banner

শেষ আপডেট ১৫ নভেম্বর ২০১৯,  ২০:৫০  ||   শুক্রবার, ১৫ই নভেম্বর ২০১৯ ইং, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনি নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে

‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনি নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে

২৬ জুলাই ২০১৯ | ১৩:২০ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনি নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে

ছেলেধরা-মাথাকাটা গুজবকে কেন্দ্র করে দেশের আনাচে কানাচে যেভাবে গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে, তা কেবল পাশবিকই নয়, চরম নৈরাজ্যকরও। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার পরিণাম কতই ভয়ঙ্কর হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। সংবামমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী গত দু’সপ্তাহ ধরে চলা এ গুজবের শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। তাদের অধিকাংশই মানসিক প্রতিবন্ধী, ভবঘুরেসহ নারীরা। গুজব আতংকে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের চলাচলের ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো। যার কারণে স্কুল-মাদরাসায় উপস্থিতির হারও গেছে কমে। যদিও এসব গুজবের কোনো ভিত্তি নেই। জনবিরোধী একটি চক্র এমন গুজব ছড়িয়েছে এবং ছড়াচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের একটি অংশ তাতে বিশ্বাস স্থাপন করছে বলেই দেশে নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে কুউদ্দেশ্য হাসিল করছে অশুভ চক্র। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতার আতংকে ভুগছেন দেশবাসী। এই চিত্র উদ্বেগকর।
দৈনিক পূর্বকোণে গতকাল প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, সোমবার বাঁশখালী উপজেলায় দুটি স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে ৪ যুবককে গণপিটুনি দিয়েছে জনতা। খবর পেয়ে পুলিশ আহত এই ৪ যুবককে উদ্ধার করে বাঁশখালী হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। পুলিশ যথাসময়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত না হলে হয়তো গণপিটুনিতে ৪ যুবকেরই মৃত্যু হতো। একইদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, রাজশাহী ও নীলফামারিতে ১৫জন গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। এভাবে প্রতিদিনই সারাদেশে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হচ্ছেন অসহায় লোকজন। অনেকে মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়ছেন। উল্লেখ্য, দিনকয়েক আগে ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’- এমন গোয়েবলসীয় গুজব ছড়ায় আড়ালে থাকা একটি দেশবিরোধী অশুভচক্র। ভাইরাসের মতো এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। এই গুজবকে লুফে নেন অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধবিশ^াসীরা। সুযোগের সদ্ব্যবহারে উদ্দেশ্য সাধনে নেমে পড়ে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোও। ফলে গুজবে বিশ্বাসী উত্তেজিত ও আতঙ্কিত মানুষের গণপিটুনিতে গত ৯ জুলাই থেকে প্রায় প্রতিদিনই অসহায় মানুষজন আহত-নিহত হচ্ছেন। ছেলেধরা সন্দেহের বশে হিং¯্রতার শিকার হয়ে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন। প্রাণে বাঁচলেও আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০০ জন। এ অবস্থায় সারাদেশে বিরাজ করছে ভীতির পরিবেশ। তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক।
উল্লেখ্য, আগেও দেশে গুজব ছড়িয়ে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ‘চাঁদে দেখা গেছে’ বলে গুজব ছড়িয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছিল। ‘নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন’ চলার সময়ও বিভিন্ন গুজব ছড়ানো হয়েছিল। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ছয় ছাত্রকে। এভাবে স্বার্থান্বেষী মহল একেক সময় একেক রূপে গুজব ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টির মাধ্যমে ফায়দা লুঠছে। আর বলি হচ্ছেন সাধারণ অসহায় মানুষজন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে সারাদেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৯ জন। আর চলতি বছর চলমান গুজবে গণপিটুনিতে নিহত ১০জন ছাড়াও গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসেই নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। এটি কোনো সুস্থ সমাজব্যবস্থার লক্ষণ নয়। আইনকানুন ও বিচারব্যবস্থার উপস্থিতি সম্পন্ন সভ্যসমাজে কোনো অবস্থাতেই গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা চলতে পারে না।
আমরা মনে করি, একটি গোষ্ঠী অসৎ উদ্দেশ্যে দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে বানচালের লক্ষ্যে এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনিতে উসকানি দিচ্ছে। এসব ঘটনার তদন্ত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত। বিচারের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। সমাজে নৈতিকতার মানদ- উচ্চমুখী করতেও নিতে হবে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ। গুজব শুনে কেউ যাতে আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে পারে সে জন্যে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে ব্যাপক তৎপর হওয়া উচিত। গুজবের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে বলিষ্ঠ কর্মসূচি থাকাও জরুরি। জনগণকে বুঝাতে হবে, এসব গুজবের কোনো ভিত্তি নেই। তাছাড়া গুজবে বিশ^াসী হয়ে অপরাধী সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যা করে আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার কারো নেই। এটি চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কাউকে অপরাধী মনে হলে তাকে ধরে পুলিশে দেয়া যেতে পারে। ৯৯৯ এ কল করে দ্রুত পুলিশের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। সরকারের পাশাপাশি এ ব্যাপারে মসজিদের ইমামসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।