banner

শেষ আপডেট ২৬ জুন ২০১৯,  ১১:৫৭  ||   বুধবার, ২৬ই জুন ২০১৯ ইং, ১২ আষাঢ় ১৪২৬

প্রশাসনের আশ্বাসে ৩৮ জেলে পল্লীর অবরোধ স্থগিত : অচল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

প্রশাসনের আশ্বাসে ৩৮ জেলে পল্লীর অবরোধ স্থগিত : অচল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

৯ জুন ২০১৯ | ২০:০৪ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রশাসনের আশ্বাসে ৩৮ জেলে পল্লীর অবরোধ স্থগিত : অচল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

ক্রাইম প্রতিবেদকঃ  প্রশাসনের আশ্বাসে অবশেষে অবরোধ স্থগিত করেছেন জেলেরা। আজ রোববার প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরোধের পর ৩৮ পল্লীর জেলেরা দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ খ্যাত ব্যস্ততম এই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে অবরোধ তুলে নিয়েছে। পূর্ব ঘোষিত আল্টিমেটাম অনুযায়ী চট্টগ্রাম নগরী থেকে সীতাকুন্ড উপজেলা পর্যন্ত ৩৮টি জেলে পল্লীর বাসিন্দারা রাস্তার একপাশে জড়ো হন। পরে পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে সাড়ে ১০টার দিকে তারা রাস্তার দুপাশেই অবস্থান নেন। সকাল ১০টা থেকে সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ঢাকা-এই মহাসড়ক অবরোধ করেন চট্টগ্রামের ৩৮ জেলে পল্লীর বাসিন্দারা। প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে নারী শিশুসহ রাস্তায় অবস্থান নেন প্রায় হাজারের ওপর জেলে। এ ঘটনায় প্রায় দেড় ঘন্টা বন্ধ থাকে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য দিদারুল আলম ও ইউএনও ঘটনাস্থলে এসে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলে আপাতত অবরোধ স্থগিত করেন জেলেরা।

আজ রোববার সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাসড়কে অবরোধ চলাকালীন সময়ে কয়েক হাজার জেলের হাতে ছিল ব্যানার-ফেস্টুন। লাল-সবুজ রংয়ের ছোট দু’টি নৌকা মহাসড়কে আড়াআড়িভাবে রেখে, শুয়ে-বসে তারা বন্ধ করে দেন যানবাহন চলাচল।

জেলেরা বলছেন, আমাদের জালে ইলিশ ধরা পড়ে না, তবে রাজা (সরকার) আমাদের কেন কষ্ট দিচ্ছে? সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থেকে শুরু করে কোলের শিশু নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে নারীরাও অংশ নেন এই অবরোধে।

প্রায় ৭৫ বছর বয়সী তরণী জলদাস নামে এক বৃদ্ধ বলেন, আমরা মাছ ধরে ভাত খাই। আমরা আর কিছুই জানি না। সরকার মাছ ধরা বন্ধ করে আমাদের পেটে লাথি দিয়েছে। আমাদের চাল দিয়ে নাকি সরকার সাহায্য করছে। আমরা চাল নেব কেন? আমরা গরীব হতে পারি, ভিখিরি নয়। প্রতিবাদ জানাতে মহাসড়কে এসেছিলেন সীতাকুন্ডের ভাটিয়ারি জেলেপল্লীর বাসিন্দা রামহরি সর্দার। প্রায় ৭০ বছর বয়সী রামহরি আগে মাছ ধরার পাশাপাশি বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঢোল-বাঁশি বাজাতেন। বয়স হয়ে যাওয়ায় এখন আর বাঁশিতে সুর তোলার মতো দম নেই তার। বাড়ির পাশে সাগরে ‘ভাসা জাল’ বসিয়ে ছোট চিংড়ি আর লইট্যা মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করেন।

রামহরি বলেন, আমরা চাল চাই না। আমাদের চাল লাগবে না। আমাদের মাছ ধরতে দিলেই হবে।

বার আউলিয়ার পাক্কা মসজিদ এলাকা থেকে আসা শুকলাল জলদাস বলেন, একবছর আগে যদি আমরা জানতাম যে, এবার মাছ ধরতে পারব না, তাহলে তো আমরা ঋণ নিয়ে নৌকা-জাল মেরামত করতাম না। এখন আমাদের ঋণের টাকা শোধ হবে কিভাবে? সরকার চাল দিচ্ছে। চালে কি পেট ভরে? তার চেয়ে আমাদের সবাইকে জেলখানায় নিয়ে যাক, সেখানে তো ফ্রিতে ভাত পাব।

