banner

শেষ আপডেট ২৬ জুন ২০১৯,  ১১:৫৭  ||   বুধবার, ২৬ই জুন ২০১৯ ইং, ১২ আষাঢ় ১৪২৬

চট্টগ্রাম কারাগারে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী হত্যার ৫ কারন!

চট্টগ্রাম কারাগারে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী হত্যার ৫ কারন!

৫ জুন ২০১৯ | ১৯:৪১ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • চট্টগ্রাম কারাগারে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী হত্যার ৫ কারন!

ক্রাইম প্রতিবেদকঃ  চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী হত্যাকাণ্ডে এ পর্যন্ত পাঁচটি কারণ উঠে এসেছে, যার সবগুলোই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক ।

তিনি বলেন, ‘আমরা শনিবার বিকেল তিনটায় কারাভ্যন্তরে প্রবেশ করে বিভিন্ন এঙ্গেলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। যাচাই বাছাই করে দেখছি।’

রিপন যা বললো : অমিত হত্যাকাণ্ড তদন্তে বেলা ১২টার দিকে ডিআইজি প্রিজন ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি টিম কারাভ্যন্তরে প্রবেশ করে। বিকেল চারটা পর্যন্ত তাঁরা সেখানেই অবস্থান করেন। পরে মোবাইল ফোনে ডিআইজি প্রিজন জানান, আসামি রিপন নাথের সাথে তাঁদের কথা হয়েছে। সে শুধু বলেছে, অমিতের সাথে তার সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছিল।

এসময় ‘মাথা গরম’ হওয়ায় সে ইট দিয়ে তাকে আঘাত করে। তবে ঘটনার পরপরই সিএমপি দক্ষিণ জোনের উপ কমিশনার মেহেদী হাসান কারাভ্যন্তর থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন অমিত ও রিপনের সাথে একই কক্ষে থাকা বন্দী বেলাল তাঁকে জানিয়েছেন, তারা তিনজনই ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ জেগে উঠে দেখেন অমিতকে কম্বল চাপা দিয়ে ইট দিয়ে আঘাত করছে রিপন। তদন্ত টিম সেই রক্ত মাখা কম্বলটি পাননি। একই সাথে পাননি রক্ত মাখা ইটের টুকরোও।

হত্যাকাণ্ডে উঠে আসা কারণসমূহ : অমিত জেলে যাওয়ার পর থেকেই সন্দেহ করে যে, তার রাজনৈতিক গুরু যুবলীগ নেতা হেলাল উদ্দিন চৌধুরী বাবরের ঘনিষ্ট একজন তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।

অমিত গ্রেপ্তারের পর বাবর নিজেই জানিয়েছিলেন, ‘একজন ইয়াবাসক্ত কখনো আমার অনুসারী হতে পারে না। আর সে যে কাণ্ড ঘটিয়েছে, তা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তাই আমি পুলিশকে সাহায্য করেছি। আপনি পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে দেখতে পারেন।’

এই সংবাদটি কারাগারে অমিতের কানেও পৌঁছায়। ২০১৬ সালে ছাত্রলীগের এক নেতা জেলে গেলে তাঁকেও অমিত কথাটা জানিয়েছিল, বের হতে পারলে এর একটা ব্যবস্থা করবে। তখন ঐ ছাত্রলীগ নেতা তাঁকে বুঝানোর চেষ্টা করেছিলেন।

অমিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে দ্বিতীয় কারণ হিসেবে কারাভ্যন্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, কারাগারে ইয়াবার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে অমিতের সাথে দুই বার হাতাহাতি হয় শিবিরের নাছির ও শ্রীকান্ত রক্ষিত হত্যা মামলার আসামী ভোলার সাথে। এরাও তাই ক্ষিপ্ত ছিল অমিতের উপর।

তৃতীয় কারণ হলো নগর ছাত্রলীগের একটি পক্ষ দাবি করছে, রিয়াজউদ্দিন বাজারে সিটি কলেজের ছাত্রলীগ নেতা ইয়াছিন হত্যাকাণ্ডে নির্দেশ দাতা ছিল অমিত। সে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দিতে তার গ্রুপের আরো তিন সহযোগী আবির, অনিক ও শমীর নাম বলেছিল। এ নিয়ে কারাগারে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়।

জানা গেছে, এদের আড্ডাস্থল দেওয়ানবাজার। অমিতের খুনি রিপনও দেওয়ানবাজার আড্ডা দিত। আলোচ্য তিনজন এক সময় অমিতের সাথে একই গ্রুপ করলেও পরে অন্য গ্রুপে চলে যায়। বলা হচ্ছে এ তিনজন রিপন নাথকে দিয়ে ঘটনা ঘটাতে পারে।

চতুর্থ কারণ হিসেবে জানা গেছে, অমিত কারাগারে চরমভাবে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছিল। গত কিছুদিন ধরে তাই সে প্রচণ্ড অর্থকষ্টে ভুগছিল। বিভিন্নজন তার থেকে টাকা পেত। এই টাকা ধার নেওয়া এবং ফেরত না দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।

পঞ্চম কারণ হিসেবে জানা গেছে রিপনকে ঘটনার দিন বিকেলে অমিতের সেলে স্থানান্তর করা হয়। যা কিছুতেই মানতে চায়নি অমিত। রিপনকে নানা কটূ ভাষায় গালাগাল করতে থাকে। এই গালাগালকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে হাতাহাতি এবং অমিতের নির্মম মৃত্যু হতে পারে।

