banner

শেষ আপডেট ১২ ডিসেম্বর ২০১৮,  ২০:০৯  ||   বৃহষ্পতিবার, ১৩ই ডিসেম্বর ২০১৮ ইং, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

জাল বন্টননামা দলিলের মাধ্যমে মোজাহের ঔষধালয়ের ২৪৮৬ শতাংশ ভূমি আত্মসাতের অপচেষ্টা

জাল বন্টননামা দলিলের মাধ্যমে মোজাহের ঔষধালয়ের ২৪৮৬ শতাংশ ভূমি আত্মসাতের অপচেষ্টা

২৬ নভেম্বর ২০১৮ | ১৭:৪৯ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • জাল বন্টননামা দলিলের মাধ্যমে মোজাহের ঔষধালয়ের ২৪৮৬ শতাংশ ভূমি আত্মসাতের অপচেষ্টা
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামে সদরে ইদানিং জাল দলিল তৈরি চক্রের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চক্রের ফাঁদে অনেকেই হচ্ছেন সর্বস্বান্ত। এতে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন জমির মালিকরা।কখনো ভুয়াদাতায়, কখনো আবার জমির মালিকের অজান্তেই জাল দলিল করছে তারা। পরবর্তী সময়ে ওই দলিল জামানত রেখেই সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের ঋণ নেওয়া হচ্ছে। আর এসব জমি জামানত নিয়ে বিপাকে পড়ছে ব্যাংক। মামলায় জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন জমির মূল মালিক। আর ব্যাংকের মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে জালিয়াত চক্র।
ভূমিদস্যু চক্রের জনৈক সেলিম ও ইলিয়াস গং চট্টগ্রাম শহরের প্রান কেন্দ্র খ্যাত কতোয়ালী থানাধীন ১৮২/২২৩, রহমতগঞ্জস্থ আব্দুর সাত্তার রোড এলাকায় মোজাহের ঔষধালয়ের মালিক মরহুম আলহাজ্ব এস. এম.মোজাহেরুল হক মিয়া’র ২৪৮৬ শতাংশ ভুমি সহ ভবন(মোজাহের ভবন) এবং বাকলিয়ার কিছু অংশ ভূমির জাল বন্টননামা দলিল করার যাবতীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপচেষ্টা চালিয়েছিল,কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে পুরো গং পালিয়ে যায়। এই ভূমিদস্যু চক্রের মূল হোতা জনৈক সেলিম ও ইলিয়াস গং এর বাড়ী বাকলিয়া থানাধীন কালামিয়া বাজার এলাকায় বলে জানা গেছে এবং তাদের সাথে মরহুম আলহাজ্ব এস. এম.মোজাহেরুল হক মিয়া’র জামাতা জনৈক নুরুল আবছারও জড়িত বলে সূত্রে জানা যায়।
এই ভূমিদস্যু গং  জাল বন্টননামা দলিল সৃজনের লক্ষ্যে দলিলে ১ম পক্ষের ওয়ারিশ তানজিয়া বেগম,সায়েরা বেগম, রেজিয়া সুলতানা,সেলিনা মমতাজ,সানজিদা কোহিনুর,শাহনাজ পারভিন,উভয় পিতা-মরহুম আলহাজ্ব এস. এম.মোজাহেরুল হক মিয়া,মাতা-মরহুমা কুলসুমা খাতুন। বাড়ী ভিটা ও খিলা জমির পরিমাণ ৪’৬৮ শতক বা ০৪৬৮ শতাংশ এবং মৌজা মূল্য মং-৯০,৮৫,০০০/=টাকা উল্লেখ করে।
২য় পক্ষের ওয়ারিশ আলহাজ্ব এস. এম.আবু তাহের,আলহাজ্ব এস. এম.আবুল কালাম,আলহাজ্ব এস. এম.আবু মহসিন,সৈয়দ মোঃআবুল মনসুর,এস.এম.আবু তৈয়ব,এস.এম.আবুল হাসেম,এস.এম.তারেক মঈনুদ্দীন,উলফেতুন নেছা। উভয় পিতা-মরহুম আলহাজ্ব এস. এম.মোজাহেরুল হক মিয়া, মাতা-মরহুমা জামেনা হক। তাদের বাড়ী ভিটা ও খিলা জমির পরিমাণ ১৯’৫১ শতক বা ১৯৫১ শতাংশ এবং মৌজা মূল্য মং-১,৮৪,২৬,০০০/=টাকা উল্লেখ করে।
