banner

শেষ আপডেট ১০ ডিসেম্বর ২০১৯,  ২০:৪৮  ||   মঙ্গলবার, ১০ই ডিসেম্বর ২০১৯ ইং, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

নগরীতে মোবাইল চোরচক্রের ১৫ সদস্য আটক

নগরীতে মোবাইল চোরচক্রের ১৫ সদস্য আটক

২ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২১:১১ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • নগরীতে মোবাইল চোরচক্রের ১৫ সদস্য আটক

ক্রাইম প্রতিবেদকঃ আমি রেলস্টেশনে থাকি। ট্রেনে করে ফেনী, লাকসাম, ভৈরব, ঢাকায় চলে যাই। কাজ (ছিনতাই) করে আবারও চট্টগ্রাম স্টেশনে চলে আসি। গতকাল সোমবার কথাগুলো বলেছিল নগরী থেকে গ্রেফতার হওয়া এক মোবাইল চোর চক্রের সদস্য জয় বড়ুয়া। গত রোববার ১৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ মোবাইল ছিনতাইকারী দলকে গ্রেফতার করেছে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। এদের মধ্যে জয় বড়ুয়াও রয়েছে।

গ্রেফতারের পর তারা পুলিশকে জানিয়েছে, চট্টগ্রাম রেলস্টেশন এলাকার কয়েকজন মোবাইল বিক্রেতার আশ্রয়ে থেকে তারা ছিনতাই করে। ছিনতাইয়ের পর মোবাইল তুলে দেয় ওই বিক্রেতাদের হাতে। বিনিময়ে তাদের হাতখরচ এবং যাদের বয়স কম তাদের পথশিশুদের স্কুলে পড়ালেখার সুযোগ করে দেন ওই বিক্রেতারা।
নগরীর পুরাতন রেলস্টেশনসহ আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান।

গ্রেফতারের পর তাদের আজ সোমবার সকালে নগরীর মোমিন রোডে সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের উপ-কমিশনারের কার্যালয়ে আনা হয়।

গ্রেফতার ১৫ জন হলেন রাব্বি আল আহম্মদ (২০), মো. মামুন (২৯), মো. সোহাগ (২৬), জয় বড়ুয়া প্রকাশ আব্দুল (১৮), মো. আজিম প্রকাশ আজম (২২), দেলোয়ার হোসেন প্রকাশ দেলু (৩৭), মো. মামুন (১৮), মো. আল আমিন শেখ (২১), মো. রুবেল (৩০), মো. বশির (২৫), মো. মিন্টু (৩০), মো. শাহাদাত হোসেন বাবু (২৮), জয়নাল আবেদীন (১৯), মো. জহির (২৮) ও লেদু প্রকাশ আলাউদ্দিন প্রকাশ হাসান (৩০)।

গ্রেফতার জয় বড়ুয়া আরো জানায়, তার বাড়ি রাউজান উপজেলার ইদিলপুরে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার পর আর্থিক অনটনের কারণে সে কাজের খোঁজে শহরে চলে আসে। রেলস্টেশনের ছিনতাইকারী দলের নেতা বদির কাছে সে আশ্রয় পায়। বদির বোন লাকী এবং বদি তাকে ছিনতাইয়ের কাজে লাগায়। এখন পুরাতন রেলস্টেশন ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেনের অধীনে থেকে সে ছিনতাই করে। কাইয়ূম এবং বদির অর্ডারেও মাঝে মাঝে ছিনতাই করে। রেলস্টেশনে তাকে সবাই আব্দুল নামে চেনে।
মাঝে মাঝে আনোয়ার সাহেব আমাকে ফোন করেন। মোবাইল দিতে বলেন। তখন আমি কাজ (ছিনতাই) করে উনাকে মোবাইল দিয়ে আসি। তিনি আমাকে হাতখরচের জন্য কিছু টাকা দেন। এছাড়া তিনি আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। সেখানে আমি পড়ালেখা করি। বদি ভাই এবং কাইয়ূম ভাইও মাঝে মাঝে কাজে লাগান।

জয় জানায়, সে মূলত নারীদের টার্গেট করে কাজ করে। তাদের সাইড ব্যাগ থেকে চেইন খুলে মোবাইল নিয়ে দ্রুত  পালিয়ে যায়। তার ভাষায়- নারীদের কাছ থেকে ছিনতাই করা খুব সহজ। ১-২ মিনিটের মধ্যেই মোবাইল নিয়ে আড়ালে চলে যাওয়া যায়।