বৃদ্ধা সরোজিনী জলদাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার পাঁচ ছেলে। নাতি-নাতনি, ছেলের বৌ মিলিয়ে একবেলায় আমাদের ১৫ জন খাওয়ার লোক। গত ১৫ দিন ধরে ছেলেরা সাগরে যেতে পারছে না। আমাদের দিন আর চলছে না। আমরা তো ইলিশ মাছ ধরি না। আমাদের জালে ইলিশ ধরা পড়ে না, তবে রাজা (সরকার) আমাদের কেন কষ্ট দিচ্ছে?’
ঘটনাস্থলে গিয়ে আরো দেখা যায়, জেলের সম্প্রদায়ের লোকজন প্রথমে যখন মহাসড়কে আসার চেষ্টা করছিলেন, তখন সীতাকুন্ড সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একদল পুলিশ তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশকে এসময় তাদের উপর চড়াও হতে দেখা যায়। তবে একসময় পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে জেলেরা মহাসড়কে অবস্থান নেন।
অবরোধ চলাকালীন বাইপাসের মুখে ফৌজদারহাট পুলিশ বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে ‘উত্তর চট্টলা উপকূলীয় মৎস্যজীবী জলদাস সমবায় কল্যাণ ফেডারেশন’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে সমাবেশ শুরু হয়।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত, সীতাকুন্ড থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দিদারুল আলম, চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) জাহাঙ্গীর আলম, সীতাকুন্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিল্টন রায়, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্যামল কুমার পালিত এসময় সমাবেশস্থলে একে একে উপস্থিত হন।
সমাবেশে সংগঠনের সভাপতি লিটন জলদাস বলেন, সরকার ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ ঘোষণা করেছে। সাতবছর ধরে সরকারিভাবে প্রতিবছর মাছ ধরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ থাকে। এতদিন এই নিষেধাজ্ঞা ছিল শুধু বাণিজ্যিক ট্রলারের জন্য। ছোট নৌকায় যারা মাছ ধরেন, তারা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন না। বর্তশানে আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের ফলে ৩৮টি জেলে পল্লীর বাসিন্দারা মানবেতর জীবনযাপন করছে।
অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, আজকের মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিলে পরশু মঙ্গলবার আমরা একই জায়গায় আবার গণ অনশনে বসব।

তিনি বলেন, চাল দিলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? চালে কি সবার জন্য ভাত হয়? জেলে সম্প্রদায়ের লোকের গরীব, কিন্তু তারা তো ভিক্ষা করে না। তাহলে সরকার চাল দিচ্ছে কেন? আমরা মানুষ হয়ে মানুষের কাছে মানুষের মর্যাদা চাই।

সংসদ সদস্য দিদারুল আলম জেলে সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলেন, আমরা আপনাদের দাবির সঙ্গে একমত। এ বিষয়ে আমি মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। জেলা প্রশাসকের অফিসে গিয়ে বৈঠক করে একটা সমাধানে আসার চেষ্টা করব।

জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে সমাবেশে যাবার কথা জানিয়ে ইউএনও মিল্টন রায় বলেন, জেলা প্রশাসক মহোদয় বলেছেন, ঊর্দ্ধতন পর্যায়ে কথা বলে তিনি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অবরোধের কারণে যানবাহন, যাত্রী, পণ্য আটকে আছে। রাস্তায় মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অবশ্যই আপনাদের দাবির স্থায়ী সমাধান দরকার। সরকার নিশ্চয় এর সমাধান করবে।

পূজা উদযাপন পরিষদের নেতা শ্যামল কুমার পালিত বলেন, অতীতেও সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু আমাদের প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর হস্তক্ষেপে পতেঙ্গা থেকে সীতাকুন্ড পর্যন্ত জেলেরা এর আওতায় ছিল না। কারণ তারা মাছ ধরে বাড়ির কাছে, গভীর সাগরে তারা যায় না। তারা মাছ ধরে ছোট নৌকায়। কিন্তু মৎস্য প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান এবার নতুন নিয়ম চালু করেছেন। তিনি বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা না করে আমলাতান্ত্রিক মনোভাব থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই সমস্যার সৃষ্টি করেছেন। এরপর সমাবেশ থেকে অবরোধ স্থগিতের ঘোষণা আসে। দুপুর ১২টার দিকে মহাসড়ক ছেড়ে যান অবরোধকারী জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন।
জানা গেছে, প্রতিবছর ২৩ মে থেকে ২৩ জুলাই মোট ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরার সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকে। অন্যান্য বছর এই সময়টায় ছোট কাঠের নৌকার জেলেরা মাছ ধরতে পারত। কিন্তু এ বছর এসব ছোট ছোট নৌকার ক্ষেত্রেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ফলে, দীর্ঘ দুই মাস জীবনজীবিকার ওপর চরম প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে। এর প্রতিবাদে, গত ১ জুন সাগরে মাছ ধরার সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে উত্তর চট্টলা উপকূলীয় মৎস্যজীবী জলদাস সমবায় কল্যাণ ফেডারেশন এক সংবাদ সম্মেলন করে।

সেখানে ফেডারেশনের সভাপতি লিটন জলদাস আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, ৭ দিনের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান না হলে ৯ জুন থেকে মহাসড়ক অবরোধ করা হবে। তারই অংশ হিসেবে গতকাল রোববার রাস্তায় অবস্থান নিয়েছেন জেলেরা।
জানতে চাইলে সীতাকুন্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেলোয়ার হোসেন বলেন, দেড় ঘণ্টা অবরোধের কারণে উভয়পাশে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। অবরোধ প্রত্যাহারের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আরও প্রায় আধাঘণ্টা সময় লেগেছে। সবমিলিয়ে মহাসড়কে দুই ঘণ্টা যানজট ছিল।