banner

শেষ আপডেট ২৬ জুন ২০১৯,  ২১:১৬  ||   বৃহষ্পতিবার, ২৭ই জুন ২০১৯ ইং, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬

সামনে ভয়াল আতঙ্ক !

সামনে ভয়াল আতঙ্ক !

২৭ মার্চ ২০১৯ | ২২:৩০ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সামনে ভয়াল আতঙ্ক !

 

মোস্তফা কামাল পাশা : ইন্টারনেট প্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহার মানুষের জীবনযাত্রা অনেক সহজ করে দিয়েছে। পৃথিবী চলে এসেছে হাতের মুঠোয়। দেশের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ এখন উচ্চ ক্ষমতার ইন্টারনেট সুবিধার আওতায়। ১৪ কোটি মানুষ মুঠোফেন সেবা নিচ্ছেন। মুঠোফোনে ব্যাঙ্কিং সেবাও পৌছে যাচ্ছে ঘরে ঘরে। ইন্টারনেট সেবা মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনার পাশাপাশি এর নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে সমাজ জীবনে। ইন্টারনেট আষক্তি প্রচুর নতুন নতুন অপরাধের বিস্তার ঘটাচ্ছে। মানুষ সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিকতা ছুঁড়ে ফেলে ব্যাক্তিগত লাভ ও লোভের পিছনে পাগলের মত ছুটছে। যার ভয়াবহতা প্রতদিন মিডিয়ায় উঠে আসছে। একই সাথে অনলাইন প্রতারকেরা নানামুখী ফাঁদ পেতে প্রতিদিন শিকার ধরছে। তাদের লোভের ফাঁদে পা দিলেই “সাড়ে সব্বোনাশ”। ঘটে যাচ্ছে ছোটবড় অনেক অঘটন। কেউ কেউ সর্বস্ব হারানোর পাশাপাশি হারাচ্ছেন মান সম্মানও। প্রিয় পাঠকদের সতর্ক করতেই নিজের সাম্প্রতিক কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি।

আজ ২৭ মার্চ সন্ধা সাড়ে সাতটায় 01864050497 নম্বর থেকে একটি কল আসে। এমনিতে ফোন আসা যাওয়ার সংখ্যা হাতেগোনা। কাজে বা লেখাপড়ায় ব্যস্ত থাকলে ব্যাতিক্রম ছাড়া ফোন ধরিনা। তাই সাইলেন্ট বা ভাইব্রেশান মোডে থাকে। দরকারি কল থাকলে পরে কলব্যাক করি, অপরিচিত নম্বর হলেতো একদম না। কিন্তু এই কলটি বারবার বিরক্ত করায় মনোযোগের তেরটা বেজে যায়। রিসিভ করার পর এক ভদ্রলোক নিজকে রবির ঢাকা কর্পোরেট অফিসের বড় কর্তা পরিচয় দিয়ে আমাকে একটা সুখবর তুলে দেন।
সুখবর হচ্ছে, বাছাই করা ধন্যবাদ শ্রেণির গ্রাহকদের নিয়ে মার্কেটিং প্রমোশন কর্মসুচির আওতায় রবি লটারি করেছে। লটারিতে আমার নম্বরটি প্রথম পুরষ্কার জিতেছে। পুরষ্কার হিসাবে পেয়েছি ৭৫ লাখ টাকা দামের নতুন হোন্ডা সিআরভি জিপ। লোকটি ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রচুর গ্যাস পাম্পিং করার পরও শীতল ব্যবহার পেয়ে একটু থমকায়। পুরষ্কার নিতে কী করতে হবে সোজাসাপ্টা জানতে চাই। সে বিভিন্ন ব্যক্তিগত কাগজ পত্র যেমন এন আইডি, আই ডি, পাশপোর্ট ইত্যাদির ফটোকপি তৈরি করে তার নম্বরে রবি নম্বর থেকে কলব্যাক করার পরামর্শ দিয়ে একটু তাড়াহুড়ো করেই বিদায় হয়।
জীবনে কখনো লটারি কেনা বা জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া হয়নি। বিনাশ্রমে কিছু পেতেও অভ্যস্ত না। গাড়ি-টাড়ির খুব একটা লোভও নেই। ওই জিনিসের সেবা গত বিশ বছর ধরে নেয়া হচ্ছে। এখনতো দুরপাল্লার যাত্রা বা অনুষ্ঠানাদি ছাড়া পারতপক্ষে নগর এলাকায় এড়িয়ে চলি। ব্যাক্তিগত গাড়ির মাত্রাতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি এটা এখন পুরাদস্তুর নগর যন্ত্রণার অন্যতম উপসর্গের পর্যায়ে!

জানি, নিজেকে অতো নির্লোভ দাবি, এ যুগে অন্যের কাছে হাসির মজাদার ডিশ তুলে দেয়া ছাড়া কিছুইনা! তাতেইবা দোষ কী! এযুগে মানুষ ব্যাক্তিগত প্রয়োজনে পেশাদার হাসি ছাড়া প্রাণ খুলে স্বতঃস্ফুর্ত হাসির কথা ভুলেই গেছেন। নিখরচায় স্বাভাবিক হাসির উপাদান তুলে দিতে পারায় দোষ কী! এটা সত্য ,বিশেষ কিছু ব্রান্ডের গাড়ির প্রতি আকর্ষণ অবশ্যই আছে। কিন্তু লোভের টোপ গিলে বা কারো দয়ায় নয়।
যা হোক, আপনজনদের পরামর্শ যোগাড় করে খানিক পর অন্য অপারেটরের নাম্বার থেকে নির্দিষ্ট নাম্বরে ফোন দিই। নিজের পরিচয় দিয়ে রবির সংশ্লিষ্ট কর্তার খোজ নিতেই বলা হয়, ভুল নম্বরে কল করেছি। লোকটা দ্রুত বিদায় হতে চাইলে তাকে আটকাতে নাম্বারটা কার এবং তিনি কোন পেশায় আছেন,খুব বিনয়ের সাথে আবোল- তাবোল জানতে চাই। লোকটা হু হা করে চটজলদি বিদায় হয়। সে এমন হবে, হয়তো বুঝতে পারেনি! এত শানদার অপারের পর কেউ অন্য অপারেটরের নম্বর থেকে তাকে গুতোব, তা হয়তো মাথায় নেয়নি।

যা’হোক, বিষয়টি ব্যাব-১১ (নারায়নগন্জ) এর সিও একান্ত স্নেহভাজন ও নিকটাত্মীয় লেঃ কর্নেল কামরুল হাসানকে অবহিত করি। জঘন্য শিশু পাচারকারীচক্রসহ বেশকিছু স্পর্শকাতর প্রতারক দুর্বৃত্ত সিন্ডিকেট তিনি কব্জায় এনেছেন। একই সাথে প্রযুক্তি ও তথ্য যোগাযোগ দফতরের দায়িত্বশীলদেরও মনোযোগে দিয়েছি।

একদিন পর কর্নেল কামরুল জানান, অনলাইন প্রতারক চক্রটি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় ঘাটি গেড়ে দেশব্যাপী প্রতারনার জাল বিছিযেছে। চক্রের কিছু চাই ইতোপূর্বে আটক হয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

দুঃখজনক ব্যপার হচ্ছে, সরকারের তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রনালয় ইন্টারনেট ও অনলাইন আবর্জনা মুক্ত করার বিষয়ে এখনো কার্যকর ও জোরালো ভুমিকা পালনে সক্ষমতা অর্জন করেনি। এর প্রমান, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মিডিয়ায় সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো যেভাবে পবিত্র ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে গণ মানুষের মাঝে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে, সময়ে তা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি এর অন্যতম কারণ।
মজার ব্যাপার, এ’ধরনের প্রচুর বিদেশি প্রতারক চক্রও অন লাইনে টোপ ফেলছে। অতি সম্প্রতি টোপ গিলেছেন, সিলেট হজরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর। তিনি টোপ গিলে হারিয়েছেন প্রায় সোয়া ৫০০০ হাজার মার্কিন ডলার। নিজেও দফায় দফায় আটকাতে আটকাতে বেঁচে গেছি। পেশাগত কারনে আমার বাইরের কিছু যোগাযোগ সূত্র ব্যবহার করে কুশলি জাল পাতা হয়।

লিবিয়ার নিহত একনায়ক কর্নেল গাদ্দাফির সেনা প্রধানের বিশ বছরেরর সুন্দরি এতিম কন্যা আয়েশাসহ বেশ ক’জন এতিম বিদেশিনী জানান, তাদের কেউ সেনেগালের ডাকারের সেফহোমে, কেউবা কিম্বার্লির আশ্রমে মানবেতর অবস্থায় অসহ্য যন্রনা ভোগ করছেন! মরহুম বাবারা তাদের নামে সুইস বা স্কটিশ ব্যাঙ্কে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখেছেন, যা এখন ম্যাচিওর্ড! সবাই সুন্দরি মেয়ে এবং টপ অভিজাত। রাজনৈতিক আশ্রয় ও অভিভাবক দুটোই একসাথে পেতে বারবার আকুল আবেদন! বিপদ মুক্তির জন্য সরকারি সহযোগিতার চেষ্টার কথা বলে বারবার অস্বীকার করার পরও খরচ, সম্মানী, যৌথ ব্যবসা বাবদ দু’একজন তাদের সুইস ও স্কটিশ ব্যাঙ্ককে আমার একাউন্টে ৫০/ ৬০ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সপার নির্দেশনা পত্র দিয়ে সই নেয়ার জন্য ই-মেইল কপি পাঠিয়ে দেয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কে যাছাই- বাছাই ছাড়া সরাসরি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি! কারন সোজা, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগায়োগ করে তাদের বিপদ মুক্তির চেষ্টা ছাড়া কোটি কোটি টাকার টোপ গেলার মতো বিশাল পাকস্থলি কোথায় পাবো! অনাগ্রহের কারনে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও তাদের মেইলগুলো এখনো ইনবক্সে রাখা আছে স্যূভেনির হিসাবে।
জাতিগতভাবে আমাদের কিছু ত্রুটি আছে। সবচেয়ে বড়টা হলো, মাত্রাতিরিক্ত লোভ এবং স্বল্প বা বিনাশ্রমে সর্টকাটে যেকোন উপায়ে প্রচুর অর্থবিত্ত অর্জনের বাসনা। এই লোভকে টার্গেট করেছে চতুর প্রতারক সিন্ডিকেট। আশা করি সবাই সতর্ক হবেন এবং নিরাপদ থাকবেন। সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত, ইন্টারনেটের সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা। নাহলো এর প্রবল আষক্তি ও অপব্যবহার আগামীতে ভয়ংকর দানব হয়ে আবির্ভূত হতে পারে।