গ্রেফতার বশির বলেন, আমি ৩-৪ বছর ধরে ছিনতাই করি। পুরান রেলস্টেশনের বদি ভাই আমার গুরু। কিছুদিন আগে বদি ভাই ডিবি’র হাতে গ্রেফতার হয়। তখন বদি ভাইয়ের বোন লাকী আপা আমার খোঁজখবর নিত। বদি ভাই আমাকে পথশিশুদের স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। সেখানে আমাকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন বলেন, এরা ৩-৪ গ্রুপে ভাগ হয়ে চুরি-ছিনতাই করে। একেকটি দলে ৩-৪ জন করে থাকে। এরা জনাকীর্ণ স্থান যেমন- রেলস্টেশন, বাস স্টপেজ, গণপরিবহন যেখানে থামিয়ে যাত্রী তোলা হয় সেখানে থাকে আর সুযোগ বুঝে ছিনতাই করে। প্রথমে টার্গেট করা ব্যক্তিকে ধাক্কা দিয়ে বা যে কোনো উপায়ে বিব্রত করে এবং কথা বলা বা ঝগড়ার ফাঁকে পকেট থেকে মোবাইল নিয়ে নেয়। নারীকে একা পেলে তার আশপাশে ভিড় তৈরি করে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে মোবাইল নিয়ে নেয়।

সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের উপ-কমিশনারের কার্যালয়ে গ্রেফতার রাব্বী জানান, মোবাইল বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন, আব্দুল জলিল ও আব্দুস শুক্কুরের অধীনে রাব্বী কাজ করে। ১০ নম্বর রুটের বাসে উঠে রাব্বী। সেখানে দাঁড়ানো যাত্রীদের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। ৩০ সেকেন্ড থেকে এক মিনিটের মধ্যে পকেট থেকে মোবাইল নিয়ে ফেলে। এভাবে দিনে অন্তত একটি মোবাইল ছিনতাই করে। এরপর রেলস্টেশন ও বাস স্টপেজে দাঁড়ায়। যাত্রী ট্রেনে-বাসে ওঠার সময় তাড়াহুড়োর মধ্যে পকেট থেকে মোবাইল নিয়ে নেয়। সেই মোবাইল অর্ডার অনুযায়ী আনোয়ার, জলিল ও শুক্কুরের কাছে দেয়। প্রতিটি মোবাইলের বিনিময়ে ৩০০-৫০০ টাকা পায়।

গ্রেফতার অভিযানে অংশ নেওয়া নগর পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) সজল দাশ বলেন, এরা প্রত্যেকেই প্রশিক্ষিত। ৩০ সেকেন্ড থেকে এক মিনিটের মধ্যে মোবাইল ছিনতাইয়ে সক্ষম তারা। রেলস্টেশনের আশপাশের এলাকায় ভাসমান কিছু দোকানে মোবাইল সেট বিক্রি হয়। চোরাই মার্কেট হিসেবে সেগুলো পরিচিত। মূলত সেই দোকানদারদের কয়েকজনের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে এরা ছিনতাই করে।

ওসি মোহাম্মদ মহসীন আরো বলেন, বিভিন্ন সময় আমরা চোরাই মোবাইলের সূত্র ধরে দোকানগুলোতে অভিযান চালিয়ে কয়েকজন বিক্রেতাকে গ্রেফতার করেছি। এখন যে ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের কাছে ১২টি মোবাইল সেট ও ৪টি ছুরি পাওয়া গেছে। সেই মোবাইলগুলোর সূত্র ধরে এবং জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অভিযান চালাব। গ্রেফতার ১৫ জনের মধ্যে ১২ জনের বিরুদ্ধে আগেও চুরি-ছিনতাইয়ের মামলা আছে বলে ওসি জানিয়েছেন।

নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান বলেন, মোবাইল ছিনতাইয়ের পর অনেকেই থানায় অভিযোগ নিয়ে আসে না। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয় কিংবা ওসিকে ফোন করে অনুরোধ করে মোবাইলটি উদ্ধার করে দেওয়ার জন্য। আমরা আশা করব, ভুক্তভোগী সবাই মামলা করবেন। কারণ, এখন আমরা যাদের গ্রেফতার করেছি, কয়েকজনের ফেসবুকের স্ট্যাটাস দেখে তাদের ধরা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট মামলা থাকলে আমাদের কাজ করতে সুবিধা হয়।