banner

শেষ আপডেট ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯,  ২২:১৭  ||   সোমবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং, ১ আশ্বিন ১৪২৬

নগরীতে একের পর এক অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে প্লাষ্টিক ও পলিথিনের কারখানা : কারখানার মালিক আয়ুব এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

নগরীতে একের পর এক অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে প্লাষ্টিক ও পলিথিনের কারখানা : কারখানার মালিক আয়ুব এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ২০:৩৬ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • নগরীতে একের পর এক অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে প্লাষ্টিক ও  পলিথিনের কারখানা : কারখানার মালিক আয়ুব এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

ক্রাইম প্রতিবেদকঃ নগরীতে একের পর এক অবৈধভাবে গড়ে উঠছে প্লাষ্টিক ও  পলিথিনের কারখানা। এসব কারখানার প্লাষ্টিক ও পলিথিন পোড়া গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে এলাকাবাসী। কিন্তু দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর বলেছে, তারা অভিযান পরিচালনা করে আসছে। চলতি মাসের সেপ্টেম্বরে তিনটি অভিযানে ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা, টনে টনে পলিথিন জব্দ করার কথা জানান।
জানা গেছে, মহানগরীতে প্লাষ্টিক ও পলিথিন রিসাইক্লিং (পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করে পণ্য তৈরি) কারখানা একের পর এক বেড়ে চলছে। মহানগরীর মুরাদপুর, বায়েজিদ, বোস্তামী ও বাকলিয়া থানাধীন এলাকাসহ কয়েকটি স্থানে এসব অবৈধ কারখানা গড়ে উঠছে। বাজারেও বিক্রি হচ্ছে এসবের উৎপাদিত পণ্য দেদারচ্ছে। প্লাষ্টিক ও পলিথিন পোড়ার দুর্গন্ধে মহল্লার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৮ নং বাকলিয়া ওয়ার্ডের আবু সওদাগর কলোনী চেয়ারম্যান ঘাটায় একটি পলিথিন কারখানা রয়েছে। এই কারখানায় ৩৫টি মেশিন বসিয়ে অবৈধ পলি (এস.ডি.পি) উৎপাদন করে আসছে। কারখানাটি এই এসডিপি তৈরী করে মার্কেটে সরবরাহ করে। উক্ত মেশিনগুলোতে প্রতিদিন ৯ টন করে পলিথিন উৎপাদন হয়ে থাকে বলে শ্রমিকরা জানালেন।

জানা গেল, এই কারখানার মালিক একই এলাকার মৃত নজির আহমদের পুত্র মো. আইয়ুব প্রকাশ পুলিশে কর্মরত আইয়ুব। তাঁর কারখানায় ছাড়পত্র আছে কি না জানতে চাইলে শ্রমিকরা বলেন,আমাদের মালিক এ বিষয়ে বলতে পারবে। আমরা এখানে মজুরির ভিত্তিতে কাজ করে আসছি।
আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, প্লাষ্টিক পোড়া গন্ধে আমরা অতিষ্ট হয়ে উঠেছি কারখানাটির জন্য। উক্ত  কারখানায় বিদ্যুৎ বিভাগের ৩ টি মিটার স্থাপন করা আছে। উক্ত মিটারগুলির বিদ্যুৎ ব্যবহৃত ইউনিটগুলি যথাযথ সরকারের খাতায় উঠেনা। কারন উক্ত মিটারগুলি ইউনিট দুনীতিবাজ বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারী ও কর্মকর্তার যোগ সাজেশে মিটারে রিডিংগুলি মুছে ফেলে দেয়া হয়। প্রতি মাসের শেষ সাপ্তাহে উক্ত পলিথিন ফ্যাক্টরীতে মাসে বিদ্যুৎ বিল ১৮/১৯ লাখ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু দূনীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দুই লাখ টাকার মত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হয়।

১৮ নং বাকলিয়া ওয়ার্ডের আবু সওদাগর কলোনী চেয়ারম্যান ঘাটার মৃত আব্দুর রাজ্জাক এর পুত্র মো. আমীর আলী বলেন, এই কারখানার মালিক চট্টগ্রাম বিভাগের দক্ষিণ এলাকায় একটি থানাতে কর্মরত। তিনি পুলিশ বিভাগে চাকুরী করেন বলে এসব কাজ নির্বিঘ্নে করে যাচ্ছেন।তার কাছ থেকে প্রতিমাসে গোয়েন্দা পুলিশ ও বাকলিয়া থানা পুলিশের স্ব-ঘোষিত ক্যাশিয়ার মোটা অংকের মাসোয়ারা নিচ্ছে। একই সাথে পরিবেশ অধিদপ্তরের জনৈক কর্মকতার স্ত্রী ও মাসোয়ারা পাচ্ছে। ফলে এই অবৈধ কারখানায় তারা অভিযান চালাচ্ছেনা।

তিনি বলেন, এই কারখানা দিয়ে তিনি টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন, জমিজমা, ফ্ল্যাট বাড়ি সব কিছুই এই অবৈধ কারখানার ইনকাম।
সরেজমিনে মুরাদপুর, বায়েজিদ বোস্তামী ও বাকলিয়া এলাকায় আরো কয়েকটি কারখানায় পলিথিন উৎপাদন হতে দেখা গেছে।

এব্যাপারে দারোগা আয়ুবের ০১৮১৬০৫২২৬৫ নং মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলে এ প্রতিবেদকের ফোন সে রিসিভ করেনি।

এসব এলাকায় স্থানীয়রা জানান, প্লাষ্টিক পোড়ার গন্ধে তারা অতিষ্ট হয়ে উিেঠছেন। কারখানার ভেতর ও বাইরে প্লাস্টিক পোড়া গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। এর মধ্যেই কাজ করছেন শ্রমিকেরা। কোনো কারখানাতেই প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা সংবলিত সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। কারখানা পরিচালনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের যে ছাড়পত্র, তা-ও দেখাতে পারেননি মালিকেরা।
বাকলিয়ার বাসিন্দা জহির উদ্দিন বলেন, ১০ বছর আগেও এই এলাকায় প্লাষ্টিক ও পলিথিনের কোনো কারখানা ছিল না। ময়লা-আবর্জনা ফেলে নদীর ওই জায়গাটি ভরাট করা হয়েছে। পরে ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন কারখানা গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, অব্যবহৃত পলিথিনগুলো দিনে নদীতে ফেলা হয়। রাতে তা পোড়ানো হয়। এতে পুরো মহল্লায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কারখানার মালিকেরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না। সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, বাতাসে প্লাস্টিক ও পলিথিন পোড়ার গন্ধের কারণে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মাথা ভার হয়ে যায়। তাই অধিকাংশ সময় কারখানার দিকের দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হয়।
এদিকে চলতি মাসে পলিথিনের জন্য তিনটি অভিযান পরিচালিত হয়। মহানগরীর চাক্তাই রাজাখালী রোড এলাকার ৩৩৬ ভাগাপোল মোড়ের একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে শফিউল আজমের গোডাউন থেকে প্রায় আড়াই টন নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন শপিং ব্যাগ জব্দ করা হয়। এসময় ওই প্রতিষ্ঠানকে চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ে হাজিরের নোটিশ প্রদান করা হয়।  গত ৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মিয়া মাহমুদুল হকের নেতৃত্বে এ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।  পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বেগম শাহরীন ফেরদৌসী বলেন, ৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় নগরের চাক্তাই রাজাখালী রোড এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন জব্দের অভিযান চালানো হয়। এসময় ভাগাপোল মোড়ে অবস্থিত একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় অভিযান চালিয়ে শফিউল আজমের গোডাইন থেকে প্রায় আড়াই টন নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন শপিং ব্যাগ জব্দ করা হয়েছে।
অন্যদিকে নগরের চকবাজার এলাকার কাঁচা বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে হাসান স্টোর নামক প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। অভিযানে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৫০ কেজি নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন শপিং ব্যাগ জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়াও আরো ৫টি প্রতিষ্ঠানকে সর্তক করা হয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় এ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। মহানগর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক বলেন, ৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় নগরের চকবাজার এলাকার কাঁচা বাজারে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালানো হয়। এ সময় হাসান স্টোর নামক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৫০ কেজি নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন শপিং ব্যাগ জব্দ করা হয় এবং এ প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তার পাশাপাশি আরও ৫টি প্রতিষ্ঠানকেও সর্তক করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এছাড়া নগরীর বাকলিয়া থানার কালামিয়া বাজার এলাকায় নজির প্রিন্টিংকে নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরির অভিযোগে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদফতর। গত ৩ সেপ্টেম্বর শুনানি শেষে এ জরিমানার আদেশ দেন পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিক।
পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম মহানগরের সহকারী পরিচালক সংযুক্তা দাশ গুপ্তা বলেন, ২ সেপ্টেম্বর সকালে বাকলিয়া থানার কালামিয়া বাজার এলাকায় নজির প্রিন্টিং নামে এক প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ দুই টন পলিথিন জব্দ করে পরিবেশ অধিদফতরের একটি টিম। এ ৩ সেপ্টেম্বর শুনানিতে ডাকা হয় তাদের। শুনানি শেষে নজির প্রিন্টিংকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জানা গেছে, কেনাকাটা সেরে বাড়ি ফিরতি মানুষের হাতে হাতে দেখা যায় পলিব্যাগ। রাজধানী কিংবা গ্রামের মধ্যে কোনো তফাত নেই, সব জায়গায় ক্রেতারা বাজার করতে যায় খালি হাতে। কিছু চেইন শপ আর হাতে গোনা দু-একটি প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে বাকি সব দোকানেই থাকে পলিব্যাগ। সব পণ্য সেই ব্যাগে ভরে ধরিয়ে দেওয়া হয় ক্রেতার হাতে। ক্রেতাও অবলীলায় তা নিয়ে বাড়ি এসে পরে ফেলে দেয় ডাস্টবিনে। সেখান থেকে পলিথিন ছড়িয়ে পড়ে সর্বনাশ করে পরিবেশের। ক্রেতা বা বিক্রেতা, কারো মধ্যেই পলিথিনের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা নেই। তাদের সচেতন করতে কোনো উদ্যোগও নেই। আইন থাকলেও নেই প্রয়োগ। বাজারে পাটের ব্যাগ পাওয়া যায়, তবে দাম বেশি বলে সেগুলো কেনা বা ব্যবহারের তাগিদ নেই ক্রেতাদের।
ব্যবসায়ীরা জানান, পাতলা (নিষিদ্ধ) পলিথিন তৈরির মেশিনের দাম খুব বেশি না। পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকায় ভারতীয় ও চায়না মেশিন কেনা যায়। মেশিন স্থাপনের জন্য জায়গাও বেশি লাগে না। ছোট ঘরের মধ্যে এ মেশিন বসিয়ে দানাদার পলি ইথিলিন থেকে পাতলা পলিথিন তৈরি করা হয়। বিভিন্ন কারখানায় মোটা পলিথিন উৎপাদনের পাশাপাশি পলিথিনের শপিং ব্যাগও তৈরি হচ্ছে।