banner

শেষ আপডেট ১২ অগাস্ট ২০২০,  ২৩:৪০  ||   বৃহষ্পতিবার, ১৩ই আগষ্ট ২০২০ ইং, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

করোনাকালের সংকট : বাড়িভাড়ার বোঝা এবং মানবজন্মের সার্থকতা

করোনাকালের সংকট : বাড়িভাড়ার বোঝা এবং মানবজন্মের সার্থকতা

৮ জুলাই ২০২০ | ১৩:০৯ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • করোনাকালের সংকট : বাড়িভাড়ার বোঝা এবং মানবজন্মের সার্থকতা
কামরুল হাসান বাদল : কয়েক দশক ধরে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় বাস করেন এমন এক সিনিয়র বন্ধু কয়েকদিন আগে ফোন দিয়ে বললেন, দেশের খবর কিছু রাখেন? বললাম, কোন বিষয়ে? তিনি বললেন, দলে দলে মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। আমাদের আবাসিক এলাকায় এখন বহু বাড়িতে ‘টু-লেট’ বা ‘ঘর ভাড়া দেয়া হবে’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। বললাম, বুঝবো না কেন? আমি নিজেও তো ভাড়া বাসাতেই থাকি। আমারও তো বাসাভাড়া বাকি। যদিও এখন পর্যন্ত বাড়িওয়ালার খারাপ ব্যবহার করেননি। তবে শুনেছি অনেকের সাথে বাড়িওয়ালারা অত্যন্ত বাজে ব্যবহার করছেন, এমনকি ঘরের আসবাবপত্র বাইরে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। বিষয়টি নিয়ে আমি নিজেও চিন্তিত।ন্ড
বন্ধুটি বললেন, এরই মধ্যে অনেক বাসা খালি হয়ে গেছে। মাসখানেক আগেও আশেপাশের বিল্ডিংয়ের অনেক ঘরে আলো জ্বলতে দেখা যেত, সেসব এখন অন্ধকার। অর্থাৎ বুঝতে পারছেন ভাড়াটিয়ারা চলে গেছে। এপ্রিল থেকে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ। করোনাভাইরাস বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ায় সরকার ২৫ মার্চের পর থেকে প্রথমে ১০ দিনের এবং তা বাড়াতে বাড়াতে মে মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত বর্ধিত করে। সরকারি ছুটির মধ্যেই চলতে থাকে লকডাউন। কল-কারখানা, মার্কেট-শপিংমল সবকিছু বন্ধ করে দেয়া হয়। সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ঘর থেকে বের না হতে নির্দেশ দেয়া হয়। অর্থাৎ অতি সংক্রামক করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সব ধরনের সামাজিক মেলামেশা ও অনুষ্ঠান এক প্রকার নিষিদ্ধ করা হয়।
এ অবস্থায় সমাজে যারা সামর্থ্যবান ও স্বচ্ছল তারা সাত-আট মাসের বাজার-সদাই করে ঘরে কোয়ারেন্টিনে থাকতে পারলেও যাদের সামর্থ্য নেই, যারা দিনে এনে দিনে খায় তারা পড়ে যায় মহাফাঁপরে। জীবন বাঁচাতে, জীবিকার সন্ধানে তাই অনেকে নেমে পড়ে রাস্তায়। ক্ষুধার জ্বালার কাছে করোনার ভয় তাদের কাছে তুচ্ছ যায়। ফলে হাজার অনুরোধ, নির্দেশ এমনকি পুলিশ-মিলিটারির ভয়ও তাদের ঘরে ফেরাতে পারেনি। তারা তাদের জীবন বাঁচাতে, স্ত্রী সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে কর্মের সন্ধানে দিকবিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে।
এই মহানগরের বস্তিগুলোয় অন্তত কয়েক লাখ মানুষ বাস করে। এরা প্রধানত শ্রমিকশ্রেণির। রিকশা, অটোরিকশা, ঠেলাগাড়ি চালক, হকার, চা, পান-সিগারেট, বাদাম, চানাচুর, সবজি, মাছবিক্রেতা, ছোট দোকানদার, নির্মাণশ্রমিক ইত্যাদি। বস্তিবাসীদের মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বিভিন্ন কাজ করে। তার মধ্যে তৈরিপোশাকশিল্প অন্যতম। এছাড়া বাসাবাড়িতে ঝি বা বুয়ার কাজসহ নানা কাজে জড়িত তারা। করোনাকালে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বেকার শুধু তৈরিপোশাকশিল্পের কিছু শ্রমিক ছাড়া।
