banner

শেষ আপডেট ২৩ নভেম্বর ২০২০,  ২২:১২  ||   বৃহষ্পতিবার, ২৬ই নভেম্বর ২০২০ ইং, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

জিপিও সঞ্চয় শাখায় নৈরাজ্যঃ আমানতকারীরা হয়রানির শিকার !

জিপিও সঞ্চয় শাখায় নৈরাজ্যঃ আমানতকারীরা হয়রানির শিকার !

৩১ অগাস্ট ২০২০ | ০৮:০২ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • জিপিও সঞ্চয় শাখায় নৈরাজ্যঃ আমানতকারীরা হয়রানির শিকার !
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম জিপিও’র ডাকঘর সঞ্চয় শাখায় মানুষ পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা নিতে আসা কিংবা আমানত তুলে নিতে আসা গ্রাহকদের সাথে তারা নানান অজুহাত দেখিয়ে হয়রানি করে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্যে লিপ্ত রয়েছে।
দেশে সাধারণত স্বল্প আয়ের মানুষ, অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী এবং শহরের বাইরে গ্রামে যারা থাকেন, অর্থ সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে তাদের কাছে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক বেশ জনপ্রিয়। এছাড়াও শেয়ার বাজার বা বন্ড মার্কেটে সাধারণ মানুষের অতীত নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কারণে মানুষ ব্যাংকের উপর আস্থা হারিয়েছেন। এসব অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগের নিরাপত্তায় বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ ডাকঘর সঞ্চয় শাখায় সঞ্চয়পত্র সহ নানা সঞ্চয় প্রকল্পে বিনিয়োগ করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে পারিবারিক সঞ্চয়পত্রে সাধারণ মানুষ বেশী বিনিয়োগ করে থাকেন মাস শেষে নির্দিষ্ট অংকের মুনাফা লাভের আশায় । অনেক মহিলা তাদের ক্ষুদ্র সঞ্চয় জমা করে সঞ্চয়পত্র কিনে প্রতি মাসে প্রাপ্ত মুনাফার টাকা হতে তাদের পরিবারের প্রয়োজনে মেটায়। আবার কেউ কেউ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকায় ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া,কেউবা মাসিক ঘর ভাড়া মিটিয়ে থাকেন।  করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে  সাধারণ মানুষের আয়-রোজগার তথা পুরো দেশের অর্থনীতির উপর বিরুপ প্রভাব পড়েছে। যার কারণে অনেকের চাকুরি গেছে,আবার কারো চাকরি আছে কিন্তু বেতন পাচ্ছেন না। এ পরিস্থিতে অনেকে শহরের বাসা ছেড়ে গ্রামের বাড়ী চলে যেতেও বাধ্য হচ্ছেন। আর যাদের সঞ্চয়পত্রে কিছু বিনিয়োগ আছে,এ অবস্থায় তাদের বিনিয়োগকৃত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার উপর অনেকটাই নির্ভশীল হয়ে পড়েছেন। আবার বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ কেউ নিতান্তই অভাবের কারণে তাদের বিনিয়োগকৃত সঞ্চয়পত্র ভেঙ্গেও ফেলছেন। আর মানুষের এ দূরাবস্তায় আর্থিক দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে চট্টগ্রাম জিপিও’র সঞ্চয় শাখায় কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গ্রাহকদের নানাভাবে হয়রানী করে ও প্রায় অনেকটাই জিম্মি করে ঘুষ গ্রহনে লিপ্ত রয়েছে।
চট্টগ্রাম জিপিও’তে পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের শুধুমাত্র নগদ মুনাফা উত্তোলন সহ লেনদেনের জন্যে যথারীতি চারটি কাউন্টার র‍য়েছে।