banner

শেষ আপডেট ২৬ জুন ২০১৯,  ১১:৫৭  ||   বুধবার, ২৬ই জুন ২০১৯ ইং, ১২ আষাঢ় ১৪২৬

পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দেখিয়ে ১২ লাখ টাকা আত্মসাৎ!

পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দেখিয়ে ১২ লাখ টাকা আত্মসাৎ!

২৫ মে ২০১৯ | ১৯:৫৫ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দেখিয়ে ১২ লাখ টাকা আত্মসাৎ!

বশির আলমামুন : অবশেষে দুদকের জালে ফেঁসে যাচ্ছেন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহবাজ ও হাসপাতালের পরিসংখ্যানবিদ নানা অপকর্মের হোতা আমির হামজা। ভূক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ২২মে সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত টানা ৪ ঘন্টা চকরিয়া হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, অসংগতি ও দুর্ণীতির প্রাথমিক তথ্য প্রামান পেয়েছেন দূর্র্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ সময় তদন্তকালে হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম খুঁজে পান দুদকের কর্মকর্তারা। দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদকের) চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন ও জাফর সাদেক শিবলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম এ অভিযান চালায়। এ অভিযানের প্রেক্ষিতে দুদক কমিশনার ঢাকা এর অনুমতি সাপেক্ষে হাসপাতালের পরিসংখ্যানবিদ আমির হামজার বিরুদ্ধে আরো তদন্ত পূর্বক মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দুদকের কর্মকর্তারা
জানাগেছে, চকরিয়া উপজেলার খুঠাখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা আমির হামজা ২০০৬ সালে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে চাকুরীতে যোগদান করেন। এরপর থেকে একনাগাড়ে ১৪ বছর ধরে এ হাসপাতালে চাকুরি করছেন। তিনি পরিসংখ্যানবিদ হলেও হাসপাতালে হিসাররক্ষক থাকার পরও তাকে দালিত্ব না দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একচ্ছত্রভাবে হিসাবরক্ষক ও ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দায়িত্ব পালনকালে, বিগত ১০ বছর ধরে হাসপাতালের বিকল জেনারেটরটি ২০১৬ সাল পর্যন্ত সচল দেখিয়ে তেল ক্রয় বাবদ প্রচুর টাকা লুটপাট করা হয়েছে। কোনো ধরণের লগ বুক তৈরি না করে প্রতি বছর ২০ হাজার টাকা করে দুই বছরে ৪০ হাজার টাকা জেনারেটরের তেল খরচ দেখিয়ে আত্মসাৎ করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এছাড়া পরিসংখ্যানবিদ আমির হামজা ও সিনিয়র স্টাফ নার্স লাকী ঘোষ বাসা ভাড়া কম দিতে হাসপাতালের কর্মচারীদের ডরমেটরি এমএলএসএসদের নামে বরাদ্ধ দেখিয়ে সেই সরকারি বাসা তারা ব্যবহার করছেন।
তাছাড়া হাসপাতালের আশপাশ পরিস্কার করার নাম দিয়ে নামে-বেনামে মাস্টার রোল কর্মচারী নিয়োগ দেখিয়ে ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ও ১ জুলাই ২০১৮ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ লাখ টাকাসহ সর্বমোট ১১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের নির্মাণাধীন ভবন এলাকার বিভিন্ন প্রজাতির গাছ টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করা হলেও পরবর্তীতে বিধি বহির্ভূতভাবে হাসপাতাল এলাকার সবগাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে। ফলে হাসপাতাল এলাকার পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২ জন চিকিৎসক কর্মরত থাকলেও নিয়মিত উপস্থিত থাকেন মাত্র ২/৩জন চিকিৎসক।
এ ব্যাপারে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন বলেন, গত ২১ মে রাতে দুদকের অভিযোগ সেন্টার ১০৬ নাম্বারে ভুক্তভোগী এক ব্যক্তির অভিযোগ করেন। এ প্রেক্ষিতে ২ মে দুদক চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মো. আব্দুুল করিমের অনুমতিক্রমে বুধবার সকালে চকরিয়া উপজেলা হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যে সব অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে এসময় তদন্তে আর্থিকসহ সব অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। অনিয়মের সব কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে। এসব কাগজপত্র পর্যালোচনা করে পরবর্তীতে আইনী পদক্ষেপ নেওয়া হবে । তিনি আরো বলেন অধিকতর তদন্তের জন্য দুদক ঢাকা অফিসের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। যদি অভিযোগ সত্যি প্রমানিত হয় তা হলে পরবর্তীতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি সেওয়া হবে।
দূর্নীতি দমন কমশিন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মো. আব্দুল করিম বলেন চকরিয়া হাসপাতালের আর্থিক সহ নান অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত কমিটি প্রাথমিক তদন্ত করে আমির হামজার বিরুদ্ধে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাসহ নানা খাতে ভুয়া-বিল ভাউচার দেখিয়ে প্রায় ১২ লক্ষ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে এসব বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর নির্দেশনা মোতাবেক পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’ এমনকি ভূয়া বিল ভাউচারে সহযোগিতাদানকারী চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শাহবাজ এর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
এদিকে ওইদিন দুদক কর্মকর্তারা টানা ৪ ঘন্টা ধরে হাসপাতালে অভিযান চালালেও ওই সময়ে কোনো মাস্টার রোল কর্মচারীকে দুদক কর্মকর্তাদের সামনে উপস্থিত করতে পারেননি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া নানা কারণ দেখিয়ে বুধবার মাত্র দুইজন চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন। এতে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এ ব্যাপারে দুদক কর্মকর্তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তদন্তদল ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, আমির হামজা পরিসংখ্যানবিদ হলেও তিনি একাই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন ক্যাশিয়ারসহ তিন-চারটি পদের। এছাড়া দীর্ঘ একযুগেরও বেশি সময় আমির হামজা এই হাসপাতালে চাকরি করার সুবাদে তার শক্ত অবস্থান রয়েছে। মুলত তার দাপটের কাছে অনেকটা অসহায় হাসপাতালের বড় কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ছোট কর্মচারী এবং নার্সও।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শাহবাজ বলেন, ‘দুদক দল আসলে কি জানতে এসেছিলেন তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। দাপ্তরিক কাজে আমি চট্টগ্রামে অবস্থান করায় তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ করতে পারিনি। তবে তাদেরকে সহায়তা করতে অধঃস্তন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি।’
হাসপাতালের পরিসংখ্যানবিদ আমির হামজা বলেন, ‘ কোন ধরনের ভুয়া-বিল ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় তিনি জড়িত নন।’