুলুস বের করা হয়। এর আগেও দেশে বিভিন্ন দরবার, খানকাহ ও সংস্থা-সংগঠন থেকে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) পালিত হয়ে এলেও আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট কর্তৃক মুরশেদে বরহক আওলাদে রাসূল (দ) আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ) এর নির্দেশে এবং পরবর্তীতে তাঁরই নেতৃত্বে জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) আয়োজন নতুন ধারার ইসলামী সংস্কৃতি হিসেবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
মহানবীর (দ) দুনিয়ায় শুভাগমন মানবজাতিসহ সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও নেয়ামত স্বরুপ। আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ প্রাপ্তিতে আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করা কুরআন মজিদেরই শাশ্বত নির্দেশনা। কুরআন মজিদে এরশাদ হচ্ছে ‘হে রাসূল(দ.) আপনি বলে দিন, আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ প্রাপ্তিতে তারা যেন খুশি উদযাপন করে। এটাই তাদের জন্য সঞ্চিত সমুদয় সম্পদ থেকে সর্বোত্তম।’ তাই, ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) তথা মহানবীর (দ) জন্মদিনে আনন্দ-খুশির বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে জশনে জুলুস। এতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। বরং ঈমানদার মাত্রই তা নির্দ্বিধায় মেনে নিতে বাধ্য।
এ বছর করোনার বৈরী পরিস্থিতির কারণে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসছেন না আওলাদে রাসূল (দ) আল্লামা শাহসূফি সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মজিআ)। তবুও এবার সীমিত পরিসরে ঢাকা-চট্টগ্রামে জশনে জুলুস আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানালেন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান আলহাজ্ব পেয়ার মোহাম্মদ এবং যুগ্ম মহাসচিব লেখক-গবেষক অ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার। তাঁরা জানান, এবার ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) উপলক্ষে গাউসিয়া কমিটি ও মহিলা গাউসিয়া কমিটির দেশব্যাপী বিভিন্ন শাখাকে ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা তথা হামদ, না’ত, কবিতা আবৃত্তি, রচনা প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতাসহ নানা উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমাদের নির্দেশনা মেনে গাউসিয়া কমিটি বিভিন্ন ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা আয়োজন করে যাচ্ছে। এবার এই আয়োজন ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) পালনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
তবে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও রাজধানী ঢাকায় আনজুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার উদ্যোগে ১২ রবিউল আউয়াল দিবসে আজিমুশ্বান জশনে জুলুসে নেতৃত্ব দেবেন মাইজভান্ডার দরবার শরিফের সাজ্জাদানশিন পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ড সূফিজের প্রেসিডেন্ট আওলাদে রাসূল (দ) শাহসূফি মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আলহাসানী (মজিআ)। রাজধানীর বৃহত্তম এই জুলুসে লক্ষাধিক নবীপ্রেমী জনতার অংশগ্রহণ ঘটে। ঢাকায় অন্যদের মধ্যে ১২ রবিউল আউয়াল মাইজভান্ডার দরবারের পীরে তরিকত শাহসূফি মাওলানা সৈয়দ মুজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর নেতৃত্বে এবং ইমাম রব্বানি দরবার শরিফের সাজ্জাদানশিন পীরে তরিকত মাওলানা সৈয়দ বাহাদুর শাহ মুজাদ্দেদির নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জে জশনে জুলুস আয়োজিত হয়। প্রতি বছর ১ রবিউল আউয়াল থেকে ১২ রবিউল আউয়াল পর্যন্ত ১২ দিনব্যাপী ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) শীর্ষক সেমিনারের সূচনাকারী হলেন ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা কাযী নুরুল হাশেমী (র)। এ বছর এই সেমিনারের দায়িত্বে আছেন পীরজাদা অধ্যক্ষ আল্লামা মুহাম্মদ আবুল বয়ান হাশেমী। এছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে চরণদ্বীপ রজভিয়া ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পীরে তরিকত আল্লামা শাহসূফি মুহাম্মদ ইদ্রিস রজভির (মজিআ) নেতৃত্বে বৃহত্তর পরিসরে জশনে জুলুস বের করা হয়। হুজুর কেবলা বয়সের কারণে উপস্থিত থাকতে না পারায় কয়েক বছর ধরে জুলুসের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরই ছাহেবজাদা অধ্যক্ষ আল্লামা মুহাম্মদ শোয়ায়েব রেজা। দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া আমির ভান্ডার দরবার শরিফ থেকেও বিভিন্ন মনজিলের সাজ্জাদানশিনদের নেতৃত্বে প্রতি বছর শানদার জশনে জুলুস বের করা হয়। চন্দনাইশে জামিরজুরি রজভিয়া রহমানিয়া