কিন্তু এইসব কাউন্টারে গ্রাহকরা প্রতি মাসে তাদের সঞ্চয়পত্রের মুনাফা উত্তোলন করতে গেলে বা তাদের সঞ্চয়পত্র ভেঙ্গে ফেলতে গেলে নানা অজুহাতে হয়রানী ও বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সঞ্চয়পত্র/মুনাফা উত্তোলনে পুরুষদের জন্যে ৯নং ও ১০ নং কাউন্টার এবং মহিলাদের জন্যে ৮নং ও ৬ নং কাউন্টার ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এসব কাউন্টার হতে মুনাফা/লেনদেনের দায়িত্বে থাকা পিও অপারেটর শুভাশীষ বড়ুয়া,পিও অপারেটর আব্দুল করিম,পিও অপারেটর মোঃ জামাল ও পিও অপারেটর মোঃ হামীদি প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের নানাভাবে হয়রাণী করে ঘুষ আদায় করছেন। বিশেষ করে পুরুষ কাউন্টারে লাইনে দাঁড়ানো পরিবার সঞ্চয়পত্রের গ্রাহক প্রতিনিধিরা অপারেটর শুভাশীষ বড়ুয়ার কাছে বেশী হয়রানীর শিকার হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আমানতকারীর প্রতিনিধি হিসেবে মুনাফা উত্তোলনের জন্যে তাদের নমিনী গেলেও কাউন্টার অপারেটরদের উৎকোচ না দিলে নানান অজুহাতে উৎকোচ দিতে বাধ্য করায়। কিন্তু কি কি শর্ত সাপেক্ষে একজন আমানতকারীর মুনাফা তার প্রতিনিধি তুলতে পারবে সে ব্যাপারেও কাউন্টারে কোন নোটিশ টাঙ্গানো নাই। যারা নিয়মিত তাদের উৎকোচ দেয় কিংবা প্রদেয় মুনাফার অর্থ হতে উৎকোচ কেটে রাখা যায় কেবল তাদেরই ঝামেলা ছাড়া  মুনাফার অর্থ প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে আবার কারা নিয়মিত উৎকোচ দেয়,আর কারা দেয় না তাদেরও চিহ্নিত করে রেখেছে এসব অসাধু অপারেটররা। যারা উৎকোচ দিতে চায় না তাদের সাথে নানান তালবাহানার পাশাপাশি আমানতকারী হতে ক্ষমতাপত্র নিয়ে যেতে বলা হয়।  কিন্তু যখন মুনাফা উত্তোলনের ক্ষমতাপত্র নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আর কোন অজুহাত না পেয়ে বলা হয় একত্রে ৩টি বইয়ের অধিক মুনাফা দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে আবার যারা উৎকোচ দেয় তাদের ক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্রের ভিন্ন ভিন্ন রেজিষ্ট্রেশনের ৭/৮/১০ টি বইয়ের মুনাফাও একই সময়ে একত্রে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, যদি একজন গ্রাহকের ১০টি বই থেকে থাকে,সে মুনাফা উত্তোলনের জন্যে মাসে বড় জোড় দুইবার যেতে পারে। কিন্তু মুনাফা উত্তোলনের জন্যে মাসে তিনবার যাওয়াটা কতটা যৌক্তিক সেটা প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ প্রতিবার মুনাফা উত্তোলনের জন্যে গ্রাহকরা কত কষ্ট করে অনেকটা কাকডাকা ভোরে এসে লাইনে দাঁড়ান। আর বিশেষ করে এই মুনাফা দিয়ে গ্রাহকরা তাদের সংসারের প্রয়োজন মেটায়।তাই যাদের ৩টির অধিক বা ১০টা পর্যন্ত বই আছে তারা মুনাফার টাকাটা মাসে তিনবারে না নিয়ে অন্ততঃ দুইবারে নিতে পারলেও হয়তো একদিকে তাদের লাইনে দাঁড়ানোর কষ্টটা যেমন কম হয়,অন্যদিকে মুনাফার টাকাটা মাসে দুইবারে বা দুই কিস্তিতে পেলেও কোন রকমে চলে।
উৎকোচকে কেন্দ্র করে উল্লেখিত এসব অসাধু কাউন্টার অপারেটররা মুনাফা তুলতে আসা প্রতিনিধিদের সাথে মারমুখো হয়ে বাড়াবাড়ি করতেও দ্বিধাবোধ করে না। অথচ,প্রতিটি সঞ্চয়পত্রের সুদ উত্তোলনের জন্য সঞ্চয়পত্রের সাথে সংযুক্ত টোকেন ব্যবস্থা চালু আছে। গ্রাহক প্রতিনিধিরা সঞ্চয়পত্র বইয়ের সাথে সংযুক্ত টোকেনে মূল গ্রাহকের দস্তখত নিয়ে পুরুষ কাউন্টার হতে প্রাপ্য মুনাফা সহজে উত্তোলন করার কথা এবং এ উদ্দেশ্যেই ২টি মহিলা কাউন্টারের পাশাপাশি ২টি পুরুষ কাউন্টারও রাখা হয়েছে।অথচ সঞ্চয়পত্র গ্রাহকদের প্রতিনিধিরা সঞ্চয়পত্র বইসহ সাথে সংযুক্ত দস্তখত করা টোকেন নিয়ে গেলে উৎকোচ ছাড়া মিলে না গ্রাহকদের প্রাপ্য মুনাফা। তারা প্রায় গ্রাহকের মুনাফা হতে গ্রাহক বুঝে নিজেদের ইচ্ছেমতো ৭০/৮০/ ১০০/২০০/৩০০ বা তারও উর্ধ্বে টাকা কেটে রেখে দেয় বা তাদের দিতে হয়।
