banner

শেষ আপডেট ২১ জানুয়ারী ২০২০,  ২১:৪৫  ||   বুধবার, ২২ই জানুয়ারী ২০২০ ইং, ৯ মাঘ ১৪২৬

নৌকায় আস্থা ভোটারের : ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী মোছলেম এগিয়ে

নৌকায় আস্থা ভোটারের : ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী মোছলেম এগিয়ে

১৩ জানুয়ারী ২০২০ | ২১:১৭ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • নৌকায় আস্থা ভোটারের : ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী মোছলেম এগিয়ে

ক্রাইম প্রতিবেদকঃ  চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ) আসনের উপ-নির্বাচনে বিপুল ভোটে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমদ এগিয়ে রয়েছেন। ইভিএমের মাধ্যমে আজ সোমবার সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়া ভোট গ্রহণ চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। সকালে প্রচন্ড শীত ও কুয়াশার কারণে কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বৃদ্ধি পায়। ভোটগ্রহণ চলাকালে পুলিশ ও বিএনপির সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এই আসনের সবগুলো কেন্দ্রেই ইলেকট্রনিক্স ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৭০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৭৬টি কেন্দ্রের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। প্রাপ্ত ফলাফলে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমদ পেয়েছেন ২৬ হাজার ৬৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির প্রার্থী মো. আবু সুফিয়ান পেয়েছেন ৮ হাজার ১৫০ ভোট। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান নগরের জিমনেশিয়াম মাঠের অস্থায়ী কার্যালয়ে এ ফলাফল ঘোষণা করেন।
এদিকে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে পুননির্বাচনের দাবি জানান বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান। গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টায় চট্টগ্রামে বিএনপির দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান। তবে সকলের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণশেষ হয়েছে বলে দাবি করছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমদ। তাঁর অভিযোগ,  বিএনপির প্রস্তুতি নাই বলে একটি বাহানা খুঁজছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর চান্দগাঁও থানার হাসান প্রাইমারি বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে দুবৃর্ত্তদের ছুরির আঘাতে বিএনপির সমর্থক খোরশেদ আলম (৩০) আহত হয়েছে।  গতকাল সোমবার সকাল ৯ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। আহত খোরশেদ আলম চান্দগাঁও থানার বহদ্দারহাট বহদ্দারবাড়ীর মৃত নূর আলমের ছেলে। তার শরীরের হাটুর উপরে ও হাতে ছুরির আঘাত রয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের ক্যাজুয়াটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন তিনি। এছাড়া নগরীর চাঁন্দগাঁও এলাকার এনএমসি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পুলিশ-বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এছাড়া নগরীরর রাবেয়া বশর ইনস্টিটিউট ও আল হুমায়রা মহিলা মাদরাসায় বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিএনপি সমর্থকদের অভিযোগ, চাঁন্দগাঁও এলাকার এনএমসি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ধানের শীষের এক সমর্থককে পিটিয়ে ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে ছাত্রলীগের কর্মীরা। এরপর সেই সমর্থককে পুলিশ গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ধানের শীষের এক সমর্থককে পুলিশ গাড়িতে তুলে নিলে তাকে ছাড়িয়ে নিতে বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে ধানের শীষের ওই সমর্থককে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এদিকে পুলিশের অভিযোগ, বিএনপির সমর্থকরা তাদের ওপর হামলা চালিয়ে দুই কনস্টেবলের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে যায়। পরে অবশ্য সেগুলো ফেরত পাওয়া গেছে। রাবেয়া বশর ইনস্টিটিউট ভোটকেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থীর এজেন্ট সালাউদ্দিন শাহেদ অভিযোগ করে জানান, তাদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হচ্ছে। ধানের শীষ সমর্থিত ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। কেবলমাত্র নৌকার সমর্থকরা ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে পারছে।
