banner

শেষ আপডেট ১৬ অক্টোবর ২০১৮,  ২২:২৪  ||   বুধবার, ১৭ই অক্টোবর ২০১৮ ইং, ২ কার্তিক ১৪২৫

পরিবর্তন হচ্ছে তদন্ত কর্মকর্তাঃ আলোচিত ছয় মামলার আসামীরা ধরাছোঁয়ার বাহিরে

পরিবর্তন হচ্ছে তদন্ত কর্মকর্তাঃ আলোচিত ছয় মামলার আসামীরা ধরাছোঁয়ার বাহিরে

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১৯:৫৯ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • পরিবর্তন হচ্ছে তদন্ত কর্মকর্তাঃ আলোচিত ছয় মামলার আসামীরা ধরাছোঁয়ার বাহিরে

বিশ্বজিৎ পালঃ চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত ছয়টি মামলার রহাস্য উদ্ঘাটনে তেমন কোন আশার আলো দেখছেনা মামলার বাদিরা। একের পর ঘটে যাওয়া হত্যাসহ ছয় মামলার আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে বারবার তদন্তেরভার পুলিশের এক সংস্থা অন্য সংস্থায় পরিবর্তনের হিড়িক পড়েছে। এরপরও আসামিদের গ্রেফতারে সুফল নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এসব মামলায় জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে না পারায় স্বজনরা ক্ষোভে ফুঁসছে। এসব মামলাগুলোর মধ্যে স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিন, আইনজীবীর স্ত্রী বিবি রহিমা এবং অঞ্জলী রানী দেবী খুনের মামলা তদন্তভার নগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে। এছাড়া স্কুলছাত্রী ইলহাম বিনতে নাছির হত্যা ও রেলস্টেশন থেকে ২০৫ ভরি সোনা লুটের মামলা তদন্তভার সিআইডির কাছে এবং সীতাকুণ্ডের রূপালী ব্যাংকের ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের মামলার তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরীর চকবাজার তেলিপট্টি এলাকার নিজ বাসার গলির মুখে অঞ্জলি রানী দেবীকে কুপিয়ে হত্যা। এরপর রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) পাহাড়তলী স্টেশন পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা হাবিলদার মো. মেজবাহের উপস্থিতিতে হাজারী গলির বিশ্বকর্মা বুলিয়ন জুয়েলার্সের দুই কর্মচারীর কাছ থেকে ২০৫ ভরি সোনা লুট। একই বছরে সীতাকুণ্ডে পূবালী ব্যাংকের গাড়ি থেকে রহস্যজনকভাবে ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা উধাও। বাসা থেকে বের হওয়ার পর সকালে নগরীর পতেঙ্গা এলাকা থেকে সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসফিয়া আমিনের মরদেহ উদ্ধার। এরপর নগরীর বাকলিয়া সৈয়দশাহ ল্যান্ডমার্ক সোসাইটির বাসার ভেতরে খাটের ওপরে স্কুলছাত্রী ইলহাম বিনতে নাছিরকে গলা কেটে হত্যা। এরপর নিজ বাড়ি থেকে চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী এহতেশামুল পারভেজ সিদ্দিকী জুয়েলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বিবি রহিমার মরদেহ উদ্ধার। এসব মামলায় বিভিন্ন বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত শুরু করলেও হত্যা ও লুটের কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। শুধু মামলা দায়েরের পর কেবল তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হচ্ছে।

যোগাযোগ করা হলে, নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিন বলেন, মামলাগুলো অধিক গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত করা হচ্ছে। একজন মানুষ যেসব কারণে খুন হতে পারেন, এর সবই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় সোর্স থেকে শুরু করে প্রযুক্তির সহায়তাও নেওয়া হয়েছে তদন্তে। আশা করছি খুব দ্রুত সবক’টি মামলার ক্লু উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।

তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অধিকতর তদন্তের স্বার্থে তদন্ত কর্মকর্তার পরিবর্তন হয়। এতে তেমন কোন সমস্যা হয় না। বরং মামলার তদন্তে আরো গতি বেড়ে যায়। এতে জড়িতরা দ্রুত গ্রেফতারও হয় বলে তিনি জানান।
মামলাগুলোর নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টায় পাহাড়তলী স্টেশনের প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল দুই ব্যবসায়ী। এসময় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর দুইজন সদস্য তাদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে ২০৫ ভরি স্বর্ণ ছিনিয়ে নেয়। পরে তাদের পাহাড়তলী রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ফাঁড়ি ইনচার্জ মেজবাহর কাছে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের বসতে বলে ওই দুই সদস্য পালিয়ে যায়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ওইদিন বিকালে মেজবাহকে আটক করে পুলিশ। পরদিন সোনা লুটের ঘটনায় মেজবাহকে প্রধান আসামি করে জিআরপি থানায় মামলাটি দায়ের করেন হাজারী গলি ঝুমুর মার্কেটের বিশ্বকর্মা বুলিয়ন দোকানের কর্মচারী পলাশ নন্দী।

এদিকে নগরীর চকবাজার এলাকায় ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি পূর্ব শত্রুতার জের ধরে চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের শিক্ষিকা অঞ্জলী দেবীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তার শ্বশুরবাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার চৌধুরী হাট এলাকায়। বাবার বাড়ি রংপুরে। তার দুই মেয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী এবং তার স্বামীও একজন চিকিৎসক। এ ঘটনার পাঁচলাইশ থানায় নিহত শিক্ষিকার স্বামী ডা. রাজেন্দ্র চৌধুরী বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এরপর মো. রেজা (৩০) নামে জঙ্গি সংগঠনের এক সদস্যকে গ্রেফতারের দাবি করেছে পুলিশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে পূবালী ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শেখ মুজিব রোড শাখা থেকে দুপুরে ব্যাংকের একটি মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্টো-চ-৫৩৪৯৭৫) ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে সীতাকুণ্ড শাখায় আসে। ওই শাখা থেকে আরও ৮১ লাখ টাকা তোলার পর দুপুর দেড়টায় দুই ব্যাংকের মোট ১ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকার দুটি বস্তা নিয়ে মাইক্রোবাসটি লালদীঘির পাড় কর্পোরেট শাখায় যাওয়ার পথে ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকার বস্তাটি উধাও হয়। এ সময় গাড়িতে চালকসহ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা ও একজন নিরাপত্তা প্রহরী ছিলেন। তবে এ সময় গাড়িতে কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন না। সাধারণত বেশি টাকা আনা-নেওয়ার সময় ব্যাংক চাইলে গাড়ির সঙ্গে পুলিশ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ব্যাংকটির চট্টগ্রাম সিডিএ কর্পোরেট শাখার সহকারি মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. তৌফিকুল রহমান সীতাকুণ্ড মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করেন সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ।
এছাড়া চলতি বছরের বাসা থেকে বের হওয়ার পর ২ মে সকালে স্থানীয়দের খবরে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের ১৮ নম্বর ব্রিজঘাটের পাথরের ওপর থেকে সানসাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসফিয়া আমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পতেঙ্গা থানা পুলিশ। পরে একই দিন সন্ধ্যায় নগরের খুলশী থানার জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি এলাকা থেকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জাকে আটক করে। এরপর তাসফিয়ার বাবা বাদী আদনান মির্জাকে প্রধান আসামি করে পতেঙ্গা থানায় ৬ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি মো. ফিরোজকেও কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
আরো জানা গেছে, চলতি বছরের ২৭ জুন সকালে নগরীর বাকলিয়া সৈয়দ শাহ রোডের ল্যান্ডমার্ক আবাসিক এলাকার লায়লা ভবনের ষষ্ঠ তলায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া স্কুলছাত্রী ইলহাম বিনতে নাছিরকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার দুদিন পর নিহত ইলহামের নানা নাসির উদ্দিন বাদি হয়ে বাকলিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর ইলহামের নিকট আত্মীয় রিয়াজুল করিম রাজুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এছাড়া চলতি বছরের ১ আগস্ট বিকালে চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবীর স্ত্রী বিবি রহিমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

নগরীর চান্দগাঁও থানার উত্তর-পশ্চিম ফরিদারপাড়া এলাকার নিজ বাসা থেকে পেছনে হাত বাঁধা অবস্থায় রহিমার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বিবি রহিমা চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ঘটনার সময় রহিমার সঙ্গে তার দুই বছর ৯ মাস বয়সী মেয়ে হৃদি ছিল। মাকে হত্যার পুরো ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী মেয়ে হৃদি। একদিন পর নিহতের মা বেদুরা বেগম অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে চান্দগাঁও থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন বলে জানা গেছে।