banner

শেষ আপডেট ১০ ডিসেম্বর ২০১৮,  ২১:৩৪  ||   মঙ্গলবার, ১১ই ডিসেম্বর ২০১৮ ইং, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

ঠিকাদারের সাথে স্বাস্থ্য বিভাগীয় প্রকৌশলীর যোগসাজশ : পেকুয়া ভবন নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম

ঠিকাদারের সাথে স্বাস্থ্য বিভাগীয় প্রকৌশলীর যোগসাজশ : পেকুয়া ভবন নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম

৬ অগাস্ট ২০১৮ | ২০:২৮ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ঠিকাদারের সাথে স্বাস্থ্য বিভাগীয় প্রকৌশলীর যোগসাজশ : পেকুয়া  ভবন নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম

মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, পেকুয়া : কক্সবাজারের পেকুয়া সরকারী হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ কাজের শুরুতেই সরকারী শিডিউল অনুযায়ী কাজ করছে না ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স কাসেম এন্ড ব্রাদার্স। মাটির নিচে ৮৫ ফুট পাইল বসাতে গিয়ে ৭ থেকে ১০ ফুট ভেঙ্গে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের বক্তব্য, পাইল তৈরি সঠিক না হলে এবং নিয়ম অনুযায়ী মাটির নিচে পোতা নাহলে ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এদিকে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণের সঠিক নিয়ম না মানলেও কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছেনা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।
অভিযোগ ঊঠেছে, পেকুয়া সরকালী হাসপাতালের ভবন নির্মাণে তদারকীর দায়িত্বে থাকা কক্সবাজার স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মোরশদ আলমকে ম্যানেজ করেই ঠিকাদারের লোকজন এ অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন।  তবে ওই প্রকৌশলী ‘ম্যনেজ’ হওয়ার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে ওই প্রকৌশলী কক্সবাজারে কর্মরত থাকার সুবাধে কোন হাসপাতালের ভবন নির্মাণ হলেও ঠিকাদারের লোকজনের সাথে অবৈধ সুবিধা নিয়ে সরকারী কাজ তদারকীতে চরম অবহেলার প্রদর্শণেরও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় ১৪ কোটি টাকারও বেশি বাজেটের পেকুয়া সরকারী হাসপাতালের ৪ তলা ভবনটি নির্মাণের জন্য গত এক বছর পূর্বে কার্যাদেশ পান চট্টগ্রামের কাসেম এন্ড ব্রাদার্স নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্টান। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদারী প্রতিষ্টান নিজেরা কাজটি বাস্তবায়ন না করে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার সাগর নামে এক ব্যক্তিকে কাজটি বিক্রি করে দিয়েছে। আর সাব কন্ট্রাকে হাসপাতাল ভবনের কাজ করতে সীমামীন অনিয়ম ও দূর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে লোহাগাড়ার বাসিন্দা সাগর ও তার লোকজন।
পেকুয়া সরকারী হামপাতালের ৩১ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ৪ তলা নতুন ভবন নির্মাণ কাজের শুরুতেই নানা অনিয়মের দেখা মিলছে। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর গণপূর্ত বিভাগের নিয়ম অনুসরণ করে ৪ তলা ভবন নির্মাণের কর্ম তালিকায় মাটি পরীক্ষা করে ৪তলা ভবনের জন্য ৮৫ ফিট করে প্রায় দুইশটি পাইল বসানোর জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশনা দেন ভবন ডিজাইনার। তবে কাজের শুরুতেই নিম্মমানের পাইল তৈরি করায় তা মাটির নিচে বসানোর ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পাইল বসাতে গিয়ে পাইলের উপরিভাগে যখন হ্যামারিং করা হয়, তখন ৮৫ ফিট পাইলের ৭ থেকে ১০ ফিট ভেঙ্গে যাচ্ছে। যে টুকু বসানো হচ্ছে, পাইলে তাতেও আবার ফাটল ধরছে। ভবন নির্মাণে কাজের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি পাইলের মাথায় ফলস ক্যাপের মাধ্যমে মাটির গ্রাউন্ড লেবেল থেকে ৩ ফুট নিচে বসানোর কথা, কিন্তু তা না বসিয়ে পাইলের মাথাগুলো মাটির গ্রাউন্ড লেবেলের উপরে রেখেই চার থেকে পাঁচ ফিট ভেঙ্গে রডগুলো হ্যাক্সো ব্লেড দিয়ে কেটে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, কক্সবাজারে উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. মোরশেদ আলমের ওসমান দাবি পাইলে ফাটল এবং ভেঙ্গে যাওয়ায় ভবনের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স কাসেম এন্ড ব্রাদার্সের ইঞ্জিনিয়ার পাইল ভাঙ্গার কথা স্বীকার করে বলেন, পাইল ক্যাপের উপরে গ্রেড ভিম দিলে ভবনটির কোনো ক্ষতি হবেনা।
কক্সবাজারের বেসরকারী ফার্মে নিয়োজিত এক প্রকৌশলী জানান, প্রত্যেক ভবনেরই মূল চাপ বহন করে পাইল, আর এক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী সঠিকভাবে পাইল তৈরি না হলে এবং সঠিক নিয়মে পাইল ড্রাইভ না করলে অবশ্যই যে কোনো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কক্সবাজারের একটি বেসরকারী পলিটেকনিক ইনষ্টিটিউটের ইন্সট্রাক্টর এ প্রসঙ্গে বলেন, ভাঙ্গা ও ফাটল যুক্ত পাইল যদি মাটির নিচে পোতা হয় তাহলে পাইলের ফাটলে পানি প্রবেশ করে রিং ও রডে মরিচা ধরে পাইলের বহন ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভবনের কাজে কর্মর একজন লেবার এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রথম অবস্থায় পাইলগুলো তৈরি করার সময় সিমেন্ট, বালু এবং পাথরের মিশ্রণে যে পানি ব্যবহার করা হয় সেই পানি হাসপাতালের মধ্যে ৬০ ফিটের মতো গভীরে বসানো একটি স্যালো টিউবয়েলের নোংরা পানি। এই পানি দিয়েই এখানকার সমস্ত পাইল তৈরি করা হয় এবং বর্তমানে এই পানি দিয়েই এখানকার সব কাজ চলছে।
পাইল ভাঙ্গার ব্যাপারে ঠিকাদারী প্রতিষ্টান কাসেম এন্ড ব্রাদার্সে নিয়োজিত এক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বলেন, পাইল ড্রাইভে বাংলাদেশের প্রতিটি ভবনের বেলায় এ ঘটনা ঘটে। এর কারণ হয়ত একটাই পাইল ড্রাইভ যখন শেষের পথে চলে আসে তখন চার পাশের মাটি কম্প্যাক্ট হয়ে যায়, যার ফলে হ্যামারিং করলে নিচের দিকে পাইল না গিয়ে উপরেই ভেঙ্গে যায়।
পেকুয়া সরকারী হাসপাতালের নয়া ভবনের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা। বর্তমানে ৩১ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ২শ’ মানুষ আউডডোর ও ইনডোরে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে এবং চার তলা বিশিষ্ট নতুন হাসপাতাল ভবনটি নির্মান হলে প্রতিদিন এ অঞ্চলের প্রায় ৪শতাধিক মানুষ চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারবে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। পেকুয়া অঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষের বহুদিনের স্বপ্ন একটি আধুনিক হাসপাতালের। অতএব ৩১ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালটির নির্মাণ কাজে যেন কোনো রকমই অনিয়ম না হয় কর্তৃপক্ষের কাছে এটাই সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবি।