banner

শেষ আপডেট ১৯ নভেম্বর ২০১৯,  ২২:২৬  ||   মঙ্গলবার, ১৯ই নভেম্বর ২০১৯ ইং, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ওয়ার্কার্স পার্টি তৃতীয় দফায় বড় ভাঙনের মুখে

ওয়ার্কার্স পার্টি তৃতীয় দফায় বড় ভাঙনের মুখে

২৮ অক্টোবর ২০১৯ | ১৮:৪৭ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ওয়ার্কার্স পার্টি তৃতীয় দফায় বড় ভাঙনের মুখে

ঢাকা অফিসঃ একাদশ সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বক্তব্যের পর চাপে থাকা রাশেদ খান মেনন ১৪ দলকে সন্তুষ্ট করতে পারলেও নিজের দলে ভাঙন ঠেকাতে পারছেন না। পলিটব্যুরোর সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস দল ছাড়ার পর ওয়ার্কার্স পার্টির আরও ছয় কেন্দ্রীয় নেতা দলের আসন্ন কংগ্রেস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

এই ছয় নেতা হলেন পলিটব্যুরো সদস্য নুরুল হাসান ও ইকবাল কবির জাহিদ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জাকির হোসেন হবি, মোফাজ্জেল হোসেন মঞ্জু, অনিল বিশ্বাস ও তুষার কান্তি দাস। তারা আরেকটি দল গঠন করতে যাচ্ছেন, যে দল নিয়ে আওয়ামী লীগের জোটে না থেকে পুরনো বামসঙ্গীদের সঙ্গে মেলার ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।

চীনপন্থি কয়েকটি কমিউনিস্ট পার্টি এক হয়ে ১৯৯২ সালে ওয়ার্কার্স পার্টি গঠনের পর এ নিয়ে তৃতীয় দফায় বড় ভাঙনের মুখে রয়েছে দলটি। এর আগে সাইফুল হক আলাদা দল গঠন করেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধার পর হায়দার আকবর খান রনোর নেতৃত্বে একদল ওয়ার্কার্স পার্টি ছেড়ে সিপিবিতে যোগ দিয়েছিলেন।

আগামী ২-৫ নভেম্বর দশম কংগ্রেস করতে যাচ্ছে ওয়ার্কার্স পার্টি। সভাপতির একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য বাম দলটি মেননের দল হিসেবেই রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত।

কংগ্রেসের ব্যস্ততার মধ্যেই গত ১৯ অক্টোবর বরিশালে দলের এক সভায় একাদশ সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করে বক্তব্যের জন্য জোটের বড় দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের কড়া সমালোচনায় পড়েন মেনন। ওই বক্তব্যের বিষয়ে মেননের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্টির কথা ১৪ দলের পক্ষে জানানোর মধ্যেই সোমবার ওয়ার্কার্স পার্টির ছয় নেতার কংগ্রেস বর্জনের ঘোষণা আসে।

কয়েকদিন আগে বিমল বিশ্বাস যেভাবে দল ছেড়েছিলেন, এই ছয় নেতাও তেমনি গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে কংগ্রেস বর্জনের কথা জানান।

ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, “জনগণ সব সময় চেয়েছে ঐক্যবদ্ধ পার্টি। আমরা ‘৯২ সালে কংগ্রেস করে ঐক্যবদ্ধ পার্টি করেছি।…এখন পার্টির মূল রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে যারা রয়েছে, তাদেরকে নিয়ে লেট কমিউনিস্ট ইউনিটির যে প্রক্রিয়া সে প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হব।”

নতুন দল গঠনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “হ্যাঁ; আমরা ওই লক্ষ্যেই যারা আদর্শবাদী পার্টির ভেতরে রয়েছে তাদেরকে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি- আসেন আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কমিউনিস্ট আন্দোলন, বাম ঐক্যকে এগিয়ে নিয়ে যাই।”

নতুন দলের নাম কী হবে- জানতে চাইলে ইকবাল কবির জাহিদ জানান, এটা বিষয়ে সমমনা বন্ধুদের সঙ্গে বসে দ্রুতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তারা। “৫ নভেম্বরের আগেই আমাদের বসার চিন্তাভাবনা রয়েছে। আমরা বসে কীভাবে কাজ করব, চূড়ান্ত করা হবে। কংগ্রেস বর্জনে আমাদের তালিকা দীর্ঘ, সবার নাম দিইনি গণমাধ্যমে।”

গঠনের পর ওয়ার্কার্স পার্টি প্রথমে সিপিবি নেতৃত্বাধীন বাম ফ্রন্টে ছিল। পরে ১১ দল গঠন হলে সেই জোটেও ছিল দলটি। কিন্তু দেড় যুগ আগে আওয়ামী লীগকে নিয়ে গঠিত ১৪ দলে ওয়ার্কার্স পার্টি যোগ দিলে সিপিবি, বাসদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কচ্ছেদ ঘটে।