এদের জীবন কাটছে সবচেয়ে করুণভাবে। ঘরভাড়া আদায় করা তো দূরের কথা দু বেলা ভাতের সংস্থান করাই এখন দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এদের অনেকে বাসা ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেলেও সেখানে তাদের কর্মসংস্থানের কোনো উপায় না থাকায় অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
অবশ্য এদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রকার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেসরকারি এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেকে এদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। যদিও প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। তবে করোনাকালের এই কঠিন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সঙ্কটজনক অবস্থায় পড়েছেন নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণি; যাদের সীমিত আয়। এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমল, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ এমন প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ কর্মচারী যারা ২৬ মার্চ থেকে কার্যত বেকার। কমিউনিটি সেন্টার, কনভেনশন সেন্টারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এমন কি মুরগি ও দুগ্ধ-দুগ্ধজাত খামার, পরিবহনশ্রমিক – কর্মচারী, এমন পেশার লোকদের আয়-রুজি বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে অনেকে চাকরি করে গেলেও বেতন পাননি, অনেকে দু-তিন মাস মিলে বেতন পেয়েছেন এক মাসের। অনেকের বেতন কর্তন করা হয়েছে। বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে ৫০ শতাংশ। মূলত নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষদের জীবন ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে এখন। যাদের একটি নিজস্ব বাড়ি আছে বা মাথা গুঁজবার মতো সামান্য উপায় আছে শহরে তারা কোনো প্রকারে চালিয়ে নিতে পারলেও কঠিন সমস্যায় পড়েছেন ভাড়াটিয়া বা যারা ভাড়া বাসায় থাকেন তাদের। অনেকের অবস্থা সত্যি মানবেতর পরিস্থিতিতে পড়েছে এখন। এ চিত্র শুধু চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার নয়, সমগ্র চট্টগ্রামের এমনকি রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর যেখানে লাখ লাখ মানুষ ভাড়া বাড়িতে অবস্থান করেন। বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন সপরিবারে। এমন এক অনুজপ্রতীম জানালেন, ঢাকায় যে বিল্ডিংয়ে তিনি থাকেন সেখান থেকেও অন্তত আটটি পরিবার বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন। অনেকে পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে শহরে মেসবাড়িতে বা কয়েকজন মিলে রুম ভাড়া নিয়ে শহরে চাকরি টিকিয়ে রেখেছেন।
চট্টগ্রামের প্রসঙ্গে বলি, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জরিপ মতে, নগরীতে বসবাসরতদের মধ্যে ৯০ শতাংশই ভাড়াটিয়া। করোনার কারণে কর্মক্ষেত্রে বেতনের টাকা নিয়ে চলছে টানাপোড়েন। যাদের কাছে জমা টাকা ছিল তা-ও শেষ হওয়ার উপক্রম। অনেকেরই সংসার চালানো দায় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এসব সমস্যার মধ্যে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বাড়ি ভাড়া। নগরীর বেশিরভাগ পাড়া-মহল্লার ভাড়াটিয়াদের ভাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন বাড়ির মালিকরা।
সংস্থাটি জানাচ্ছে, করোনাকালে অর্থনৈতিক সংকটে কেউ চলে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়ি। কেউ আবার বড় বাসা ছেড়ে উঠছেন ছোট ঘরে। ‘টু-লেট’ ঝুলছে এখানে-সেখানে। আর যারা জীবন ও জীবিকার সমন্বয় ঘটিয়ে টিকে থাকার চেষ্টায় নগরীতে রয়ে গেছেন, সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সেই ভাড়াটিয়ারা। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সকলেরই একই দশা। বাড়িওয়ালাদের চাপে তারা দিশেহারা। একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ছে প্রশাসনের কাছে। বিভিন্ন সংগঠন বাড়ি ভাড়া কমানোর দাবিতে সোচ্চার হতে দেখা যাচ্ছে।
