banner

শেষ আপডেট ১৫ জুন ২০১৯,  ১৯:২৩  ||   রবিবার, ১৬ই জুন ২০১৯ ইং, ২ আষাঢ় ১৪২৬

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার ঘরে ঘরে কুমড়োবড়ি তৈরির ধুম

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার ঘরে ঘরে কুমড়োবড়ি তৈরির ধুম

১২ জানুয়ারী ২০১৯ | ২২:০৬ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার ঘরে ঘরে কুমড়োবড়ি তৈরির ধুম

 

সালেকিন মিয়া সাগর, চুয়াডাঙ্গা(সদর) প্রতিনিধি: প্রতি বছরের ন্যায় দামুড়হুদা উপজেলায় এবারও শীতের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে কুমড়োবড়ি তৈরির ধুম। আবহমান গ্রাবাংলার ঐতিহ্য এ কুমড়োবড়ির তরকারি যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষের রসনা তৃপ্ত করে আসছে। বর্তমানে নানা ধরনের খাবারের প্রলন হলেও লোভনীয় খাবারের তালিকায় কুমড়োবড়ির অবস্থান এখনও প্রথম সারিতে। জানা গেছে, দামুড়হুদা উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার প্রায় সব এলাকায়ই এই কুমড়োবড়ি তৈরি হয়ে থাকে। শীত মৌসুমের শুরুতেই গৃহিণীরা এই বড়ি তৈরি শুরু করেছেন। গ্রামাঞ্চলের প্রায় বাড়িতেই চোখে পড়ছে কুমড়োবড়ি তৈরি ও শুকানোর দৃশ্য। এই বড়ি তৈরি, শুকানো ও সংরক্ষণের পদ্ধতি সম্পর্কে জানা গেছে, বড়ি তৈরির আগের দিন কুমড়োবড়ির উপকরণ মাসকলাই ডাল রাতে পানিতে ভেজানো হয়। অপরদিকে কুমড়া কেটে চামচ, কুরনি বা স্লাইজার দিয়ে কুরে রাখা হয়। পরদিন খুব ভোরে ভেজানো ডাল ও কুমড়ো পানিতে ধুয়ে আলাদা আলাদভাবে ঢেঁকি অথবা শিলপাটায় পেষায় করা হয়। অবশ্য এখন ঢেঁকি বা শিলপাটার পরিবর্তে মেশিনেও ডাল আর কুমড়া পেষাই করা যায়। সকালে রোদ উঠলে পেষাই করা কুমড়ো ও ডাল একত্রে মিশিয়ে কাদার মতো করে গৃহিণীরা বাঁশের চালি, তারের নেট অথবা কাপড়ের উপর নিপুণ হাতে লাইন করে বড়ি বসায়। বড়ি বসানো শেষ হলে চালি, নেট বা কাপড়টিকে আস্তে করে সরিয়ে খুব সাবধানে বাড়ির উঠানের মাচায়, ঘরের চালে বা ঘরের ছাদে রৌদ্রোজ্জ্বল স্থানে শুকাতে দেয়া হয়। ভাল রোদ হলে ৬ থেকে ৭ দিন শুকানোর পর খাওয়ার উপযোগী হয়। কুয়াশা বা আকাশ মেঘলা হলে বড়ি ভালভাবে শুকাতে না পেরে গন্ধ হয়ে যায়। তাই বড়ি তৈরির জন্য বেছে নেয়া হয় কুয়াশা ও মেঘমুক্ত সময়। ভালভাবে শুকিয়ে মুখ আটকানো পাত্রে সংরক্ষণ করে সারা বছরই এই বড়ি খাওয়া যায়। বড়ি তৈরিতে কুমড়ো ছাড়াও মাসকলাইয়ের ডালের সাথে আলু, পেঁয়াজ, লাউ, মানকচু, পেপে, বাঁধাকপি, ফুলকপিসহ নানারকম সবজি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে পেঁয়াজের তৈরি বড়ি অত্যন্ত সুস্বাদু। তবে এ বড়ি বেশিদিন সংরক্ষণ করে রাখা যায় না। তাই টাটকা থাকতেই এ বড়ি খেতে হয়। কুমড়ার বিচিগুলো দিয়েও তৈরি হয় বিচিবড়ি।

বিশেষ করে সকাল বেলা এই বিচিবড়ি আগুনের আঁচে পুড়িয়ে বা ভেজে তার সাথে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ ও সরিসার তেল দিয়ে মাখানো রাতের রান্না ঠা-া ভাত অত্যন্ত মুখোরোচক খাদ্য। আর তার সাথে শুঁটকি মাছের ভর্তা হলে তো কথাই নেই। কুমড়োবড়ি আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্যর একটি অবিচ্ছেদ্দ অংশ। আগেকার দিনে গ্রামের ধনী দরিদ্র সব বাড়িতেই মাচায় বা ঘরের চালে হতো চাল কুমড়া আর মাঠে হতো মাসকলাই। এখন প্রায় সবাই বাজার থেকে চালকুমড়া ও মাসকলাই কিনে বড়ি তৈরি করে। বর্তমানে বড়ি তৈরির উপকরণ মাসকলাইয়ের ডাল ও কুমড়ার দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বড়ি তৈরির পরিমাণও কমে গেছে। অনেক দরিদ্র মহিলারা বাড়তি আয়ে সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে শীত মৌসুমে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বড়ি তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে। কুমড়োবড়ি তৈরিকারক দর্শনা পৌর এলাকার গৃহবধূ রহিমা বেগম বলেন, আমি প্রায় ১০-১২ বছর যাবৎ শীত মৌসুমে কুমড়োবড়ি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। আগের তুলনায় বর্তমানে অন্যসব জিনিসের সাথে বড়ি তৈরির প্রাধান উপকরণ চালকুমড়া ও মাসকলাইয়ের মূল্যও বেড়েছে। তাই এখন আর আগের মত লাভ হয় না। বর্তমানে মাঝারি সাইজের একটি চাল কুমড়া ১৮০ টাকা থেকে ২শ’ টাকা ও প্রতি কেজি মাসকলাই কিনতে হচ্ছে ৯৫ টাকা থেকে ৯৮ টাকায়। একটি মাঝারি সাইজের চালকুমড়োর সাথে ৩ কেজি কলাই ডাল মিশিয়ে ৪ কেজির মত বড়ি তৈরি হয়। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি বড়ি ২৫০ টাকা থেকে ৩শ’ টাকা টাকা দরে বিক্রি করি। পুরো শীত মৌসুমে বড়ি তৈরি করে বিক্রি করে যা লাভ হয় তাতে সংসারের টুকিটাকি বিভিন্ন কাজে খরচ করি। তিনি আরও বলেন, বাড়িতে বসেই সংসারের অন্যান্য কাজের ফাঁকে ও অবসর সময়ে এ কাজ করে বাড়তি আয় করা যায়। তবে পুঁজি বেশি খাটালে ও সেইসাথে আবহাওয়া ভাল থাকলে এ কাজে বেশ লাভ হয়।