banner

শেষ আপডেট ১২ ডিসেম্বর ২০১৮,  ২০:০৯  ||   বৃহষ্পতিবার, ১৩ই ডিসেম্বর ২০১৮ ইং, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

সুজা কন্যার বিলাপ ও পরীবানুর হঁলা

সুজা কন্যার বিলাপ ও পরীবানুর হঁলা

২৫ নভেম্বর ২০১৮ | ১৯:৫৭ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সুজা কন্যার বিলাপ ও পরীবানুর হঁলা

জামাল উদ্দিন : ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দের ইতিহাস। তখন চট্টগ্রাম ছিল আরাকান রাজ্যের একটি প্রদেশ। যার সীমানা ফেনী নদীর তীর পর্যন্ত। ফেনী নদীর ওপাড়ে মোগল সাম্রাজ্যভূক্ত বাংলা, আর এপাড়ে আরাকান রাজ্যের প্রদেশ শহর চট্টগ্রাম। তখন বাংলার নবাব ছিলেন শাহ সুজা। তিনি ছিলেন দিল্লীর সম্রাট শাহজাহানের পুত্র। সম্রাট শাহজাহানের বৃদ্ধ বয়সে দিল্লীর সিংহাসন দখল করে তাঁরই ছোট ছেলে আওরঙ্গ জেব। কিন্তু সম্রাট শাহজাহানের ৫ পুত্রের মধ্যে অন্যরা আওরঙ্গজেব কে দিল্লীর সম্রাট হিসেবে মেনে নিতে পারলেন না। শুরু হয়ে যায় পরষ্পরের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ। বাংলার নবাব শাহ সুজা খাজাওয়ার নামক যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের সাথে পরাজিত হয়ে বিশাল সেনাবাহিনী সহ প্রথমে মুর্শিদাবাদ এবং সেখান থেকে ঢাকা হয়ে আরাকান রাজ্যের চট্টগ্রাম প্রদেশে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি সপরিবারে চট্টগ্রাম ত্যাগ করে আরাকান রাজ্যের রাজধানী মোহং শহরে চলে যান। কিন্তু আশ্রয় গ্রহণের ৬ মাস পর শাহ সুজার এক কন্যাকে কেন্দ্র করে আরাকান রাজের বিরোধ সৃষ্টি হয়। তার কারণ আরাকান রাজ শাহ সুজার কন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে শাহ সুজা প্রস্তাব প্রত্যাক্ষান করলে এক পর্যায়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। এই ঘটনায় মোহং শহরেই শাহ সুজা নির্মমভাবে প্রাণ হারায় এবং নিশ্চিন্ন হয়ে যায় সুজা পরিবার।
ঐ সময়কার ঘটনাবলী অবলম্বনে সেকালের এক গায়েন অন্তরের দরদ উজাড় করে ব্যক্ত করেছেন সুজা-পরীবানুর ভাগ্য বিড়ম্বনা ও মৃত্যু বরণের কাহিনী এবং হতভাগ্য রাজকুমারী সুজাতনয়ার বিলাপ। মূল ঘটনার সাথে ঐ পল্লীগাথার সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য কতটুকু আছে বা নেই তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বৃথা। কারণ কবি এখানে রচনা করেছেন কাব্য।

বলে রাখা দরকার, কাব্য ইতিহাস নয়, কিন্তু কাব্য থেকে খুঁজে পাওয়া যায় ইতিহাসের অনেক তথ্য-উপাত্ত। সুজা ও পরীবানুর কাহিনী ও সুজাকন্যার বিলাপ পাঠে আমরা জানতে পারি অনেক অজানা তথ্য-উপাত্ত। এখানে পরীবানুর হঁলা ও সুজাতনয়ার বিলাপের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।
সাইগরে ডুবালি পরীরে।
হায়! হায় দুখ্খে মরিরে ॥
বার বাংলার বাদশা সুজা রাজ্যের শেষ নাই
বাপের দিন্যা তক্তের লাগি করিল লড়াই
মার পেডর ভাই রে হৈল কাল পরানের বৈরীরে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥

ভাইয়ে চাইলো ভাইয়ের লউ(রক্ত) মিছা রাজ্যের লাগি।
গরীবগুইন্যা বেশী বালা যারা খায় মাগি ॥
কিসের রাজ্য কিসের ধন কিসের টাকা কড়িরেÑ
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥

সুজা বাদশার আওরাত (স্ত্রী) পরীবানু নাম।
চাডিয়াতে(চট্টগ্রামে) আসি তাঁরা বদরের মোকাম ॥
বহুত খয়রাত সোনা দিলা ভরী ভরীরে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥

নসিবের লেখা কভু না যায় খণ্ডন
চাডিয়া ছাড়িতে বাদশা করিল মনন ॥
দক্ষিণ মিক্যা (দক্ষিণ দিকে) আইল তারা হাতির পিঠে চড়িরে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥
মধ্যে বসে সুজা বাদশা বামে পরীজান
ডানে দুই কন্যা যেন পূর্ণিমারই চান ॥
ধীরে ধীরে যায় তারা মুড়ার পথ ধরিরে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥
কোন দিগ্দি কণ্ডে যাইব নাইরে ঠিকানা
কেহ দিল পন্থ দেখাই কেহ করে মানা ॥
ধীরে ধীরে যায়রে তাঁরা মুড়ার পথ ধরিরে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥

বড় বড় দইরগ্যা (দরিয়া) পাইবা গেলে তারপর
ডঅর ডঅর (বড়) আছে কুমির ও হাঙ্গর ॥
কনে (কে) দিব তানরারে দইরগ্যা পার করিরে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥

ন যাইও ন যাইও পরী মইগ্যা রাজার দেশে
ধন দৌলত হারাইয়া জান দিবা শেষে ॥
দইন মিক্যা না যাইও পরী পন্থ করিরে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥

ন যাইও ন যাইও পরী মুরুংগ্যার ঠাই।
মাইনসের গোস্ত খায় তারা হিজাই হিজাই (সিদ্ধ) ॥
মানা করি যাইতে আমি রে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥

পশ্চিম মিক্যা ন যাইও সাগরের পারে
আমার কথা মনে রাইখ্যো কহি বারে বারে ॥
হার্মাদ্যারা লৈয়া (নিয়া) যাইব গলাৎ বাঁধি দড়িরে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥

ভোগালুরা (ক্ষুধার্থ) ভাত চায় তিয়াসীরা (তৃষ্ণার্ত) পানি
পানিরে পাইলে নদী বুকে লয় টানি ॥
মনরে আমি কেমনে বুঝাইরে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥
বাদশার মুখের পানে রইলো পরী চাহি
মাঝ দরিয়ায় চলে সুজা নৌকা বাহি বাহি ॥
হাত নাহি চলে, অঙ্গ কাঁপে থর থরিরে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥

আছমানে উডিল সুরুজ (সূর্য) বরণ তার লাল
পরীর মুখ চাহি সুজা সাইগরে দিল ফাল (লাফ)
ওরে দেখা নাই সে গেল আর সেই ছোট তরীরে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥

ডুবিল ডুবিল নৌকা সুজা-পরীজান
দরিয়ার মাঝে হায় দিলরে পরাণ
মরণেও রৈল তারা বুক জড়াজড়ি রে
সাইগরে ডুবালি পরীরে ॥
দ্বিতীয় পালাগানটিরও প্রচলিত নাম সুজাকন্যার বিলাপ। মগরাজা সুজার সাথে বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ তার জ্যেষ্ঠ কন্যাকে রাজবাড়িতে বেড়ানোর (নাইওর) প্রস্তাব দেয়। কন্যা মগরাজার বাড়িতে কিছুতেই যেতে চায় নি। কিন্তু তার কথা পিতা-মাতা কর্ণপাত করেন নি। সুজাকন্যা মগরাজার বাড়িতে গেলেই তাকে বন্দী করে রাখে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মগরাজার সাথে শাহ সুজার তীব্র মনোমালিন্যের সূত্রপাত ঘটে। ঘটনা এমনই দাঁড়ায় যে, মগরাজা শাহ সুজার সমস্ত মণিমুক্তা, ধনরত্ন কেড়ে নেয়। শুরু হয়ে যায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। অতঃপর সুজা ও পরীবানু সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সুজার অপর কন্যাকেও মগসৈন্যরা হত্যা করে। বন্দিনী সুজাকন্যা পিতামাতা ও বোনের জন্য করেছেন বিলাপ, আর নিয়তির অমোঘ বিধানকে দিচ্ছেন ধিক্কার। অজ্ঞাতনামা কবি এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সঙ্গীতমালার সৃষ্টি করেছেন তা যেমনি করুণ, তেমনি মধুর। এই গীতিকাদ্বয় হৃদয়ঙ্গম করতে গিয়ে আমাদের প্রথমত মনে পড়ে এ বিশ্বসংসারে কোন কিছুই অবিনশ্বর নয়, টাকা-কড়ি, ধন-দৌলত সব ‘ভোজের বাজিতে’ পরিপূর্ণ। এ সংসারে মিছারাজ্য, মিছাধন, মিছা টাকাকড়ি।
দ্বিতীয়ত আমাদেরকে বার বার স্মরণ করিয়ে দেয় সুজাকন্যার বিলাপ “রাতে দিনে চোখের জলে বালিশ ভিজাই আমি”  এমনই হৃদয় বিদারক ঘটনায় পাষাণের চোখেও জল এসে যায়।

“নছিবে এ কি ছিল রে॥
কি নাইয়র করালি মা-বাপ, ঠেকলাম মগ্যার হাতে।
এত দুক্ষ খোদা মোর লেখিলা বরাতে ॥
মা-ভৈনেরে হারাইলাম, হারাইলাম বাপ তোরে।
মগ্যা রাজা ছল করিয়া লুইট্যা লইল মোরে ॥
হায়! লুইট্যা লইল মোরে …
নছিবে একি ছিল রে… ॥

কু-ছাহাতে আইল রে বাপ মগ্যা রাজার দেশে।
কুলও দিলি, মানও দিলি, জানও দিলি শেষে ॥
ধন-দৌলত লইয়া রে তুই পলালি কার ডরে।
সোনার জেয়র হীরা মোতি রাখিলি কার ঘরে ॥
হায় ! রাখিলি কার ঘরে …
নছিবে এ কি ছিল রে … ॥

দেশে দেশে ঘুরিলাম রে মুল্লুকে মুল্লুক।
কোন্ সতীনের পুতের সঙ্গে করিলি ছুল্লুক ॥
কি লালছে আইলি শেষে রোসাঙ্গ শহরে।
মা-ভৈনরে ডুপালি রে ডুপিলি সাগরে ॥
হায় ! ডুপিলি সাগরে …
নছিবে এ কি ছিলরে … ॥

দুর্গত্যা পরান আমার ন যায় নিকলি।
তুষের আইল্যা হৈয়ে রে বুকে ওঠে জ্বলি জ্বলি ॥
বারে বারে কইলামরে বাপ নাইয়র ন-দিঅ মোরে।
জীয়তা রাখিয়া কেন মাটি দিলি গোরে ॥
হায় ! মাটি দিলি গোরে …
নছিবে এ কি ছিলরে … ॥

ক্ষুধা-তিষ্টা মালুম নাইরে কাঁদি রাত দিন।
মগ্যা রাজার খানা খাইতে মনে আইসে ঘিন ॥
এক সোনাই রাঁধে রে ভাত, বাড়ী শুদ্ধ খায়।
বাসন ভরা নাপকি পোচা গিলা যে ন যায় ॥
আমার গিলা যে না যায় রে…
নছিবে একি ছিল রে …।

রাতে দিনে চোখের জলে বালিশ ভিজাই আমি।
পিনবার লাগি মগ্যা রাজা দিছে কালা থামি ॥
দশমগিনী আইসা আমার বসে গায়ের কাছে।
কানে দিতাম মকহি মোরে সোনার নাধং যাচে ॥
হায়! সোনার নাধং যাচে রে …
নছিবে এ কি ছিলরে … ॥

আসমানেরই ফুল রে ছিলাম আসমানেরই ফুল।
মগ্যা রাজার হাতে পড়ি দিলাম জাতি কুল ॥
সাগরের তলে মা-বাপ করিলি কবর।
হার্মাদ্যার মুলুকে আমার কে লইব খবর ॥
মা বাপ কে লইব খবর রে…
নছিবে এ কি ছিলরে ॥