banner

শেষ আপডেট ৩ ডিসেম্বর ২০১৯,  ২০:৪৭  ||   শনিবার, ৭ই ডিসেম্বর ২০১৯ ইং, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

পাথরঘাটায় গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে নিহত সাত, পুরো ভবন এখন যেন মৃত্যুপুরী

পাথরঘাটায় গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে নিহত সাত, পুরো ভবন এখন যেন মৃত্যুপুরী

১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ২০:৪৯ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • পাথরঘাটায় গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে নিহত সাত, পুরো ভবন এখন যেন মৃত্যুপুরী

ক্রাইম প্রতিবেদকঃ নগরীর পাথরঘাটায় পাঁচতলা ভবনের নিচতলায় গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে নিহত সাত পরিবারে এখনো চলছে স্বজনদের আহাজারি। আজ সোমবার নিহতদের পরিবারে গিয়ে স্বজন হারানোর বেদনায় এমন আহজারি দেখা গেছে। এছাড়া বিকট শব্দে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা মন থেকে মুছতে পারছেন না এলাকার লোকজন। বিস্ফোরণস্থল পাঁচতলা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। ওই ভবনের সব বাসিন্দারা বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। পুরো ভবনটি এখন যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে !
পাথরঘাটায় ঘটনাস্থলে এখনো অসংখ্য মানুষের আনাগোনা থাকলেও কারো মুখে হাসি নেই। সকলের মুখেই কষ্টের ছায়া। বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্থ ওই ভবনের সামনে রাস্তায় চলা পথচারীরা আতংক নিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। অথচ একদিন আগে গত রোববার বিস্ফোরণের আগ পর্যন্ত অসংখ্য পথচারীর আনাগোনা,  গাড়ি পোঁ-পোঁ হর্ন, রিকশার টুংটাং ঘণ্টার আওয়াজ, সরু গলিতে রিকশা আর গাড়ির জটলা ইত্যাদি সবই ছিল। এখন শুধু আসবাবপত্রের ছড়ানো ছিটানো, সিমেন্ট কংক্রিটের টুকরো, দেয়াল ভাঙা, বেরিয়ে আছে শুধু কংক্রিটের পিলার। খসে পড়েছে সব প্লাস্টার, গ্রিল বাঁকাচোরা, ভেতরে কোনো কিছু ছিল সেটাও বোঝার উপায় নেই।
আজ নগরীর পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড এলাকায় জনতা ফার্মেসি ও বাদশা মিয়া ভবনের পাশে বিস্ফোরিত বড়ুয়া ভবন ঘুরে দেখা গেছে, ভবনের নিচ তলা একটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ভেঙে পড়া কংক্রিটের দেয়াল পড়ে রয়েছে।

স্থানীয় লোকজন দুঃখ ও ক্ষোভের সাথে বলেছেন, নিমিষেই কতটি মানুষের জীবন ও সর্বস্ব হারানোর আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়েছে। এদিকে বিস্ফোরণস্থলে আজ সোমবার সকালেও কৌতূহলী মানুষের ভিড় লেগে আছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসছেন ঘটনাস্থল দেখতে। আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, বিস্ফোরণে ভবনের নিচতলায় দেওয়াল বিধ্বস্ত হয়েছে। এর ফলে পুরো ভবনটিই এখন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পরিণত হয়েছে। গত রোববার উদ্ধারকাজের সময়ই আমরা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলেছিলাম।
এদিকে আজ সোমবার সকালে বিস্ফোরক অধিদফতরের একটি দলও ঘটনাস্থলে যায়। বিস্ফোরক অধিদফতরের পরিদর্শক মো তোফাজ্জল বলেন, গ্যাস লিকেজের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বিস্ফোরণের ঘটনায় গঠিত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গঠিত তদন্ত কমিটির কাজও চলমান আছে। আজ সোমবার সকাল ১১টার দিকে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ জেড এম শরিফ হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইসমাইল হোসেন বালি, কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন, ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী এবং কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) আ ন ম সালেক। জেলা প্রশাসনের গঠিত কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা যে বাসায় বিস্ফোরণ ঘটেছে, এর বাসিন্দা মণি রাণী দেবী ও তার ছেলে অর্ণব দেবনাথের সঙ্গে কথা বলেছেন। এছাড়া প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের বক্তব্যও নিয়েছেন কমিটির সদস্যরা।
কমিটির এক সদস্য বলেন, আমরা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, ভিকটিমসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলছি। তাদের বক্তব্য রেকর্ড করা হচ্ছে। যে বাসায় বিস্ফোরণ হয়েছে সেই বাসার রান্নার চুলা পরীক্ষা করা হয়েছে। ওই ভবনের গ্যাসের লাইন পরীক্ষা করা হয়েছে।
কেজিডিসিএল’র মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) আ ন ম সালেক বলেন, গ্যাসজনিত কারণে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে গ্যাসের লাইনে কোনো লিকেজ পাইনি। সেফটি ট্যাংকের গ্যাস থেকে এটা ঘটতে পারে। আবার রান্নার চুলার নব খোলা দেখেছি। বিষয়টা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে বিস্ফোরণে আহতদের দেখতে গিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফটে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ দলটির কয়েকজন নেতা। বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ-ভাঙাচোরা লিফটটির চেইন ছিঁড়ে দোতলার কাছাকাছি থেকে নিচতলায় গিয়ে পড়ে। এসময় তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত তারা অক্ষতভাবে লিফট থেকে বের হতে পেরেছেন। গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী মো. সেলিম।
সেলিম জানান, হাসপাতালের পাঁচতলায় অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে আহতদের দেখে নিচতলায় নামার জন্য লিফটে উঠেছিলেন বিএনপি নেতারা। এদের মধ্যে ছিলেন, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, শাহাদাত হোসেন, এম এ আজিজ, সাইফুল ইসলাম, ইয়াছিন চৌধুরী লিটনসহ কমপক্ষে ১২ জন নেতা। তাদের সঙ্গে যাওয়া আরও নেতাকর্মীরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন।
জানা গেছে, বিস্ফোরণে মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এছাড়া চিকিৎসার জন্য আহতদের প্রত্যেককে তিনি ২০ হাজার টাকা করে দেবেন বলে জানিয়েছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে নওফেল এ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন বলে জানান তার ব্যক্তিগত সহকারী নাজিউর রহমান সিকদার অনিক।
অনিক বলেন, ব্যক্তিগত তহবিল থেকে শিক্ষা উপমন্ত্রী নিহতদের প্রত্যেকের জন্য এক লাখ টাকা এবং আহতদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে দেবেন। আজ  মঙ্গলবার সকালে তিনি চট্টগ্রামে এসে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের দেখতে যাবেন। এরপর তিনি পাথরঘাটায় ঘটনাস্থলে যান।
এর আগে গত রোববার সকালে নগরীর কোতোয়ালী থানার পাথরঘাটা ব্রিক ফিল্ড রোডে বড়ুয়া ভবন নামে একটি পাঁচতলা বাড়ির নিচতলায় বিস্ফোরণে দেওয়াল বিধ্বস্ত হয়। আশপাশের আরও কয়েকটি বাসা এবং দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণে নারী ও কিশোরসহ সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন।