banner

শেষ আপডেট ২১ অগাস্ট ২০১৮,  ১৩:০৬  ||   বুধবার, ২২ই আগষ্ট ২০১৮ ইং, ৭ ভাদ্র ১৪২৫

বিচার দুই প্রকার : ন্যায়-অন্যায়

বিচার দুই প্রকার : ন্যায়-অন্যায়

২ অগাস্ট ২০১৮ | ১৫:৪৭ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • বিচার দুই প্রকার : ন্যায়-অন্যায়
অভিযুক্ত মানেই অপরাধী নয়। এ একেবারে গোড়ার কথা। কিন্তু চটজলদি ‘বিচার’ করে দেওয়ার তাগিদে আমরা কথাটা ভুলে যাচ্ছি। ভুলে যাওয়াটাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তাই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে লাগাতার হত্যাকাণ্ডকেও অনেকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এটা আমাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের।
আবেগের আতিশয্যে আমরা অনেক সময়ই ভুলে যাই, এমনকি একজন অভিযুক্তেরও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে।
মাদক ব্যবসায়ীরা যত ঘৃণ্য অপরাধীই হোক না কেন, তাদের হত্যা করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। তাদের প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে এনে বিচার করতে হবে।
আইনসম্মতভাবে তাদের দণ্ড কার্যকর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইন ও সংবিধান মেনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালও গঠন করা যেতে পারে। কিন্তু সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আইনগত দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে হত্যা করাটা কোনো সভ্য সমাজের বিধান হতে পারে না।
সরকার অপরাধ দমনের নামে নামকাওয়াস্তে বিচারের আসর বসাতে পারে না।
অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে নিয়মিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাম করে ঘোষিত হচ্ছে মাদকের বিরুদ্ধে জিহাদ, প্রায় ফলাফল ঘোষণার ঢঙে।
আইনবহির্ভূত বিচার সম্পন্ন করার এ প্রক্রিয়াটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। যত ঘৃণ্য অভিযোগই হোক না কেন, অভিযুক্তের যে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে, নিজের বক্তব্য বলার আগেই দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড কার্যকর করা যে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন, পদ্ধতিগতভাবে এর সঙ্গে জঙ্গলের পশুকুলের বিধানের সঙ্গে বিশেষ তফাত নেই, এ একটি বিশেষ বিষয়ে সেটা আমরা খেয়াল করছি না।
মানবাধিকার বিষয়টিই এ ক্ষেত্রে নজর এড়াচ্ছে, সম্ভবত উৎসাহের কারণেই। যেটা আরও উদ্বেগজনক সেটা হলো, এতদিন যে অ্যাক্টিভিস্টরা রাষ্ট্রের সব রকম নখদাঁত ওঁচানোর বিরুদ্ধে মানবাধিকারের এই সূত্রগুলো নিয়ে প্রান্তিকের অধিকারের পক্ষে সওয়াল করতেন, তারাই আজ টেবিলের উল্টো দিকে, অভিযোগকারীর ভূমিকায়। এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে নিশ্চুপ।
তারাও বোধহয় ‘বেশ হয়েছে’ ভাবনারই অংশীদার। ফলে অভিযুক্তের অধিকার নিয়ে বলার লোক আর নেই।
এটা নিঃসন্দেহে চিন্তার বিষয়। অপরাধ যতই নৃশংস হোক, অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার পেছনে যতই মহৎ আদর্শ বা যৌক্তিক দাবি-দাওয়া থাকুক, তাতে করে অপরাধীর অধিকার চলে যায় না। অপরাধের বিরুদ্ধে বলা আর অপরাধীর অধিকারের পক্ষে বলা, এ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এসব আমরা জানি। নৃশংসতম অপরাধের ক্ষেত্রেও অভিযুক্তের মানবাধিকার আছে, বিচারের আগেই পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না, সে-ও আমাদের অজানা নয়। তাহলে এই বিস্মরণ কেন? আমরা নিজেরা অভিযোগকারীর দলে বলে? বিচারের পরে অভিযুক্তের কঠোরতম সাজাই হতো, সেটা কাম্যও, কিন্তু তার আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় এই নীরবতা কেন? চটজলদি বিচারের আশায়?
অবৈধ মাদক ব্যবসা আমাদের সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি বিষয়। এর প্রতিকার দরকার। মাদক ব্যবসায়ীদের সমাজ থেকে উচ্ছেদ প্রয়োজন। তাদের চটজলদি বিচার চাইবার পক্ষে অনেক যুক্তি আছে। কিন্তু বিষয়টা ওখানেই তো শেষ হচ্ছে না, এই চটজলদি বিচার সেরে ফেলার আকাঙ্ক্ষা সর্বত্র। তুলনায় অনেক কম নৃশংস অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও সেই একই আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। অভিযোগ ওঠামাত্র, পুলিশের কাছে যাওয়ার আগেই সেরে ফেলা হচ্ছে সংক্ষিপ্ত বিচার। এবং প্রভাবশালী পোড়-খাওয়া অ্যাক্টিভিস্টরা অনেক ক্ষেত্রেই তাতে প্রত্যক্ষভাবে বা চুপচাপ থেকে পরোক্ষে স্বীকৃতির ছাপ দিচ্ছেন। এ নিয়ে কোনো রাখঢাক নেই, কোথাও টিভি চ্যানেলে বসছেন রায় দানকারীরা, কোথাও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই সওয়াল করছেন এই চটজলদি বিচারের পক্ষে। ভঙ্গিটা একই-বিচার-টিচার খুবই ঝামেলার, আসুন এখানেই শেষ করে ফেলি সব।
এ প্রক্রিয়াটি যে অতীব গোলমেলে, সে আমরা জানি। এর দায়, নিঃসন্দেহে, অনেকাংশেই প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার ঢিমে-তেতালার। এখানে তদন্ত হতে মাস গড়ায়, অপরাধীদের আদৌ চার্জশিট দেওয়া হবে কি না, কেউ জানে না, শুনানি শেষ হতে বছর গুনতে হয়, আর অন্তিম ফললাভ হতে যুগাবসান হতে পারে। প্রশাসনের এ শ্লথগতি, এবং অনেক সময় প্রভাবশালী অপরাধীকে আড়াল করার যে প্রবণতা, তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি শক্তিশালী অস্ত্র হতে পারে। অনেক ঘটনার ক্ষেত্রেই আমরা দেখি তপন সিংহের আতঙ্ক সিনেমার মতো, ‘মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি’-র ঢঙে তদন্তের খাতা বন্ধ করে দেয় পুলিশ।
কাজেই দায় তো পুলিশেরই। যদি পুলিশ ও প্রশাসনের ধৈর্য না থাকে, চটজলদি বিচারের নামে বন্দুকযুদ্ধকেই একমাত্র মহৌষধ মনে করে, তাহলে তো মানবাধিকার ও আইনের শাসনের বারোটা! কীসের তাড়নায় এটা করা হচ্ছে? যত মহৎ উদ্দেশ্যের জন্যই করা হোক না কেন, এ চটজলদি বিচার প্রক্রিয়া এক ধরনের ক্যাঙারু কোর্টেই রূপান্তরিত হচ্ছে।
এভাবেই চটজলদি বিচারের আশায়ই এক দল মানুষ চোর সন্দেহে খুঁটিতে বেঁধে ফেলে আর একজন মানুষকে, যাকে আমরা গণপিটুনি বলি। সমস্যার গভীরে নজর দেওয়ার বদলে এ শুধু চটজলদি কিছু মুণ্ডু কেটে নেওয়ার পদ্ধতি। হিংসার জবাবে আর এক দফা প্রতিহিংসা। অন্তহীন চক্রে পুরো ন্যায়বিচার ব্যাপারটিই ক্রমশ উহ্য হয়ে যেতে পারে এরকম আশঙ্কা হয়। আশঙ্কা হয়, শত একরামুলের পরিবারের করুণ অশ্রুর তোড়ে এ মাদকবিরোধী অভিযানের সাফল্য ভেসে না যায়।
মনে পড়ছে ইংরেজ ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্সের লেখা টেল অব টু সিটিজ উপন্যাসের কথা। এর শেষ দৃশ্যের নারীরা শান্ত মনে উল বুনতে বুনতে কাটা মুণ্ডু গোনেন। আমরাও যেন শান্ত হয়ে প্রতিদিন কেবল লাশ গুনছি!
লেখকঃ চিররঞ্জন সরকার (লেখক ও কলামিস্ট)।