অমিতের ভাইয়ের ভিডিও বার্তা ভাইরাল : এরই মধ্যে ফেসবুকে অমিতের ছোট ভাই অনিক মুহুরীর একটি ভিডিও বার্তা ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তিনি সরাসরি অমিতের এক সময়কার রাজনৈতিক এক বড়ো ভাইকে নাম উল্লেখ না করেই দোষারোপ করেছেন। নাম উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে যেকেউ ধারণা করতে পারবে অনিক কোন নেতাকে দোষারোপ করছেন।

সেই ভিডিও বার্তায় সম্পূর্ণ পরিকল্পিত এবং কারাগারের বাইরের কারো নির্দেশে তার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন কলকাতায় বসবাসরত অনিক মুহুরী। গত ৩১ মে অমিতের স্ত্রী নিধি দত্ত মুহুরীর ফেসবুক পেইজে লাইভে এসে তিনি এ কথা বলেন।

এসময় অনিককে বিধ্বস্ত ও বিক্ষুব্ধ দেখাচ্ছিল। ইতোপূর্বে অমিতের পিতা অরুণ মুহুরীও তাঁর সন্তানের হত্যার পরিকল্পনা কারাগারের বাইরে থেকে হয়েছে এবং অমিতেরই রাজনৈতিক এক বড়ো ভাইয়ের নির্দেশে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।

১১ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে অনিক মুহুরী বলেন, ‘অমিত মুহুরী মারা গেছে। রিপন নাথ অমিত মুহুরীকে মারলো! আচ্ছা! রিপন নাথের চেহারা দেখে বোঝা যায়? অমিত মুহুরীকে মারার ক্ষমতা রিপন নাথের আছে?’ তিনি আরও বলেন, ‘দেখছি আমার ভাইকে শেভ করা অবস্থায় মেরেছে। আমার ভাই অর্ধেক শেভ জীবনে করেনি।

আমার ভাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। আপনারা কখনও শুনেছেন? জেলের মধ্যে মেরে ফেলতে?’ লাইভ ভিডিওতে তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা বলবেন, যে যেরকম করেছে; সে রকম শাস্তি পাবে। হ্যাঁ, আমার ভাই তো শাস্তি পাচ্ছিল দুই বছর ধরে জেলের মধ্যে। সবগুলো সাজানো নাটক। ও তো ভুলটা বুঝতে পেরেছিল। ওকে কেন মারা হলো? আপনারা কি ভেতরের ঘটনা জানেন?’

অনিক মুহুরী লাইভ ভিডিওতে বলেন, ‘ছেলেকে মরা অবস্থায় আমার বাবাকে দিচ্ছে। মারলে গুলি করে মার। এভাবে কেউ মারে? যে এভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, তার বিচার করুন। যে মেরেছে, তাকে ঘর থেকে বের করে মারুন। সে অন্যায় করেছে ; তাকে শাস্তি দিন।’

১১ জুন অমিত জামিনে মুক্ত হতো: ভিডিওতে অনিক মুহুরী দাবি করেন জুন মাসের ১১ তারিখ অমিত মুহুরী জামিনে ছাড়া পেতেন। সে খবর উপর লেভেলে গেছে। তাই এর আগেই অমিতকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। আমার বাবা আমাদেরকেও বলেনি যাতে কারও কানে চলে যাবে। ১১ তারিখ বের করে ইন্ডিয়া নিয়ে আসতো। কিন্তু কী অপরাধ করলো আমার দাদা?

তিনি বলেন, একটা জেলের মধ্যে এভাবে হত্যা কী করে করে? বাইরে ক্রসফায়ারে যদি মেরে ফেলতো; তাহলে মনকে বোঝাতে পারতাম। আমার দাদার সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই রিপন নাথের। ওই ছেলে নাকি আমার দাদাকে মেরে ফেলেছে? প্রশাসন কী করছিল তখন? রাতের ১টার সময় নাকি আমরা দাদা শেভ করছে! রাত ১টার সময় কেউ শেভ করতে যায়? রাত ১টার সময় কখনো জেলে শেভ করায়? জেলের মধ্যে শেভ করার টাইম দুপুর দুটোয়। তার মানে দুপুর দুটোর সময় আমার দাদাকে মেরেছে।’

কারাগারের বাইরে থেকে খুনের পরিকল্পনা! : কারাগারের বাইরে থেকে অমিতকে খুনের পরিকল্পনা হয়েছিল দাবি করে অনিক মুহুরী বলেন, ‘ছয়-সাতজন মিলে পুরো প্ল্যানিং করে আমার দাদাকে মারা হয়েছে। আর যে প্ল্যানিং করেছে, ঘরের মধ্যে বসে বসে, দাঁড়া, ঘরের মধ্যে বসে প্ল্যানিং করে আমার দাদাকে মেরে ফেলবি। নাটক করো? নাটকের দিন শেষ। তুই যেখানে বসে প্ল্যানিং করলি, সেখানে মারা হবে তোকে। অমিতের ছোট ভাইয়েরা আছে। অমিতের ছোট ভাইরা অমিতকে ভালোবাসে। যে ঘরের মধ্যে বসে প্ল্যান করে কোটি টাকা খরচ করে আমার দাদাকে মারিয়েছে, তার বিচার চাই।’

এক পর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আসছি, বাংলাদেশ আমি আসছি। আমি আসছি। আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার যদি কেউ না করে, প্রশাসন থেকে যদি বিচার না পাই, আমি করবো বিচার। দেখবো কে কার বাপ।’