আর আগে গ্রাহকদের মুনাফা উত্তোলনের সুবিধার্থে ভাংতি টাকা নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কাউন্টারের উপরে নোটিশ টাঙ্গানো থাকতো। এখন সেই নোটিশও নাই এবং ভাংতি যত টাকাই হউক,কোন ভাংতি টাকা গ্রাহকদের দেওয়া হয়না,তা অপারেটেররা রেখে দেন। বরং কেউ ভাংতি টাকা নিয়ে গেলে তাদের উপর অসন্তুষ্ট হন এসব অপারেটররা।প্রাপ্য মুনাফা নিতে মহিলা কাউন্টারে আমানতকারী মহিলারা নিজেরা উপস্থিত থাকা সত্বেও সেখানেও নিরীহ কিছু মহিলাদের মুনাফা থেকে একই কায়দায় তারা উৎকোচ কেটে রেখে দেয়। আবার যাওয়া মাত্র কোন প্রকার লাইনে দাঁড়ানো ছাড়াও এখানে মুনাফা উত্তোলন করা যায়।সে ক্ষেত্রে উৎকোচের বিনিময়ে কাউন্টারের ভিতর থেকে মুনাফা উঠিয়ে দিতে অপারেটর মো; আজাদুল ইসলাম,অপারেটর মোঃ আব্দুল কাদের,অপারেটর মোঃ বেলাল ও প্যাকার মোঃ ইউনুচ সারাদিন তৎপর রয়েছে। ৭নং কাউন্টারে নতুন সঞ্চয়পত্র করতে আসা গ্রাহকদেরও মানুষ বুঝে অপারেটর মোঃ শাহ জালাল ৫’শ/১হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। মেয়াদ পূর্তিতে বা মেয়াদ পূর্তির পূর্বে সঞ্চয়পত্র নগদায়নের ক্ষেত্রে নগদ টাকা বা চেক প্রদানে নেওয়া হয় প্রচুর ঘুষ। আর এ ঘুষের পরিমান ৫’শ টাকা হতে ২/৪/৫ হাজার বা তারো উর্ধ্বে। ঘুষ না দিলে ক্যাশ টাকা দেওয়া হয়না এবং চেক প্রদানেও বিলম্ব হবে বলে গ্রাহকদের সরাসরি জানিয়ে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া জিপিও নৈশ ডাকঘর দুপুর ২’৩০ ঘটিকা থেকে রাত ৮’ঘটিকা পর্যন্ত খোলা থাকে। এ নৈশ ডাকঘর সঞ্চয় শাখার সহকারী পোষ্টমাষ্টার নজরুল ইসলাম, কাউন্টার অপারেটর মোঃ মহসীন খান সন্ধ্যায় আসা গ্রাহদেরও একই কায়দায় হয়রানী করে প্রতিদিন উৎকোচ আদায় করে থাকে বলে জানা গেছে। এভাবে সঞ্চয় শাখার পোষ্টাল অপারেটর আনোয়ারুল ইসলাম(এফডি কাউন্টার-৫),মোঃ হাসান(এফডি কাউন্টার-৩),কবির আহাম্মদ(এফডি কাউন্টার-২),সরওয়ার আলম খান(সঞ্চয়ী কাউন্টার নং-১),মোঃ নুরুল হক(অভ্যর্থনা),তারাও এসব অপতৎপরতায় জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে অপারেটর আনোয়ারুল ইসলাম ও কবির আহাম্মদ উৎকোচ আদায়ে বেপরোয়া। এভাবে পোষ্ট মাষ্টার সঞ্চয় নিপুল তাপস বড়ুয়া,সহকারী মাষ্টার সঞ্চয় মোঃ মাঈনুদ্দিন ও পোষ্ট মাষ্টার ট্রেজারি মোঃ আব্দুল মালেকের নেতৃত্বে ও যোগসাজসে পুরো সঞ্চয় শাখা জুড়ে চলছে নৈরাজ্য।
সঞ্চয় শাখার কাউন্টারে ছয় মাস এবং একই শাখায় এক বছরের অধিক সময় চাকুরি করার বিধি না থাকলেও, এদের মধ্যে অনেকে রহস্যজনক কারণে  পোষ্টিং বিহীন নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে একই শাখায় বা কাউন্টারে বছরের পর বছর ধরে চাকুরি করে যাচ্ছেন বলে সূত্রে জানা গেছে।
অসমর্থিত একটি সূত্র জানায়, অসাধু উপায়ে এভাবে তারা প্রতিদিন ৫০/৫৫ /৬০ হাজার টাকা আয় করে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়।
সঞ্চয় শাখায় এসব অনিয়মের ব্যাপারে ইতিপূর্বেও বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশের পরও তাদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষীয় যথাযথ কোন ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে তারা যেন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে। এর ফলশ্রুতিতে গত ২৬ আগষ্ট এই সঞ্চয় শাখার সারওয়ার আলম ও নুর মোহাম্মদ নামের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সঞ্চয়পত্রের ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় এবং পরবর্তীতে থানায় ডাক বিভাগের করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এজাহার হিসেবে গণ্য হওয়ার পর ওই দুজনকে গ্রেফতার দেখিয়ে ২৭ আগস্ট সকালে কতোয়ালী থানায় সোপর্দ করা হয়৷
সচেতন মহলের মনে করেন,এইসব অনিয়ম ও দূর্ণীতিতে সারওয়ার আলম ও নুর মোহাম্মদের সাথে আরো অনেকে জড়িত থাকতে পারে, যা সঠিক তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তাই এখনই চিহ্নিত পূর্বক অসাধুদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এধরণের ঘটনা আরো ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। ডাক বিভাগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্টানকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে রক্ষার্থে কর্তৃপক্ষের উর্ধ্বন কর্মকর্তা ও দূর্ণীতি দমন কমিশনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।