banner

শেষ আপডেট ২১ অগাস্ট ২০১৮,  ১৩:০৬  ||   বুধবার, ২২ই আগষ্ট ২০১৮ ইং, ৭ ভাদ্র ১৪২৫

বাজেটে কৃষি ও কৃষক অবহেলিত

বাজেটে কৃষি ও কৃষক অবহেলিত

১ অগাস্ট ২০১৮ | ১৫:৩৯ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • বাজেটে কৃষি ও কৃষক অবহেলিত
কবি বলেছেন, ‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা/দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।/দধীচি কি তাহার চেয়ে সাধক ছিল বড়?/ পুণ্য অত হবে নাক সব করিলে জড়।/ মুক্তিকামী মহাসাধক মুক্ত করে দেশ/ সবারই সে অন্ন জোগায় নাইকো গর্ব লেশ।/ব্রত তাহার পরের হিত, সুখ নাহি চায় নিজে,/রৌদ্র দাহে শুকায় তনু, মেঘের জলে ভিজে।/আমার দেশের মাটির ছেলে, নমি বারংবার/তোমায় দেখে চূর্ণ হউক সবার অহংকার।’
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, কবির এ বাণী আমরা মনেপ্রাণে গ্রহণ করিনি। তাইতো আমাদের দেশের কৃষকরা এখনো সবচেয়ে অবহেলিত। বিশ্বকাপ ফুটবলের ডামাডোলে এ বছর বাজেট-আলোচনা একেবারেই আড়ালে চলে গেছে।
এ বাজেটে কৃষক ও কৃষি অবহেলিতই রয়ে গেছে। অথচ কোথাও কৃষক, কৃষি অর্থনীতি কিংবা চাষি নিয়ে তেমন নজরকাড়া কোনো বিতর্ক নেই। এখনকার উন্নয়নের প্রায় সবটাই কঠিন বস্তুর মাপকাঠিতে নির্ধারিত- কত রাস্তা, কত সেতু, কত হাসপাতাল-বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় কিংবা মেট্রোরেল। প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের মুখে খাদ্য জোগানোর দায়িত্বে থাকা অগণিত কৃষক আজও এ উন্নয়নের ঢক্কানিনাদে দর্শকমাত্র।
কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে এবং উন্নত বীজের সহজলভ্যতায় কৃষক একই জমিতে আরও বেশি ফসল ফলাতে পারছেন-যেমন উত্তরবঙ্গের ভুট্টা কিংবা আলু চাষি। কিন্তু লাভজনক দাম মিলছে না। দাঁও মারছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। কৃষক কখনই তার ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না। ফলে হতাশার সাগরে নিমজ্জিত কৃষকরা কোনো সান্ত্বনা খুঁজে পান না।
এখনো বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে এবং মোট শ্রমক্ষম মানুষের শতকরা ৪৭.৫ ভাগ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত আছে, তথাপি লক্ষণীয়, জিডিপিতে কৃষির অবদান দিন দিন কমছে। ’৮০র দশকের শুরুতে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ছিল ৩৩.০৭ শতাংশ, ’৯০র দশকে তা নেমে আসে ২৯.২৩ শতাংশে এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান মাত্র ১৪.৭৫ (সূত্র : কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওবেসাইট)।
এটি একদিকে যেমন আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনকে নির্দেশ করে তেমনি এটাও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে এখানে উদ্বৃত্ত শ্রম জমা পড়ে আছে। প্রচ্ছন্ন বেকারত্বের হার এখানে অনেক বেশি। উদ্বৃত্ত শ্রমকে উৎপাদনশীল কাজে লাগানোর এবং কৃষিতে বর্ধিত বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ২০১৮-১৯ এর প্রস্তাবিত বাজেটেও কৃষি খাতে কোনো ইতিবাচক বার্তা নেই।
এ বছর বাজেটের আকার বাড়লেও সে তুলনা বাড়েনি কৃষি বাজেট। ফলে বাজেটে কৃষি খাত অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা না গেলেও আগামী দিনে কৃষিতেই শুধু নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিসহ জনজীবন বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেশের প্রধান এ উন্নয়ন খাতে বাজেটে কেন বিমাতাসুলভ বৈষম্য করা হয়েছে, তা বোধগম্য নয়।
২০১৮-১৯ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে আগের বছরের চেয়ে কৃষিতে বরাদ্দ বেড়েছে ৩ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।
আর নতুন অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় হিসেবে, মোট ১৩ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল।
তবে বাড়েনি কৃষিভর্তুকি। প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে ভর্তুকি পরিমাণ কমেছে কিছুটা। আগে ৯ হাজার ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা।
ফলে বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের ক্রমহ্রাসমান ধারা বজায় থাকল।
তবে কৃষি খাতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে গবেষণার মাধ্যমে ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছর ফসলের ২২টি নতুন জাত ও ২১টি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের মাধ্যমে জমির স্বাস্থ্য রক্ষা ও ফসল উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ দেশের কৃষকরা ঘামঝরা পরিশ্রম করে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য জোগান দিয়ে চলছে। কিন্তু তাদের ঘামঝরা পরিশ্রম থেকে যতটুকু উৎপাদন ও আয় হওয়া উচিত তা তারা পাচ্ছে না। এমনকি ফল-ফসলের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষকরা হারাচ্ছে তাদের উৎপাদিত ফসলের বিশাল অংশ। তাই, সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ নিশ্চিত করতে দরকার গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়ন। লাভজনক ফসল উৎপাদন, বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য দরকার সমবায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা। কৃষকের স্বার্থে উদ্বৃত্ত খাদ্য থেকে সঠিক মুনাফা লাভের জন্য বৈদেশিক বাজার তৈরি করতে হবে। কৃষি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও লাভজনক করার জন্য কৃষিবিদ, কৃষি বিজ্ঞানী, নীতি বিশেষজ্ঞ, সম্প্রসারণকর্মীসহ সবাইকে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর জন্য চাই সঠিক কর্মপরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা।
আমরা যতি বিগত বছরের বাজেট দেখি, কোথাও বা একটু বাড়ে, কোথাও বা একটু কমে। যেহেতু বাজেট প্রণয়নে আমলারা প্রধান ভূমিকা পালন করে, সেহেতু তারা তাদের স্বার্থের বাইরে বিন্দুমাত্র যেতে চায় না।
সুতরাং ব্যবসায়ীদের সন্তুষ্ট রাখা এবং রাজনৈতিক সরকারের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ তারাই করে থাকে। সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় কোন কোন বিষয়ের ওপর অতিরিক্ত কর বসিয়ে মূল্য বৃদ্ধি করা এবং বাজেট পাশের সময় আবার কর প্রত্যাহার বা হ্রাস করে ফেলে। এতে কারও কারও ভাগ্যোন্নয়ন ঘটে। জনগণও সেই দ্রব্যটির বাড়তি মূল্য দিয়ে চলে।
কর প্রত্যাহার বা হ্রাস পেলেও সেই দ্রব্যটির মূল্য কমে না। এ অর্থ খায় কে? আর শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে সামনে রেখে বাজেট তৈরি করা মানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতারণা করা। অথচ আমার ক্ষেতমজুর ও বর্গাচাষিরা যে পশ্চাদপদ জীবনযাপন করে সেখান থেকে বেরুতে পারার উপায় খুঁজে পায় না। এ অমানবিক বৈষম্য আর কত দিন সহ্য করতে হবে?
প্রতিবছর বাজেটে কৃষি খাতকে অবহেলা করা হচ্ছে, এ অবস্থা চলতে থাকলে একটা সময় বর্ধিত জনসংখ্যা ও খাদ্য সংকট মোকাবেলা সরকারে জন্য কঠিন হবে। এ বাস্তবতাকে মাথায় রেখে প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ বাজেটের ওপর পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ, সংযোজন-বিয়োজনের করে অর্থনীতির মুক্তির সোপান কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হোক।
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, গেল ৫টি অর্থবছরে তুলনামূলক বাড়েনি কৃষিতে বরাদ্দ ও ভর্তুকির পরিমাণ। বরাবরই অবহেলিত কৃষি গবেষণা। কৃষির উন্নয়নে যাকে অন্তরায় হিসেবেই দেখছেন গবেষকরা।
বর্তমানে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৪ শতাংশের বেশি। এ অবস্থায় ফসল সংরক্ষণ ও বাজার অবকাঠামো তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ কৃষি অর্থনীতিবিদদের। উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড় ও যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত করার দাবিও তাদের।
বৈদেশিক দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শে গৃহীত নীতির কারণে অবাধ বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের সাধারণ কৃষক। উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি ও পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা কৃষি থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
এমতাবস্থায় সরকারের উচিত এ দেশের প্রান্তিক কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সরে এসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের স্বার্থে প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন করা এবং সে অনুযায়ী কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে বেশকিছু দাবি তুলে ধরা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে : ধান-চাল ক্রয়ে বাজেট বৃদ্ধি করা এবং উপসহকারী কর্মকর্তার মাধ্যমে তালিকা প্রণয়ন করে কৃষকের নিকট থেকে সরাসরি ক্রয় করা; সেচ, সার, বীজসহ সব ক্ষেত্রে প্রদেয় ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের নিকট পৌঁছানো; কৃষকের জন্য পল্লী রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা; কৃষিভিত্তিক শিল্প-কলকারখানা স্থাপন; জৈব প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বাজেট বৃদ্ধি করা; বিএডিসিকে শক্তিশালী ও সক্রিয়করণে বাজেট বৃদ্ধি; কৃষক আদালত গঠন করা; কৃষি বীমা চালু করা; মৌসুমভিত্তিক সুদবিহীন কৃষিঋণ প্রদান; ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে কৃষি মার্কেট স্থাপন এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে হিমাগার স্থাপন।
উল্লিখিত বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেওয়া দরকার। আমরা দেখেছি কৃষির উন্নয়ন ঘটলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন বা নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে। বেকারত্বের সংখ্যা কমে এবং দারিদ্র্যও কমে আসে। কাজেই কৃষি খাতে আরও বেশি বাজেট বৃদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি খাতে যদি বাজেট বরাদ্দ বেশি থাকত তাহলে আমরা মানুষের কল্যাণ সাধন বা উন্নত জীবনযাপনে আরও সফলতা দেখতে পেতাম।
আমাদের দেশের অনেক কৃষক হাজার অনিশ্চয়তাকে সঙ্গে নিয়ে ফসল ফলায় ও লোকসানে ঋণগ্রস্ত হন। এ যেন ‘প্রোডিউস অ্যান্ড পেরিশ’-এর আশ্চর্য সমাপতন! আসন্ন নির্বাচনের বেহিসাবি রাজনীতির ডামাডোলে কৃষকদের দুর্দশা নিয়ে দু’চারটি কথা বলার অবসর কোনো রাজনৈতিক দলের আছে বলে মনে হয় না।
কেননা আমাদের দেশে এখন সব রাজনৈতিক তৎপরতাই ক্ষমতামুখী। তাই কৃষি ও কৃষকের সমস্যার গভীরে যাওয়ার সময় কিংবা আন্তরিকতা অস্তমিত। কৃষক অনন্যোপায়, কেননা তাকে তো ফসল ফলাতেই হবে, কারণ সেটাই তিনি জানেন!
লেখক: চিররঞ্জন সরকার(লেখক ও কলামিস্ট)।