banner

শেষ আপডেট ১০ ডিসেম্বর ২০১৮,  ২১:৩৪  ||   মঙ্গলবার, ১১ই ডিসেম্বর ২০১৮ ইং, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও যন্ত্রণা

বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও যন্ত্রণা

৩১ জুলাই ২০১৮ | ১৪:৪৭ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও যন্ত্রণা
নির্বাচনী বছরে সবাইকে তুষ্ট রাখার নীতি নিয়ে আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘সমৃদ্ধ আগামী পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ নাম দিয়ে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বিশাল সাইজের বাজেট উপস্থাপন করেছেন।
কিন্তু ‘সমৃদ্ধ আগামী পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ কতটুকু এগোতে পারবে, আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অবস্থাই বা তাতে কতটুকু বদলাবে- সে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
তবে বর্তমানে সামগ্রিক অর্থনীতির চালচিত্র দেশের গরিব মানুষের জন্য খুব একটা অনুকূল নয়। আমদানি ব্যয় যে হারে বেড়েছে, সে তুলনায় রপ্তানি আয় না বাড়ায় বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পণ্য ও সেবা উভয় বাণিজ্যেই ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে। একইসঙ্গে রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি রেমিটেন্স প্রবাহের ধীরগতির কারণে বৈদেশিক লেনদেনের হিসাব ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি রেমিটেন্স কিছুটা বাড়লেও যে হারে কমেছে সেই হারে বাড়েনি। বাণিজ্য ঘাটতির এ নেতিবাচক ধারা সার্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ এটি অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের (রিজার্ভ) ওপর প্রভাব পড়বে; বিনিময় হার (এক্সচেঞ্জ রেট) বেড়ে যাবে। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন বাড়বে। সর্বোপরি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি খুব একটা অনুকূল নয়।
সরকারিভাবে বলা হয়েছে, আমাদের দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় এখন ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার। কিন্তু এটা কি দেশের মানুষের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলক? এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যাদের প্রতি মিনিটের আয় ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলারের বেশি। আবার এমন অনেকেই আছেন যাদের কয়েক বছরের আয়ও ঐ পরিমাণ নয়।
বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। বিশ্বের যে দশটি দেশ উচ্চমাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল কি সবাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে? বিত্তবান এবং বিত্তহীনের আর্থিক ব্যবধান বা বৈষম্য দ্রুত বেড়ে চলেছে। স্বাধীনতার পর আর কখনই এখনকার মতো বিত্তবান এবং বিত্তহীনের বৈষম্য এতটা প্রকট আকার ধারণ করেনি। সমাজে একটি শ্রেণি নানাভাবে বৈধ-অবৈধ পথে বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলছে। আর বৃহত্তম জনগোষ্ঠী দিন গুজরানের উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। সমাজে ভোগব্যয় এবং ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ একই অবস্থায় থেকে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না। বাড়তি কাজ করে, দুই নম্বরী পথ ধরে কেউ কেউ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাচ্ছেন, কেউবা বিদেশে পাড়ি দিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে বাম্পার ফলন ফলিয়েও ধানের দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। এ অবস্থায় বেদনা আর হাহাকার বেশি কথায় পরিণত হচ্ছে।
আমাদের অর্থমন্ত্রী যাই বলুন, বাস্তবতা হলো, বাজেট ঘোষণার পর আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। কোনো কারণ ছাড়াই বাড়ে! যেমন বাজেট ঘোষণার পর আলু-পটল-ঝিঙের দাম বাড়ার কোনো কারণ না থাকলেও তা বাড়ে। জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত কেন বাড়ছে, কী পরিমাণ বাড়ছে, এতে সরকারের ভূমিকা কতটুকু, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়া বা কমার প্রভাব কতটুকু আর ব্যবসায়ীদের কারসাজি কতটুকু, এই দাম বাড়ার ফলে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো, এর পরিণামই বা কী-এসব বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে, এখনো হচ্ছে, আশা করা যায় ভবিষ্যতে আরও অনেক হবে। কিন্তু তাতে পরিস্থিতি বদলায়নি; হয়তো বদলাবেও না। বাজারদর এখনো চড়া। গত দু’-তিন বছরে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার কমলেও তুলনামূলকভাবে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতির হার বেশি রয়েছে।
সর্বশেষ সরকারি তথ্যেও এটা দেখা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, গত এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশে দাঁড়ালেও খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ শতাংশের ওপরে। এর মূল কারণ এক বছর ধরে চালের উচ্চমূল্য।
গত বছর জুনে দেশের কমবেশি ৭০ শতাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের দাম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। এক কেজি মোটা চাল বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৫২ টাকায়। দাম কিছুটা কমলেও বর্তমানে এক কেজি মোটা চাল ৪০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। শ্রেণিভেদে এক কেজি সরু চালের দাম ৫৬ থেকে ৬৫ টাকা। চাল ছাড়াও শাকসবজি, মাছ, মাংস, মসলা, ফলমূল ইত্যাদির দাম বেড়েছে।
একটি পরিবারে মাসিক যে ব্যয় হয়, তার প্রায় অর্ধেক চলে যায় খাদ্য সংগ্রহে। বিবিএসের প্রাথমিক হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (এইচআইইএস) ২০১৬ মোতাবেক জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের মাসিক মোট ব্যয়ের ৪৭ দশমিক ৭০ শতাংশ খরচ হয় খাদ্যে। গ্রামাঞ্চলে খাদ্যে ব্যয় হয় ৫০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে খাদ্যে ব্যয়ের পরিমাণ ৪২ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
এর অর্থ দাঁড়ায়, গ্রামে বসবাসকারী কমবেশি ৭০ ভাগ মানুষ খাদ্যে বেশি ব্যয় করে। আর সাধারণ মানুষ খাদ্যে যে ব্যয় করে, তার কমবেশি ৮০ শতাংশ চালে। বিআইডিএসের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী খাদ্য-মূল্যস্ফীতি বাড়লে ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ হতদরিদ্র পরিবারই তখন চালের ভোগ কমিয়ে দেয়। দরিদ্র পরিবারের বেলায় এ হার ৬৬ শতাংশ। তাই মোটা চালের দাম উচ্চহারে বৃদ্ধি পেলে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়ে।
শুধু দরিদ্র ও হতদরিদ্ররা নন, চালের দাম বৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরাও, বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট। চালের দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের মাছ, মাংস, ডিম, দুধ অর্থাৎ আমিষ জাতীয় খাবার কেনা অনেকটা কমিয়ে দিতে হয়। এতে তাদের পরিবারে, বিশেষ করে শিশু ও মহিলাদের পুষ্টির অভাব ঘটে। এতে অবনতি ঘটে তাদের স্বাস্থ্যের। তাছাড়া এসব পরিবারকে কমিয়ে দিতে হয় শিক্ষা খাতে ব্যয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। সংকুচিত করতে হয় তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই খাদ্যে, বিশেষ করে চালের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের কাছে ভীতি হয়ে দেখা দেয়।
এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় কার্যকর কোনো নীতি-পদ্ধতি চোখে পড়ছে না। সরকার চলতি অর্থবছরের যে বাজেট ঘোষণা করেছে সেখানে গোঁজামিলই দেখা গেছে বেশি। দুর্নীতি দমন, অপচয় রোধ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কোনো নীতি চোখে পড়েনি। বাজেটে যে বিশাল ঘাটতি রেখে দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে সার্বিক মুদ্রানীতির সমন্বয় কী করে হবে- এ বিষয়েও নেই কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
চোর-জোচ্চর-বাটপাড়বান্ধব দেশ এটা। এখানে নানা ফিকিরে রাতারাতি বড়লোক হওয়া মানুষগুলোর ওপর ব্যাপক কর চাপানোর কাজটি কখনই করা হয় না। তাদের সাত খুন মাফ। হঠাৎ বড়লোক হওয়া কালো টাকার মালিকদের ধরার জন্য এখানে নেই কোনো কার্যকর ও সৃজনশীল উদ্যোগ।
উল্টো তাদের কালো টাকা সাদা করার জন্য নানা প্রক্রিয়া-পদ্ধতি বাতলে দেওয়া হয়। কিন্তু কর চাপানো হয়, বেশিরভাগ পরোক্ষ কর, গরিব মানুষের ওপর। ভ্যাট ইত্যাদি করের হার যত বাড়ে, জিনিসপত্রের দাম তত বাড়ে। জিনিসপত্রের দাম বাড়লে ব্যবসায়ী, পুঁজিপতিদের পোয়াবারো। গরিবদের সর্বনাশ। এ সর্বনাশের অবকাঠামো গত কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে।
এদিকে সঞ্চয়কারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, সঞ্চয়কৃত আমানত, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদির ওপর কর চাপানো হচ্ছে। তাহলে সঞ্চয় কে করবে? সঞ্চয় না হলে দেশের উন্নতিই-বা কীভাবে ঘটবে? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর মিলবে, বিদেশিরা এসে আমাদের এখানে বিনিয়োগ করবে। এর ফলে আমাদের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য সব কিছুর প্রসার ঘটবে। কিন্তু সেই বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের দেশে হয় না। বিনিয়োগকারীদের পায়ে তেল মেখে, চা-সিগারেট খাইয়েও মন ভেজানো যায় না। গত দুই যুগ ধরে নানা চেহারা, চরিত্র ও পরিচয়ের কর্তাব্যক্তিরা কত কান্নাকাটি করলেন, নতজানু হয়ে বসে বললেন- প্রভুগণ আমরা আপনাদের গোলাম, একটু দয়া করুন, একটু প্রসাদ দিন, আল্লাহর দোহাই একটু তাকান; কিন্তু বিদেশি পুঁজিপতিদের পাষাণ হৃদয় তাতে গলে না।
এ দেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের অনুকূল পরিবেশও সৃষ্টি হয় না, কাজেই বিদেশি বিনিয়োগও এদেশে আসে না। যতটুকু যা আসে তাতে বড়লোকের সম্ভোগ আর স্বার্থ সাধনেই সব ব্যয় হয়ে যায়। দেশের বেশিরভাগ মানুষ, হতদরিদ্র মানুষ, তারা কেবল প্রতিশ্রুতি আর বক্তৃতা গিলেই সময় পার করে দেন। তাদের জীবনে আশাভঙ্গের যন্ত্রণা আর বঞ্চনা ছাড়া অন্য কোনো যৌতুক নেই।
কাজেই জুন-জুলাই মৌসুমটা শুধু বেশি কথা বলার ঋতু নয়, নিদারুণ যন্ত্রণার কালও বটে!
লেখকঃ চিররঞ্জন সরকার (লেখক ও কলামিস্ট)।