এদিকে নগরীর বহাদ্দেরহাট এলাকার এখলাসুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী। পরিদর্শন শেষে বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান বলেন, বোমাবাজির মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র দখল করে বাহিরাগত সন্ত্রাসীরা ভোট দিচ্ছে। আমাদের সমর্থকদের ভোট দিতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি আমার এজেন্টদেরও বের করে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে নির্বাচন হলে তা মেনে নেব না। তবে শেষ পর্যন্ত আমি ভোটের মাঠে থাকব।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমেদ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে বলেন, বিএনপি আসলে আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচন করছে। তাদের কাজই হলো অভিযোগ করা। এখন পর্যন্ত কোথাও কারচুপির কোনো ঘটনা ঘটেনি। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে। আর এতে যে ফলাফল আসবে আমি মেনে নেব।
বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (উত্তর) উপ-কমিশনার বিজয় বসাক বলেন, নির্বাচনে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে বোমাবাজির অভিযোগ সঠিক না। আমার কাছে এরকম কোনো তথ্য নেই। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এদিকে বোয়ালখালী থেকে আমাদের প্রতিনিধি জানান, বোয়ালখালী উপজেলায় ভোটের আগে উত্তাপ ছড়ালেও নির্বাচনের দিন পরিবেশ ছিলো শান্ত। কুয়াশা মোড়ানো সকাল থেকে ভোটারদের সরব উপস্থিত ছিলো কেন্দ্রে। লাইনে দাঁড়িয়ে নারী ও পুরুষ ভোটাররা ভোট দিতে দেখা গেছে। অন্যান্যবারের চেয়ে এবারের ভোট দানের দৃশ্য ছিলো অন্যরকম। ভোটাররা ভোট দিতে গিয়ে নিজের ছবি সম্বলিত জাতীয় পরিচয় পত্র দেখতে পেয়েছেন মেশিনে। এ নিয়েই আলোচনায় সরব ছিলেন ভোটাররা। সকাল থেকে উপজেলার প্রতিটি কেন্দ্র ছিলো আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। কেন্দ্রের আশেপাশে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। তবে কয়েকটি কেন্দ্রে বিএনপিসহ অন্যান্য প্রার্থীদের  এজেন্টের উপস্থিতি দেখা গেছে।
উপজেলা কয়েকটি কেন্দ্রে নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন ভোট কেন্দ্রে ভোটাররা আঙুলের ছাপ দিয়ে নিজের পরিচয় সনাক্ত করলেও ব্যালেটে ভোট দিয়েছেন আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকরা। দুপুরের পর থেকে কেন্দ্রগুলো ফাঁকা হয়ে পড়ে। চরণদ্বীপ সিকদারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিকেল ৩টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ভোটারের লাইন ছিলো ফাঁকা। প্রিসাইডিং অফিসার গৌতম রায় জানান, ৭৩৬ ভোট কাস্ট হয়েছে। ওই কেন্দ্রে ভোটার রয়েছেন ২ হাজার ৭৩০জন।   নির্বাচনের আগে বোয়ালখালীতে প্রচার প্রচারণায় বাধা দেওয়া, পোস্টার-ব্যানার ছেঁড়া, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে আসছিলেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদ্বয়।
তবে এ ধরণের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা নির্বাচনের দিন ঘটেনি বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আছিয়া খাতুন। তিনি বলেন, উপজেলার প্রতিটি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিজিবি, পুলিশ, আনসার, এপিবিএন, র‌্যাব, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সর্তক অবস্থানে রয়েছেন। দিনব্যাপী ভোট চলাকালীন সময়ে কোনো ধরণের অভিযোগ পাননি জানিয়ে তিনি বলেন, ভোটাররা সুন্দর পরিবেশে ভোট দিতে পেরেছেন।
জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাট সেতুর মাধ্যমে নগর ও জেলার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এই আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৯৮৮। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪১ হাজার ৯২২ ও নারী ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪ জন। বোয়ালখালী উপজেলায় ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৬৪ হাজার। বাকি ভোটার চট্টগ্রাম নগরীতে। নগরী ও উপজেলায় ১৭০টি কেন্দ্রে ১১৯৬টি ভোটকক্ষে ভোট নেওয়া হচ্ছে। একটি পৌরসভা, ৯টি ইউনিয়ন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পাঁচটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত কর্ণফুলী নদীপাড়ের চট্টগ্রাম-৮ আসন। বোয়ালখালী পৌরসভার সঙ্গে থাকা ৯টি ইউনিয়ন হচ্ছে- কধুরখীল, পশ্চিম গোমদন্ডী, পূর্ব গোমদন্ডী, শাকপুরা, সারোয়াতলী, পোপাদিয়া, চরণদ্বীপ, আমুচিয়া এবং আহল্লা করলডেঙ্গা। চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামি থানার অধীন ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড পড়েছে এই আসনে।
জাসদ নেতা মঈনউদ্দিন খান বাদলের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপ-নির্বাচনে ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ক্ষমতাসীন দলের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ, বিএনপির একই জেলা কমিটির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) চেয়ারম্যান এস এম আবুল কালাম আজাদ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের সৈয়দ মোহাম্মদ ফরিদ আহমদ, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ এমদাদুল হক এবং ন্যাপের বাপন দাশগুপ্ত আছেন প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোছলেম এবং সুফিয়ানের মধ্যে।