banner

শেষ আপডেট ১৮ মে ২০১৯,  ২২:৩৮  ||   রবিবার, ১৯ই মে ২০১৯ ইং, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

পানি সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই

পানি সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই

১৪ মে ২০১৯ | ২০:৫৩ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • পানি সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই

ক্রাইম প্রতিবেদকঃ সকলের জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এসডিজি ইয়ুথ ফোরাম’র উদ্যোগে চট্টগ্রাম ওয়াসা’র কনফারেন্স হলে আজ মঙ্গলবার এসডিজি (৬) নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অগ্রগতি, সমস্যা ও করণীয় বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

এসডিজি ইয়ুথ ফোরাম’র সভাপতি নোমান উল্লাহ বাহার’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক ও গবেষক এস.এম আরাফাত।

অধ্যাপক শামসুদ্দিন শিশির’র সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, এসডিজি ইয়ুথ ফোরাম’র সহ-সভাপতি ফরিদ আলম ও চট্টগ্রাম ওয়াসা’র সচিব ড. পিযূষ দত্ত।

প্যানেল আলোচক ছিলেন, চট্টগ্রাম ওয়াসা’র এমডি প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম’র সিভিল সার্জন ডা: আজিজুর রহমান ছিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া, ।

মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী, কারিতাস, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক জেমস গোমেজ, উপকূলীয় উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ ড. সানাউল্লাহ, ফুলকলি’র জিএম এমএ সবুর, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, চট্টগ্রাম অঞ্চলের যুগ্ম সম্পাদক শিমুল কান্তি মহাজন প্রমুখ।
এসডিজি (৬)’র আলোচনায় অন্যতম বিষয় ছিল চট্টগ্রাম’র স্যানিটেশন সিস্টেম।

মূল প্রবন্ধকার এসএম আরাফাত বলেন, স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসা’র চেষ্টার ইতিহাস বহু পুরনো। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামের প্রথম স্যানিটেশন মাস্টার প্লান তৈরি হয়। কিন্তু তা অর্থ সংকটের কারণে বাস্তবায়ন হয়নি। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে কোরিয়ান সরকারের অর্থায়নে স্যানিটেশন মাস্টার প্লান তৈরি করা হলেও অদৃশ্য কারণে আলোর মুখ দেখেনি। সর্বশেষ বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চট্টগ্রামের স্যানিটেশন মাস্টার প্লান তৈরি করার উদ্যোগ নেয়। ২০১৭ সালে সেই প্লান অনুমোদন পায়। এই প্লান ৬টি ধাপে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রথম ধাপের জন্য ৩০৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পায়। এখন প্রথম ধাপের প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান।
চট্টগ্রাম ওয়াসা’র এমডি একেএম ফজলুল্লাহ বলেন, পুরনো পাইপ লাইন যাদের বয়স ২০/৩০ বছর সেই পাইপ লাইনগুলোর কারণে আমাদের সক্ষমতা সত্ত্বেও পানি উচ্চ চাপে সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ৬০ পিএসআই’র বেশি চাপ দেওয়া হলে অনেক পাইপ লাইন ফেটে যায়। অথচ ওয়াসা একশত পিএসআই’র ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে।

তিনি আরো বলেন, জনসচেতনতা ছাড়া পরিষ্কার পানি সরবরাহ সম্ভব নয়। কারণ আমরা যদি আমাদের পানির ট্যাংকি নিয়মিত পরিষ্কার না করি তাহলে সেই পানি দূষিত হয়ে যায়।

রাজনীতিবিদ মফিজুর রহমান বলেন, সরকার এসডিজি বাস্তবায়নে অঙ্গিকারবদ্ধ।
অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, হালদা ও কর্ণফুলী নদী যদি কোন কারণে দূষিত হয়ে পড়ে, ওয়াসার কোন বিকল্প পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নেই। তাই আমাদের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখতে হবে।