আওয়ামী লীগের জোটে যোগ দেওয়ায় তখন ওয়ার্কার্স পার্টির মধ্যেও একদল ক্ষুব্ধ হন, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে রনোদের এক অংশের দল ছাড়ার মধ্য দিয়ে। তারা বলছিলেন, ওয়ার্কার্স পার্টিতে আদর্শচ্যুতি ঘটেছে।

ইকবাল কবির জাহিদরাও বর্তমান নেতৃত্বে বিরুদ্ধে আদর্শচ্যুতির অভিযোগ তুলেছেন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা বলেছেন, “ওয়ার্কার্স পার্টি বর্তমানে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে সংস্কারবাদী, সুবিধাবাদী পার্টিতে পরিণত হয়েছে।”

ক্যাসিনো বসানো ক্লাবে মেননের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “শীর্ষ নেতৃত্ব আজ রাজনৈতিক দুর্নীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক দুর্নীতিতে আক্রান্ত।” আওয়ামী লীগের ‘লেজুড়বৃত্তি’ করে ওয়ার্কার্স পার্টি ‘দেউলিয়া দলে’ পরিণত হয়েছে বলেও ইকবাল কবিরদের দাবি।

তিনি বলেন, “বাইরে থেকে দেখলে এটা ভাঙন, আসলে এটা আদর্শ রক্ষার চিন্তা।”

বর্তমান সভাপতি রাশেদ খান মেননের সঙ্গে আজ সোমবারও দলীয় মিটিংয়ে একসঙ্গে ছিলেন তারা। কিন্তু কোনো কথা হয়নি তাদের। কংগ্রেস বর্জনকারীদের সঙ্গে নতুন করে বসার বিষয়েও আলোচনা হয়নি।

ইকবাল কবির বলেন, “আর বসে কোনো ফলাফল আসবে না। কারণ দুর্বৃত্তায়ন, অর্থনৈতিক দুর্নীতি যারা করছে, তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের সঙ্গে আর অ্যাডজাস্ট হবে না।”

১৪ দল ছাড়তে শীর্ষ নেতৃত্বকে আহ্বান জানানো হয়েছিল জানিয়ে ইকবাল কবির বলেন, “বলেছিলাম আমরা- আপনারা ১৪ দলে থাকবেন না বলেন; সরকারে থাকবেন না বলেন। আসেন একসঙ্গে দাঁড়াই।

“সর্বশেষ মেনন সাহেব বরিশালে জনগণের মনের কথা, সত্য ঘটনা যা-ই বললেন; পরে এসে ইউটার্ন করলেন। আবার আওয়ামী লীগের কাছে আরও নতজানু ভূমিকা পালন করলেন।”

আগামী কংগ্রেসে আরও ‘নতজানু ভূমিকা’ নেওয়া হবে আঁচ করেই তা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত ইকবাল কবিরদের।

“যারা রাষ্ট্র ও সরকারের অর্থনৈতিকভাবে বেনিফিশিয়ারি, তাদের পক্ষে তাদের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট আন্দোলন করা সম্ভব নয়। এটাও তাদের সঙ্গে মতপার্থক্য।” ওয়ার্কার্স পার্টির একটি অংশ নতুন দল গঠনের চিন্তা করলেও তাতে ভাবিত নন দলটির সভাপতি বাংলাদেশে বাম আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষনেতা রাশেদ খান মেনন।

তিনি বলেন, “আমাদের কংগ্রেস হবে। উনি বা উনারা কংগ্রেসে না এলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রশ্ন আসবে। সেগুলো তখন বিবেচনা করব।”

দলের অভ্যন্তরে অসন্তুষ্টির বিষয়ে মেনন বলেন, যখন কেউ কংগ্রেস বর্জনের আহ্বান জানায়, সিদ্ধান্ত দেয়; তখন তো নিশ্চয় তাদের একটা লক্ষ্য রয়েছে। “মূলত যশোরের কয়েকজন এটা করছে। চারজনই তো যশোরের। …আমরা মনে করি, কংগ্রেস ঐক্যবদ্ধভাবেই হবে। দলও ঐক্যবদ্ধ থাকবে আশা করি।” যারা কংগ্রেসে বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন, তারা শেষ মুহূর্তে মত পাল্টাতে পারেন বলে মনে করেন মেনন।

“আমরা জানি সবাই কংগ্রেসে আসছে। তারা কখনও বেরিয়ে যাওয়ার কথা বা বর্জনের কথা বলেনি। গতকাল রোববার মিটিং হয়েছে; তারা সারাক্ষণ উপস্থিত ছিল।” ১৪ দলে ও সরকারে থাকা না থাকার বিষয়ে এতদিন পর এখন প্রশ্ন তোলা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি।

তিনি বলেন, এটা তাদের মত; দলের সংখ্যাগরিষ্ঠদের তো এ মত নয়।

অতীতে দল ভাঙ্গার বিষয়ে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক বলেন, “দল থেকে বের হয়ে এ ধরনের অনেকে পুনর্গঠন কেন্দ্র, কমিউনিস্ট লীগ বা সিপিবিতে গিয়েছে। কিন্তু সেখানেও তারা এক থাকতে পারেনি। …এগুলোর শেষ নেই।”