banner

শেষ আপডেট ১০ ডিসেম্বর ২০১৯,  ২০:৪৮  ||   মঙ্গলবার, ১০ই ডিসেম্বর ২০১৯ ইং, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটাল প্ল্যানে সংখ্যালঘু হামলা

ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটাল প্ল্যানে সংখ্যালঘু হামলা

২৮ নভেম্বর ২০১৯ | ২১:১৭ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটাল প্ল্যানে সংখ্যালঘু হামলা

রাজিব শর্মা : বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের একটি সাধারণ ছক আছে৷ আর এখন এরসঙ্গে ডিজিটাল পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে৷ কিন্তু প্রশাসন ও পুলিশ সব কিছু জেনেও আগে কোনো ব্যবস্থা নেয় না৷ হামলা বা আক্রমণের পর তারা সক্রিয় হয়৷
ভোলায় কথিত ফেসবুক মেসেজ নিয়ে যে সংঘর্ষ এবং হিন্দুদের ওপর হামলা হলো তা হঠাৎ করে ঘটেনি৷ অভিযুক্ত যুবক বিপ্লব চন্দ্র শুভর ফেসবুক আইডি হ্যাকের ঘটনা আগেই জানতে পেরেছিল পুলিশ৷ যারা হ্যাক করেছে তাদেরও আটক করা হয়৷পরবর্তীতে পুলিশ স্থানীয় ‘তৌহিদী’ নেতাদের সাথে বৈঠক করে৷ তারা সমাবেশ করবে না বলার পর পুলিশ আশ্বস্ত হয়৷ কিন্তু পরবর্তীতে শুধু সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনাই নয় প্রায় একই সময় হিন্দুদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মন্দির এবং বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে৷

হিন্দুদের যেসব বাড়ি ঘরে হামলা হয়েছে তা থানা থেকে মাত্র থেকে দুইশ গজের মধ্যে৷ কিন্তু পুলিশ ওইসব এলাকায় আগাম কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে৷ হামলার শিকার সঞ্জয় দাস জানান, ‘‘একটি মন্দির, একটি দোকান ও নয়টি ঘরে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়৷ আমার বৃদ্ধ মাকে মারধর করা হয়৷ কিন্তু পুলিশ আগাম কোনো নিরপত্তার ব্যবস্থা নেয়নি৷ এখনো আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি৷”

‘যারা গুজব ছড়ায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখিনি’
২০১৬ সালের অক্টোবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর হামলাও হয়েছিল ঠিক একই পদ্ধতিতে৷ রসরাজ নামের একজন ফেসবুকে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে পোস্ট দিয়েছিল বলে গুজব ছাড়ানো হয়েছিল৷ পরে জানা যায় রসরাজ সেই পোস্টই দেয়নি৷ ফেসবুক সম্পর্কে তার কোনো ধারণাও ছিল না৷ কিন্ত তথ্য প্রযুক্তি আইনে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে৷ পেশায় জেলে রসরাজ তিনমাস কারাবাসের পর জামিনে মুক্তি পায়৷ কিন্তু এক্ষেত্রেও পুলিশ আগাম কোনো ব্যবস্থা নেয়নি৷ অথচ কয়েক দিন ধরেই ওই কথিত ফেসবুক পোস্ট নিয়ে উত্তেজনা চলছিল৷

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ২০১৭ সালের নভেম্বরে হিন্দুদের বাড়িঘরেও একই পদ্ধতিতে হামলা করা হয়৷ টিটু রায় নামে একজনের  বিরুদ্ধে ফেসবুক ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়৷ পরে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ৷ কিন্তু তদন্তে জানা যায়, ফেসবুকে পোস্ট দেয়া তো দূরের কথা সে লেখা পড়াই জানে না৷ টিটুর ছবি দিয়ে আরেকজন তার নামে ফেসবুকে আইডি খুলেছিল৷

২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে রামুর বৌদ্ধ পল্লিতে হামলার পেছনেও একই কৌশল অবলম্বন করা হয়৷ উত্তম বড়ুয়া নামে একজনের বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননা করে ফেসবুক পোস্ট-এর গুজব ছড়িয়ে চালানো হয় সেই হামলা৷  হামলার পর থেকে উত্তম নিখোঁজ আছেন৷ তাঁর স্ত্রী রীতা বড়ুয়া এক সন্তান নিয়ে এলাকা ছেড়ে এখন অন্য জায়গায় চলে গেছেন৷ তিনি জানান, ‘‘পুলিশও তাঁর কোনো খোঁজ দিতে পারছেনা৷ আমি একটি সন্তান নিয়ে অনেক কষ্টে আছি৷”

এই প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে হামলার আগে পুলিশ ঘটনা সম্পর্কে জানতে পেরেছিল৷ উত্তেজনা ছড়ানো, মাইকিং করার পরও তারা আগাম কোনো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি৷

বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাসগুপ্ত বলেছিলেন ‘‘ফেসবুকে  ধর্ম অবমাননার গুজব ছাড়িয়ে রামু, উখিয়া, টেকনাফ, পাবনা, দিনাজপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুরসহ আরো অনেক জায়গায় আমরা সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা দেখেছি৷ যার সর্বশেষ ঘটনা দেখলাম ভোলার বোরহানউদ্দিনে৷ প্রতিটি ঘটনায় হামলার আগে পরিবেশ নানাভাবে উত্তপ্ত করা হয়৷ পুলিশ নির্বিকার থাকে৷ এমনকি যারা এই গুজব ছড়ায় তাদের বিরুদ্ধেও পরে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখিনি৷ আর হামলাকারীরাতো বিচারের আওতায় আসেই না৷ তবে এবার ভোলায় একমাত্র ব্যতিক্রম আমরা দেখেছি৷ যারা ফেসবুক হ্যাক করে অপকর্ম করেছে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ কিন্তু তারপরও পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় সংঘর্ষ এবং হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছে৷”

পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী
বর্তমান সংখ্যা বিবিএসের করা বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকসের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ৮৮ দশমিক ৪ ভাগ৷ হিন্দু এবং অন্য ধর্মাবলম্বী ১১ দশমিক ৬ ভাগ৷ ২০১১ সালের আদমশুমারির হিসাবে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা ছিল ৯ দশমিক ৬ শতাংশ৷ সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৪৬ লাখের হিসাবে তাদের সংখ্যা ১ কোটি ৭৪ লাখ৷

পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মোট জনসংখ্যায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী কমে যাওয়ার হারে আবারো ধীরগতি দেখা যায়৷ ১৯৭৪ সালের প্রথম আদমশুমারিতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর হার ছিলো ১৪.৬ শতাংশ৷ ২০১১ সালে সেটি কমে আসে ৯.৬ শতাংশে৷ অর্থাৎ বাংলাদেশ আমলে ৩৭ বছরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর শতকরা হার কমেছে ৫ শতাংশ৷ ১৯৭৪ সালে এ সংখ্যা হয় ১ কোটি চার লাখ ৩৯ হাজার৷

পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী দেশভাগের আগে ১৯১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সেসময় পূর্ব বাংলায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হার ছিলো ৩১ শতাংশ৷ ১৯৪১ সালে ২৮ শতাংশ৷ অর্থাৎ ২০ বছরে হিন্দু জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হার কমেছে ৩ শতাংশ৷ তবে ১৯৪১ থেকে ১৯৭৪ সময় হিন্দু জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হার কমে যায় প্রায় ১৫ শতাংশ৷ এর মধ্যে ১৯৪৭ সালে ভারত-ভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ বিভিন্ন কারণে হিন্দু-মুসলিম উভয়ের দেশান্তরী হওয়ার ঘটনা ছিল৷

পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী পাকিস্তান আমলে ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায়, সেসময় পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিলো ৯৭ লাখ ৬ হাজার৷ ১৯৬১ সালের আদমশুমারিতে এ সংখ্যা ৯৯ লাখ ৫০ হাজার৷

পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সংখ্যায় কতোটা কমেছে ভারত-ভাগের পর ১৯৫১ সালে ৯৭ লাখ ৬ হাজার থেকে ২০১১ সালে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৮ লাখে৷ কিন্তু সংখ্যাগুরু মুসলিমদের তুলনায় এই হার কমেছে৷ এই কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান শুধু পাকিস্তান আমলে কিংবা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরই যে দেখা যাচ্ছে তেমন নয়৷ বরং ব্রিটিশ আমলেও এই অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের আনুপাতিক হার কমে যাওয়ার প্রবণতা ছিল৷ মুসলিমদের জন্মহার বেশি হওয়াকে এর কারণ হিসাবে দেখান কেউ কেউ৷

তিনি বলেন, ‘‘২০১২ সাল থেকে সংখ্যালঘুদের নির্যাতনে ফেসবুকের মত ডিজিটাল ব্যবস্থাকে গুজব ছড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে৷ আগে অন্যভাবে গুজব ছড়ানো হতো৷ বাকি কৌশলগুলো একই আছে৷”

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান  মনে করেন, ‘‘পুলিশ ও প্রশাসন যথাসময়ে ব্যবস্থা নিলেও এই প্রতিটি ঘটনাই ঠেকানো যেত৷ কারণ প্রতিটি ঘটনাই পরিকল্পিতভাবে হয়েছে৷ হামলার কয়েকদিন আগে থেকেই গ্রুপগুলো প্রকাশ্যে তৎপরতা চালিয়েছে৷ মাইকিং করেছে, বিদ্বেষ ছড়িয়েছে এবং লোকজনকে সংগঠিত করেছে৷ আর প্রতিটি ঘটনায়ই দেখা গেছে ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননার গুজব বা অন্যরা তা পোস্ট করে সংখ্যালঘুদের ফাঁসিয়েছে৷ যা আগেই পুলিশ জানত৷”

তাহলে পুলিশ প্রশাসন আগাম ব্যবস্থা নেয় না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘পুলিশের ওপর একটা রাজনৈতিক চাপ থাকে৷ একটা ভয়ের পরিবেশে তারা কাজ করেন৷ তারা সেই বিষয়গুলো বিবেচনা করে৷ তারা চায় কিছু একটার মাধ্যমে পরিস্থিতি অনুকূলে নিতে৷ চাপ কমাতে৷”

তবে তিনি মনে করেন, ‘‘এই নিস্ক্রিয়তার মধ্যে একটি ব্যবসাও আছে৷ ঘটনা ঘটলে মামলা হয়৷ এর বেনিফিট বেশি৷ মামলা হবে, অজ্ঞাতনামা আসামি হবে৷”

লেখকঃ রাজিব শর্মা(এম.ডিভ), রক ভ্যালী মিনিস্ট্রি(ইউএসএ) এর ছাত্র, ক্রাইম প্রতিবেদক ।

বি.দ্রঃ সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে এই ডকুমেন্টারি সম্পাদক, প্রকাশক ও লেখকের অনুমতিবিহীন কোথাও প্রকাশ না করার অনুরোধ রইল।