 ৩য় পক্ষের ওয়ারিশ হাসিনা পারভীন,শমসাদ বেগম ও এস.এম. জাহাঙ্গীর হোসেন। উভয় পিতা-মরহুম আলহাজ্ব এস. এম.মোজাহেরুল হক মিয়া, মাতা-মরহুমা সাকিনা খাতুন।তাদের বাড়ী ভিটা ও খিলা জমির পরিমাণ ০’০৬৭ শতক বা ০০৬৭শতাংশ এবং মৌজা মূল্য মং-১২,৯৮,৫০০/=টাকা উল্লেখ করা হয়।
এভাবে মোট ৯ জন মহিলা ও ৮ জন পুরুষ সহ মোট ১৭ জনকে মরহুম আলহাজ্ব এস. এম.মোজাহেরুল হক মিয়া’র ভূয়া  ওয়ারিশ সাজিয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে বন্টননামা সৃজনের পাঁয়তারা চালায়। এ দলিল সদর সাব রেজিষ্ট্রি ওফিসে অস্থায়ী দায়িত্বে নিয়োজিত এবং অস্থায়ী নকল নবীশ জনৈক আরাফাত সদর সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের পক্ষে রেজিষ্ট্রির জন্যে ফাইন্যাল চেকও করে ফেলে। কিন্তু জনৈক দলিল লিখক মোঃ সিরাজুল ইসলাম ও মোঃ হাবিবের বিচক্ষণতায় এই ভূয়া বন্টননামা আর রেজিষ্ট্রি করা সম্ভব হয়নি। কারণ মরহুম আলহাজ্ব এস. এম.মোজাহেরুল হক মিয়া’র অনেক ওয়ারিশকে মোঃ সিরাজুল ইসলাম ও মোঃ হাবিব চেনেন বিধায় বন্টননামা করতে আসা ওয়ারিসদের তারা ভূয়া ওয়ারিশ বলে সনাক্ত করেন। তখন অবস্থা বেগতিক দেখে ভুমিদস্যু গং সহ ভূয়া ওয়ারিশগণ কাগজ-পত্র ফেলে তৎক্ষনাৎ একজন আরেকজনের চোখের ইশারায় সবাই সটকে পড়ে। সুচতুর এই ভূমিদস্যু গং উল্লেখিত সম্পত্তির দলিলের প্রয়োজনীয় দলিল ও কাগজ-পত্রের পাশাপাশি জমির হালসন পর্যন্ত  সরকারি খাজনা পরিশোধের ভূয়া দাখিলা ,তথ্য গোপন করে জামালখান ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন হতে ওয়ারিশান সার্টিফিকেট,ভূয়া ডেথ সার্টিফিকেট,ভূয়া জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপিও অংশনামা দলিলে সংযুক্ত করেছিল। তদন্তে দেখা যায়,জাতীয় পরিচয় পত্রের শুধুমাত্র নাম বাদে জন্ম তারিখ,আই.ডি.নং,ছবি, সবই ভূয়া।
আরেকটি সূত্র জানায়,এই চক্রের সদস্যরা টাকার বিনিময়ে উদ্দেশ্য প্রনোদিত হয়ে কাউকে ফাঁসানোর লক্ষ্যে চট্টগ্রাম আদালতে ভূয়া বাদী সেজে প্রতারনার মামলাও করে থাকে।
এব্যাপারে জেলা সদর সাব রেজিষ্টার মোস্তফিজ আহমেদের সাথে আলাপকালে তিনি জানান,সাফ কবলা, বন্টননামা,বায়নানামা,আমোক্তারনামা সহ যাবতীয় রেজিষ্ট্রির ক্ষেত্রে আমরা দাতা-গ্রহীতার সঠিক ও প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র আছে কিনা দেখি। এখন ঐসব কাগজ-পত্রের মধ্যে কোনটি আসল এবং কোনটি ভূয়া বা নকল তা আমাদের পরখ করে দেখা সম্ভব হয় না। তারপরও কোনভাবে যাতে দু’নম্বরি দলিল হতে না পারে আমরা সবসময় সজাগ থাকি। আর এছাড়া আমার অফিস সহ প্রত্যেকটি রেজিঃ অফিসে লোকবল কম। যার কারণে অস্থায়ী ক্যাজুয়েল ভিত্তিতে লোক দিয়ে আমাদের কাজ চালিয়ে নিতে হয়। অস্থায়ী ও অনভিজ্ঞ লোকের কারণে কাজের ব্যত্যয় ঘটে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, রেজিষ্ট্রির সাথে সম্পৃক্ত লোককেই অস্থায়ী বা ক্যাজুয়েল ভিত্তিতে রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে কোন সমস্যা হয় না। তারপরও প্রত্যেকটা দলিল ফাইন্যালী চেকের পর তো আমার টেবিলেই আসবে। কাজেই ভূল হওয়ার সুযোগ থাকে না।
 ভূয়া বন্টননামা সৃজনের অপচেষ্টার ব্যাপারে আলহাজ্ব এস. এম.মোজাহেরুল হক মিয়া’র জ্যেষ্ট পুত্র আলহাজ্ব এস. এম.আবু তাহেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি এ সবের কিছুই জানেন না বলে জানান। তিনি জানান,ওয়ারিশ ক্রমে আমরা সব ওয়ারিশান আমাদের সম্পত্তিতে ভোগ দখলে স্থিত আছি। এব্যাপারে আমাদের ওয়ারিশানদের কারো মাঝে মতানৈক্য নেই। কোন একটি চক্র আমাদের বিপদে ফেলার জন্যে এবং আমাদের পুরো পরিবারের ভাবমূর্তি নষ্ট ও হেয় প্রতিপন্ন করার কুমানসে এসব জাল-জালিয়তির আশ্রয় নিতে চাচ্ছে বলে আমার মনে হয়। এ ব্যাপারে আমি ভুমি রেজিষ্ট্রেশন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট আইন-শৃংখলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
প্রতারক গ্রুপ কর্তৃক সংগৃহীত মরহুম আলহাজ্ব এস. এম.মোজাহেরুল হক মিয়া’র ওয়ারিশগণের ওয়ারিশান সার্টিকেট ও ডেথ সার্টিফিকেট সম্পর্কিত ব্যাপারে হেমসেন লেইনস্থ ২১নং জামাল খান ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনের সাথে যোগাযোগ করতে গেলে তাকে ঐসময়ে অফিসে উপস্থিত পাওয়া যায়নি। তাকে না পেয়ে তার অফিস সচিব মোঃ পারভেজ কবিরের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করা হলে, মোঃ পারভেজ কবির ফটোকপিগুলো দেখে জানান,” আমাদের ওয়ার্ড অফিস থেকে কোন লোককে এধরণের কোন ওয়ারিশান সার্টিফিকেট বা ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়নি। তাছাড়া এসব সার্টিফিকেটে আমাদের ওয়ার্ডের প্যাডের ডিজাইনের সাথে কোন মিল নেই,কাউন্সিলরের দস্তখতের সাথে কোন মিল নেই,মনোগ্রাম ডিজাইনের মিল নেই,মোবাইল নাম্বারের মিল নেই। অর্থাৎ সর্বোপরি এই ওয়ারিশান সার্টিফিকেট ও ডেথ সার্টিফিকেটগুলো সম্পূর্ণ ভূয়া।” পরে আবার টেলিফোনে কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি উল্লেখিত কাগজ-পত্র না দেখে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সূত্র জানায়, এসব প্রতারক ভূমিদস্যু চক্র এভাবে ভূয়া বন্টননামা রেজিষ্ট্রির পর পরবর্তীতে  পূণরায় জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বন্টননামা বা ছাপ কবলা সৃজন পূর্বক ব্যাংকে কবলা মর্টগেজ দিয়ে লক্ষ-কৌটি টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেয়। এভাবে ব্যাংক ঋণের বিপরীতে গ্রাহকদের জমা দেওয়া মর্টগেজের সিংহভাগ দলিলপত্রই ভুয়া বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এসব জাল-জালিয়াতির সাথে ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পরিচালকরা পর্যন্ত জড়িত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রয়োজনে অনেক সময় তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েও এসব করে থাকে বলে সূত্রটি জানায়। তাই প্রশাসনের এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এই সংঘবদ্ধ চক্রকে আটকের জন্য। এ প্রতারক চক্রের  যে কোনো একজনকে আটক করতে পারলে বেরিয়ে আসবে কারা করছে এই অবৈধ ব্যবসা। এসব প্রতারক চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।