আজিজিয়া সুন্নিয়া ফাজিল মাদ্রাসার উদ্যোগে অধ্যক্ষ আল্লামা মুফতি আহমদ হোসাইন আলকাদেরীর নেতৃত্বে এবং চন্দনাইশ রওশনহাট জাঁহাগিরিয়া দরবার শরিফের উদ্যোগেও বড় পরিসরে জশনে জুলুস আয়োজিত হয় প্রতি বছর। এছাড়া সাতকানিয়া ধর্মপুর দরবার শরিফের উদ্যোগে পীরে তরিকত আল্লামা আবদুশ শাকুর নকশবন্দির নেতৃত্বেও প্রতি বছর বিশাল জশনে জুলুস বের করা হয়। উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি সৈয়দ বাড়ি দরবার শরিফের উদ্যোগে এর সাজ্জাদানশিন পীরে তরিকত আল্লামা সৈয়দ মছিহুদ্দৌলার নেতৃত্বে প্রতি বছরের মতো এবারও ১১ রবিউল আউয়াল বৃহস্পতিবার জশনে জুলুস বের করা হবে। এতে দরবারের হাজার হাজার ভক্ত জনতা অংশগ্রহণ করেন। রাঙ্গুনিয়া দরবারে বেতাগী আস্তানা শরীফের উদ্যোগে সাজ্জাদানশীন পীরে তরিকত আল্লামা মুহাম্মদ গোলামুর রহমান আশরফ শাহ-এর নেতৃত্বে ১৩ রবিউল আউয়াল এবং ৭ রবিউল আউয়াল বায়েজিদ আল আমিন হাশেমী দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন পীরে তরিকত আল্লামা শাহ সূফি ছাদেকুর রহমান হাশেমীর নেতৃত্বে প্রতি বছর জশনে জুলুস বের করা হয়। পীরে তরিকত পেশোয়ায়ে আহলে সুন্নাত আল্লামা আজিজুল হক আলকাদেরী (রহ) প্রতিষ্ঠিত হাটহাজারী ছিপাতলি জামেয়া গাউছিয়া মুঈনিয়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে তাঁরই ছাহেবজাদা পীরে তরিকত অধ্যক্ষ আল্লামা আবুল ফরাহ মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিনের নেতৃত্বে প্রতি বছর শানদারভাবে বৃহৎ আয়োজনে জশনে জুলুসে শামিল হন হাজার হাজর নবীপ্রেমী জনতা। শুধু ঢাকা-চট্টগ্রামে নয়, দেশের সবখানে নানা সংস্থা সংগঠন ও মাদ্রাসা-খানকাহ ও দরবারের ব্যবস্থাপনায় এখন রবিউল আউয়াল মাসে আজিমুশ্বান জশনে জুলুস বের করা হয়। বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ইসলামী যুবসেনা, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা এবং গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংস্থা সংগঠনের উদ্যোগে দেশব্যাপী জশনে জুলুস বের করা হচ্ছে শানদারভাবে। এমনকি বহির্বিশ্বে অনেক মুসলিম দেশেও নানা নামে র‌্যালি, জুলুস, মিছিল, সম্মেলন ও জমায়েতের মাধ্যমে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) পালন করা হয়। ব্রুনাইয়ে প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় র‌্যালি বের করা হয়। যা বিশ্ব মিডিয়ার কল্যাণে আমরা জানতে পারি।
মহানবীর (দ) দুনিয়ায় শুভাগমনের দিন উপলক্ষে খুশি প্রকাশই হলো জশনে জুলুস। এটি ইসলামের ইতিহাসে নবতর সংযোজন ও নতুন প্রবর্তিত ইসলামী সংস্কৃতি হলেও তা ইসলামের বিধি বিধানের সঙ্গে মোটেই সাংঘর্ষিক নয়। বরং ইসলামী রীতি-পদ্ধতি মেনেই জশনে জুলুসে শামিল হন ঈমানদার জনতা। মহানবী (দ) যখন মক্কার জন্মভূমি ছেড়ে মদিনা শরিফে হিজরত করলেন, তখন মদিনার আবালবৃদ্ধবনিতা লোকালয়ের অলিতে গলিতে নেমে এসে বিভিন্ন কবিতা পঙ্ক্তি গেয়ে গেয়ে মহানবীকে বিপুলভাবে স্বাগত জানায়। মদিনাবাসীর অনুসৃত এই অভিবাদন পদ্ধতি ‘জশনে জুলুসের’ মাধ্যমে নতুনভাবে জেগে উঠেছে বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে। অপসংস্কৃতির দৌরাত্ম্যের এই দুঃসময়ে সুস্থধারার মননশীল উজ্জীবনধর্মী জশনে জুলুসের ইসলামী সংস্কৃতি সর্বত্র প্রসারিত হোক এই প্রত্যাশা।
এই ধরিত্রীকে আলোকিত করতেই আল্লাহ পাক তাঁর মকবুল খাছ বান্দাহ্ প্রিয় নবী (দ) কে আমাদের মাঝে পাঠিয়েছেন। আইয়ামে জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে আরববাসী নিমজ্জিত ছিল। পাপাচার, অনাচার, ব্যভিচার ও সামাজিক নানা কদর্যতায় আরববাসী আকণ্ঠ ডুবে ছিল। কন্যা সন্তানকে তারা জীবন্ত মাটির নিচে পুঁতে ফেলতো। কন্যা সন্তান জন্ম নেয়া অভিশাপ মনে করা হতো। এমন একটি বিভীষিকাময় সময়ে মহানবীর (দ) শুভাগমনের মধ্য দিয়ে আরবের ঘোর অন্ধকার দূরীভূত হয়। আরববাসী মুক্তির স্বাদ পায় মহানবীর (দ) শুভাগমন ঘটেছে বলেই। পৃথিবীতে মানুষে মানুষে শান্তি, সম্প্রীতি, ঐক্য ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠিত হয় মহানবীর (দ) শুভাগমনের উসিলায় এবং তাঁরই প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায়। এজন্যই মহানবীর (দ) স্মরণ এবং তাঁর অনুসরণ বিশ্ব মানবজাতির ওপর অনিবার্য কর্তব্য হয়ে পড়ে। মহানবীর (দ) প্রতিষ্ঠিত শাশ্বত জীবন বিধান ইসলাম। ইসলামী নির্দেশনা মেনে চলে আমরা এই অশান্ত দ্বন্দ্বমুখর পৃথিবীতে মানবিক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও বিশ্বমৈত্রী গড়ে তুলতে পারি। এবার ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) উদযাপনে আসুন আমরা এই শপথ গ্রহণ করি। দেশে দেশে ঐক্য এবং মানবিক সম্প্রীতি গড়ায় আমরা দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করি এই ঈদে মিলাদুন্নবীর (দ) দিনে।লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট।