banner

শেষ আপডেট ১৭ জুলাই ২০১৯,  ২১:১৯  ||   বৃহষ্পতিবার, ১৮ই জুলাই ২০১৯ ইং, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

কর্ণফুলী থানা প্রশাসনের নাকের ডগায় শীর্ষ মাদক কারবারিদের মাদক ব্যবসা রমরমা

কর্ণফুলী থানা প্রশাসনের নাকের ডগায় শীর্ষ মাদক কারবারিদের মাদক ব্যবসা রমরমা

৯ জানুয়ারী ২০১৯ | ২১:৪৩ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • কর্ণফুলী থানা প্রশাসনের নাকের ডগায় শীর্ষ মাদক কারবারিদের মাদক ব্যবসা রমরমা

রাজিব শর্মাঃ দেশজুড়ে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চললেও টনক নড়েনি কর্ণফুলী এলাকার শীর্ষ মাদক চোরাকারবারিদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় তাদের নাম নেই, আছে চুনোপুঁটিদের। ফলে কেউ কেউ গা ঢাকা দিলেও থেমে নেই মাদকের কারবার।

সাগরের লোনাজল আর কর্ণফুলী নদীমোহনার এ উপজেলা মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে খ্যাত। শহরের প্রবেশদ্বার এটি। সাগরপথে সহজ যোগাযোগের কারণে প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীরা এখানে গড়ে তুলেছে একাধিক মাদক সিন্ডিকেট আর চোরাকারবারের রমরমা ব্যবসা।চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে কয়েকজন মাদক সম্রাট গা ঢাকা দিয়েছে। আবার এখনো অধরা উপজেলার প্রভাবশালী কিছু মাদক কারবারি, যারা বিভিন্ন ব্যবসার আড়ালে মূলত ইয়াবা কারবারে জড়িত।

শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের আস্তানায় পুলিশের অভিযান সীমিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের নজরে রাখা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের। তবে প্রশাসনের তালিকায় কেবল চুনোপুঁটি মাদকসেবীরা। এলাকায় বসবাসরত মাদকের শীর্ষ চোরাকারবারিদের অনেকের নাম নেই তাতে। ফলে রাঘববোয়ালরা এখনো অধরা। তাদের পৃষ্ঠপোষক রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের আশ্রয়ে থেকে তারা এখনো মাদক বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় কর্ণফুলী উপজেলার অর্ধশতাধিক মাদক ব্যবসায়ীর নাম জানা গেছে বিভিন্ন সূত্রে। ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, মদসহ নানা মাদক দ্রব্য কেনাবেচায় জড়িত তারা। তালিকায় ইছানগর এলাকার শাহেদ প্রকাশ সন্দ্বীপ শাহেদ, শিকলবাহার বাংলাপাড়ার সৈয়দ আহাম্মদ, একই ইউনিয়নের পাঠানিয়াপাড়ার নুরুল আলম প্রকাশ রাক্ষুস, চরলক্ষ্যা মৌলভীপাড়ার জানে আলম, খোয়াজনগর আজিমপাড়ার আব্দুল গফুর প্রকাশ লাল মিয়া, শিকলবাহা কর্ণফুলী গার্ডেন এলাকার মুজিবুর রহমান প্রকাশ মুজিইব্যা, শিকলবাহা আহসানিয়া পাড়ার মনোয়ারা বেগম, একই পাড়ার মো. নজরুল, ইছানগর সৈন্যেরগোষ্ঠির মো. লিটন, উত্তর চরলক্ষ্যার মো. নুরুল মিয়া, চরলক্ষ্যা ৩ নং ওয়ার্ডের নুরুল আলম প্রকাশ নুরু, চরলক্ষ্যার বলিরগোষ্ঠির পেয়ার আহমেদ প্রকাশ দাগী, ইছানগরের মোহাম্মদ কাশেম প্রকাশ ধামা কাশেম, ইছানগর পোড়াবাড়ির মো. রাশেদ, মইজ্জারটেক ইয়াছিন চেয়ারম্যানের বাড়ির মো. ছাবের হোসেন প্রকাশ কানা ছাবের, খোয়াজনগর কবির মেম্বার বাড়ির ছগির আহম্মেদ, শিকলবাহা বাংলাপাড়ার মো. সোহেল, শিকলবাহা চিড়ারটেক এলাকার সেলিম উদ্দীন, একই ইউনিয়নের মনু হাজির বাড়ির মো. রনি, চরপাথরঘাটা লেঙ্গারগোষ্ঠির খুরশিদ আহাম্মদ, চরলক্ষ্যা বোর্ড বাজারের  সেলিম, চরলক্ষ্যার মো. মুন্না মিয়া, মৌলভীপাড়ার মো. সাহাব আলী, শাহমীরপুর ৬ নং ওয়ার্ডের বাবলা, ডাঙ্গারচরের বাবুল হক, চরলক্ষ্যা দফাদার বাড়ির বাইল্লা, খোয়াজনগর বেলার বাপের বাড়ির মো. বাবুল হক, চরপাথরঘাটা ১ নং ওর্য়াডের মো. জাবেদ, বক্তিয়ার পাড়া দানু মেম্বার বাড়ির মো. বাবুল, শিকলবাহা বাংলাপাড়ার ফরিদ, জুলধা পাইপের গোড়ার নুরুল ইসলাম, মো. হাসান প্রকাশ ডান্ডা মিয়া, চরলক্ষ্যা মনুর বাপের বাড়ির মো. হোসেন প্রকাশ কাইল্যা, পাইপের গোড়া বাজারের মো. জাবেদ, জুলধা মাতব্বর পাড়ার জয়নাল মাস্টার, বাদুড়তলার মো. সেলিম ড্রাইভার, ইছানগর এলাকার মো. সেলিম, চরলক্ষ্যার সৈন্যেরবাড়ির সেলিম উল্লাহ, ইছানগর কবির আহমেদ বাড়ির মো. সেলিম উদ্দীন (হাজতে), চরলক্ষ্যার লোকমান ও আলী, ইছানগর আব্দুর রশিদ বাড়ির মো. দিল আহমদ প্রকাশ দিলু, ইছানগর মির্জাবাড়ির জহির কলোনীর মো. তারেক, পারকি এলাকার মোহাম্মদ সেলিম প্রকাশ ইছাইয়া বর্তমানে শিকলবাহা, পশ্চিম চরলক্ষ্যা নাগরু বাপের বাড়ি মো. মন্নানের নাম রয়েছে।

এ ছাড়া মাদক ব্যবসায় দাম্ভিকতা দেখাচ্ছে বলে পুলিশের অভিযোগে রয়েছে শাহমীরপুর রাজ্জাক পাড়ার হোসনে আরা প্রকাশ মদ্দা হোসনী, দৌলতপুর ২ নং ওয়ার্ডের একাধিক মামলার আসামি আইয়ুব, জুলধা পাইপের গোড়ার চোরাকারবারি মাদারী শুক্কুর, চরপাথরঘাটার কিছু মাছ ব্যবসায়ী, উপজেলার কতিপয় ইউপি সদস্য ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয কমিটির বিভিন্ন পদে থাকা ছোট-বড় নেতারা এসব কাজে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া যায়।

তাদের প্রতি স্থানীয় প্রশাসন নজরদারি করছে জানিয়ে সূত্র জানায়, তাদের মধ্যে বেশ কজন পলাতক ও জেল হাজতে থাকলেও বেশির ভাগই অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত।

স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, এরা বেশির ভাগই এলাকায় প্রভাবশালী ও দাপুটে। কেননা জেলা পর্যায়ের ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা ও বিএনপি-জামাতের কিছু নেতা এসব মাদক কারবারির আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা। তাদের প্রভাবের কারণে কর্ণফুলী থানার পুলিশ অভিযানে যেতে সময় নিচ্ছে।  এর সুযোগ নিচ্ছে মাদকের বড় সিন্ডিকেট আর কারবারিরা।

সূত্র আরও জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে যেসব রাঘববোয়ালের নাম এসেছে তাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে কর্ণফুলীতে মাদকের মূলোৎপাটন সম্ভব নয়।

বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কর্ণফুলীতে নানা ধরনের মাদকের কেনাবেচা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবার আধিক্য বেড়েছে। দিন দিন মরণ নেশা ইয়াবার বিষাক্ত থাবা ছড়াচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। অন্য মাদকের পরিবর্তে ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে এই উপজেলায়।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, কর্ণফুলীতে মাদকাসক্তদের ৭৫-৮০ শতাংশই ইয়াবাসেবী। পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও সেবন প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় দ্রুত ইয়াবার বিস্তার ঘটছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১১ নং মাতব্বরঘাট, ১০ নং ঘাটপাড়, ব্রিজঘাট, ইছানগর ঘাট, বাংলাবাজার ঘাট, শিকলবাহা চিড়ারটেক, ডাঙ্গারচর ঘাট, কক্সবাজার থেকে আসা মাছের ট্রাক, টেকনাফ থেকে আসা গরুর চালান, সাদা প্রাইভেট কার কিংবা নম্বরবিহীন কিছু মোটরসাইকেলে করে বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা লোকালয়ে আনা হয়।

চরপাথরঘাটার ব্রিজঘাট কয়লার মাঠ, পুরাতন ঘাটের কিছু দোকান, বিএফডিসি রোডের চিকন ঘাট, ইছানগর খালিমাঠ, খোয়াজনগর বশির মেম্বার কলোনী, চরপাথরঘাটা মাদ্রাসাপাড়ার খোলামাঠ, সিডিএ আবাসিক, শাহমীরপুর রাজ্জাক পাড়ার হোসনীর বাসা বাড়ি, শাহ আমানত সেতুর দক্ষিণ পাড় মাদক সেবনের গোপন আস্তানা নামে পরিচিত এবং এসব স্থানে নিয়মিত বসে মাদক সেবনের আসর।

আর এসব আসরে গাঁজা সাধারণত ‘শুকনা’, ‘সবজি’ নামে পরিচিত, ইয়াবা বা বাবা দু-তিন ধরনের রয়েছে। এর মধ্যে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় ছোট মাথা এবং ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বড় মাথা। আর মাত্র ২০ টাকায় পাওয়া যায় গাঁজার পুঁটলি। অনেকে গ্রাম হিসেবে কিনে থাকে। মাঝেমধ্যে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের অভিযানে এলাকার চিহ্নিত কয়েকজন চুনোপুঁটি মদ ব্যবসায়ী ধরা পড়লেও ইয়াবার রাঘববোয়ালরা বহাল তবিয়তে রয়েছে।

কর্ণফুলীতে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান দৃশ্যমান নয় কেন- এমন প্রশ্নে কর্ণফুলী থানার (ওসি তদন্ত ) ইমাম হাসান এ অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘মাদকের ব্যাপারে প্রশাসন জিরো টলারেন্সে আছে। সারা দেশের মতো কর্ণফুলীতেও অভিযান চলছে।  প্রতিদিনই মাদকদ্রব্য ধরছি।’

কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরী জানান, ‘মাদকের বিরুদ্ধে সরকার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন আনছে। উপজেলায় মাদক নির্র্মূলে প্রশাসনের আরো বেশি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনে রয়েছে বলে মনে করি।’

বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও শ্রমিক নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইসলাম আহমেদ মনে করেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলেও কর্ণফুলী প্রশাসন অনেকটা নীরব। মাদকের বিরুদ্ধে তিনি সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন বলে জানান।’

মাদকের বিরুদ্ধে একদমই অভিযান হচ্ছে না, তা সঠিক নয় বলে দাবি করেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কর্ণফুলী জোন) জাহেদুল ইসলাম।

তিনি জানান, প্রতিদিনই একাধিক মাদক মামলা নথিভুক্ত হচ্ছে কর্ণফুলী থানায়, যা অন্যান্য থানার চেয়ে বেশি।