এরমধ্যে ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে অনেক বাড়িওয়ালার অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার অনেকটা প্রকাশও পেয়েছে। তবে সব বাড়িওয়ালা একই ধরনের আচরণ করছেন তা নয়। অনেকে স্বেচ্ছায় বাড়িভাড়া কমিয়ে দিয়েছেন এমন তথ্যও আছে তবে তা সংখ্যায় একেবারেই নগণ্য। অবশ বাড়িওয়ালাদের কেউ কেউ বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, অনেকেরই জীবন-জীবিকা এই ভাড়া। ভাড়া না পেয়ে অনেকে কষ্টে দিন পার করছেন। অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি করেছেন। প্রতিমাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ তাদের ঋণ পরিশোধে চলে যায়।
করোনাভাইরাস সঙ্কটের এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে বাড়ির মালিকদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। অনেক বাড়িওয়ালা সঙ্কটে আয় কমে যাওয়া ভাড়াটিয়াদের বাসা ছাড়তে বাধ্য করছেন বলে খবর শুনে গত শনিবার নিজের বাসা থেকে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এই আহবান জানান তিনি।
বাড়িওয়ালাদের অনুরোধ জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, এ কথা সত্য যে, কোনো কোনো বাড়িওয়ালা আছেন ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয়ই তাদের একমাত্র উৎস। আবার তার ওপর ব্যাংক লোনও থাকতে পারে। তাই আমি পরিস্থিতি বিবেচনায় দু’পক্ষকে ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে মানবিক হওয়ার আহবান জানাচ্ছি। এই সঙ্কটকালে ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রাখারও আহবান জানান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক।
বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ নগরে বসবাসকারী ভাড়াটিয়ারা যেমন অসহায় অবস্থায় পড়েছে তেমনি কিছু কিছু বাড়িওয়ালা যাদের শুধু ভাড়ার টাকায় সংসার চালাতে হয় তারা পড়েছে বিপাকে। অভাবের কারণে অনেকে ভাড়া দিতে পারছেন না এটা যেমন সত্য তেমনি অনেকে ভাড়ার টাকায় সংসার চালান তাও সত্য। তবে সব বাড়িওয়ালা ঋণ নিয়ে বাড়ি করেছেন কিংবা ভাড়ার টাকায় শুধু সংসার চালান তাও পুরোপুরি সত্য নয়। নগরের অধিকাংশ বাড়ির মালিকই অবস্থাসম্পন্ন।
বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। সামর্থবান বাড়িওয়ালারা এ ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দিতে পারেন। এই সময়ে কিছু ভাড়া কমিয়ে ভাড়াটিয়াদের ওপর থেকে চাপ কমাতে পারেন। একটি সময় পর্যন্ত ভাড়ার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার একটি প্রস্তাব তোলা যেতে পারে। প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনা সাপেক্ষে প্রজ্ঞাপন জারি করা যেতে পারে। সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরামর্শ মতো কয়েক মাসের জন্য বাড়ি নির্মাণের ঋণ আদায় বন্ধ রাখা যেতে পারে।
পুরো বিষয়টি একটি সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে কোনো ধরনের সংঘাত তৈরির সম্ভাবনা থাকবে না। তবে তা দ্রুত হওয়া বাঞ্ছনীয়, কারণ প্রতিটি মাস ভাড়াটিয়াদের জন্য নতুন নতুন বোঝা সৃষ্টি করছে। সমস্যার সমাধান ত না হলে তা আরেকটি মানবিক বিপর্যয় তৈরি করবে।
এই দুঃসময়ে মানুষ যদি মানুষের পাশে না দাঁড়ায় তাহলে আর মানবজন্মের সার্থকতা কোথায়?
লেখক: কবি ও সাংবাদিক