সিভিল সার্জন ডা: আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, জনস্বাস্থ্যর ব্যাপারে আমাদের নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। যে সকল পাত্রে আমরা পানি সংগ্রহ করি সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদের দায়িত্ব।
বক্তারা বলেন, পানি মহামূল্যবান সম্পদ। পানি সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, সুনিপুন পরিকল্পনায় পরিশোধন, রক্ষণ, ব্যবহারে সক্ষমতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। পানির উৎপাদন বৃদ্ধি আবশ্যক। নদীময় বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট কারণে নদী, খালবিল, জলাশয়গুলোর মধ্যে অধিকাংশই মৃতপ্রায়। পানির উৎসসমূহ পরিচ্ছন্ন রাখা ও বাঁচিয়ে রাখা জরুরী। বাংলাদেশের বড় বড় শহরের আশেপাশে নদীগুলো শিল্প, পয়ো ও পৌর বর্জ্য দ্বারা অতিমাত্রায় দূষিত হয়ে পড়েছে। এই দূষণের প্রায় ৬০% শিল্পকারখানা থেকে নদীতে নির্গত হয়। চট্টগ্রাম’র কর্ণফুলী ও হালদা নদীর দূষণে উদ্ধেগ প্রকাশ করেন। দেশের সকল মানুষকে সুপেয় পানির আওতায় আনতে আর্সেনিক এবং উপকূলীয় ও পার্বত্য এলাকার পানি সরবরাহ সমস্যার সমাধানে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিতে হবে। জীববৈচিত্র্য, প্রকৃতি ও বন ধ্বংস হওয়ার ফলশ্রুতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় ছড়া ও ঝরনা শুকিয়ে গেছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম’র মানুষকে পানি সংকটে নিপতিত করেছে। ব্যবহৃত পানির রি-সাইকেল বা পুনরায় শোধনের পর পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করা প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার। প্লাস্টিক বোতলের পানির গুণগত মান নিয়ে গবেষণা করা দরকার।

বিশুদ্ধ পানির উৎস নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় সুরক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহন, বৃষ্টির পানি সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার, বিল্ডিং নির্মাণ নীতিমালায় প্রতিটি বিল্ডিংএ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণপূর্বক পানি পুনরায় ব্যবহারকল্পে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো, পানির অপচয় রোধ ও পানি ব্যবহারে সংযমী হওয়া, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহে পানি বিষয়ে পড়ানো ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে হবে। স্যানিটেশন বর্জ্যরে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা দরকার ।

উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগের হার প্রায় শূন্যের কোঠায় উপনীত করার এক বিরল দৃষ্ঠান্ত বাংলাদেশ সৃষ্টি করে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হলেও পয়োবর্জ্যের অপসারণ ও সম্পদে রূপান্তরের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারলে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি থেকেই যাবে। কিছু ক্ষেত্রে সুয়্যারেজের লাইনের সাথে পানির লাইন এক হয়ে দূষণ ছড়াচ্ছে। বস্তি ও প্রান্তিক বহু এলাকায় সুয়্যারেজ এর চরম ঘাটতি ও পানির অপ্রাপ্যতা সমস্যা বিদ্যমান। দেশের সকল জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে হবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি ৬) অর্জনের জন্য।

পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বিশেষত দূর্গম উপকূলীয় অঞ্চল, চর, হাওর, পাহাড়ি এলাকা, শহরের বস্তিবাসী, দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ নিম্ন আয়ের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীদের প্রতি বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে চাহিদা অনুযায়ী দ্রুতগতিতে সবাইকে নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশনের আওতায় আনতে হবে। নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশনের গুণ ও পরিমাণগত নিশ্চিতে প্রতিটি পরিবারে আলাদা টয়লেট থাকা, শেয়ারড ল্যাট্রিনের ব্যবহার রোধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলে-মেয়েদের আলাদা টয়লেট নিশ্চিত করতে হবে।

ওয়াসার পানির গুনগত মান নিশ্চিতকরণ ও পাইপ নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখা জরুরী। সকলের জন্য নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন নিশ্চিতে ওয়াসাকে প্রাগ্রসর ভূমিকা রাখতে হবে। নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন খাতে অর্থায়ন ঘাটতি কমিয়ে আনাও জরুরী। এক্ষেত্রে ওয়াসার রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির প্রতি জোর দেয়া দরকার। নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশনকে একটি পৃথক খাত হিসেবে জাতীয় বাজেটে পৃথক বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। পরিবেশবান্ধব, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়োনিষ্কাশনের জন্য সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য। কাউকে বাদ দিয়ে বা পিছিয়ে রেখে এসডিজি অর্জন সম্ভব নয়।