banner

শেষ আপডেট ২০ অগাস্ট ২০১৮,  ২১:৫৩  ||   মঙ্গলবার, ২১ই আগষ্ট ২০১৮ ইং, ৬ ভাদ্র ১৪২৫

এখনো পানির নীচে পুরো চট্টগ্রাম শহর, জন দূর্ভোগ চরমে: যানচলাচল ব্যাহত

এখনো পানির নীচে পুরো চট্টগ্রাম শহর, জন দূর্ভোগ চরমে: যানচলাচল ব্যাহত

১২ জুন ২০১৮ | ২০:৪৩ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • এখনো পানির নীচে পুরো চট্টগ্রাম শহর, জন দূর্ভোগ চরমে: যানচলাচল ব্যাহত

ক্রাইম প্রতিবেদক : এখনো পানির নীচে ডুবে আছে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম শহর। গত রবিবার সকাল থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত তিন দিনের ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পুরো চট্টগ্রাম শহর জলমগ্ন হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নগরীর আগ্রাবাদ, হালিশহর, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ,পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোড,চকবাজার, বাকলিয়া, বাদুর তলা, শুলকবহর, বহদ্দার হাট এলকায় এখনো কোথাও হাটু কোথাও কোমর সমান পানি জমে রয়েছে। এতে সড়ক ও অলি গলিতে কাদা জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। যানবাহন চলাচলে মারাত্বক বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। পথচারী ও ঈদ বাজার করতে লোকজনের চরম ভাবে দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মাঝারী থেকে ভারী বৃষ্টি কারণে নগরীর এসব এলাকায় পানি জমে জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অন্য দিকে নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা ও দেখা দিয়েছে। এতে পাহাড়ের পাদদেশে বাসবাসকারী নিম্ম আয়ের মানুষরা মৃত্যূ ঝুকির আতঙ্কে রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে ,ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসে দুর্ঘটনা ঠেকাতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় গত রবিবার সকাল থেকে নগরীর বাটালি হিল, মিয়ার পাহাড়. একে খান ও আমিনজুট মিল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির রহমান সানি জানান, প্রশাসনের নির্দেশনায় মাইকিং করে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের সরে যেতে বলা হয়েছে। যেহেতু ভারী বর্ষণ হচ্ছে, সেহেতু পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। যেকোন দুর্ঘটনা ঠেকাতে আগাম প্রস্ততি হিসেবে তাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে।’
সুত্রমতে, নগরীর লালখান বাজার, মতিঝর্না, হামজারবাগ নবীনগর পাহাড়, বার্মা কলোনি পাহাড়, এনায়েত বাজার জামতলা বস্তি, পলোগ্রাউন্ড পাহাড়, বাটালী হিল, জিলাপী পাহাড়, নাসিরাবাদ পাহাড়, এ কে খান পাহাড়, চন্দ্রনগর পাহাড়, রউফাবাদ পাহাড়, কুসুমবাগ, জালালাবাদ, সেনানিবাস, বায়েজিদ বোস্তামী, বন গবেষনাগারের পেছনে, খুলশী, ষোলশহর, ফৌজদারহাট, কুমিরাসহ বিভিন্ন এলাকায় চট্টগ্রামের অধিকাংশ পাহাড়ে বৈধ কিংবা অবৈধভাবে শতাধিক বস্তি গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় প্রায় ৩ লাখ লোক বাস করে বলে বিভিন্ন সংস্থার জরিপে জানা গেছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জানান, চট্টগ্রাম নগরীর ছোট-বড় ১৩টি পাহাড় চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইতোমধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করে পানি ও বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।
বার বার মাইকিং করে তাদেরকে সরে যাবার জন্য নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড় ধসসহ যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে জেলা প্রশাসন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ স্বেচ্ছাসেবী ও উদ্ধারকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. মমিনুর রশিদ জানান, চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজারের মতিঝর্ণা এলাকার পাহাড়সমূহকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে অবৈধ বসতি স্থাপন করা বসবাসকারীদের সরিয়ে নিয়েছিল জেলা প্রশাসন। কিন্তু অভিযানের পর আবারও সেখানে ফিরে এসেছে অধিকাংশ লোকজন। প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নগরীর ১৩টি ঝুঁকিপুর্ণ পাহাড় ও টিলার মধ্যে ১১টিতে সবচেয়ে বেশি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে।
লালখান বাজারের মতিঝর্ণা এবং বাঘঘোনা এলাকা ছাড়াও পাহাড়তলীর একে খান শিল্প গোষ্ঠীর পাহাড়, লেকসিটি পাহাড়, কৈবল্যধাম বিশ্বকলোনি, আকবর শাহ আবাসিক এলাকার পাহাড়, সিটি করপোরেশনের পাহাড়, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট একাডেমি পাহাড়, জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়, বাটালি হিল পাহাড়, এবং নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড় ও ফয়’স লেক পাহাড়ে প্রায় সাড়ে ৪ শত পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে।
প্রসঙ্গত, বিগত ১০ বছরে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার পাহাড় ধসে অন্তত দুই শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। শুধু ২০০৭ সালের ২১ জুন নগরীর সেনানিবাস সংলগ্ন কাইচ্ছা গোনাসহ সাতটি এলাকায় পাহাড় ধস ও জলাবদ্ধতায় ১২৭ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটে।
আজ ১২ জুন মঙ্গলবার সকালে সরজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নগরীর প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, ২ নম্বর গেট, হালিশহর, বাদুরতলা, আগ্রাবাদ, চাক্তাই, বাকলিয়া, পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোড, শুলকবহর সহ প্রায় এলাকা পানিতে তলিয়ে আছে।
আজ সকাল পর্যন্ত বৃষ্টির চাপ থাকায় নগরের নিম্নাঞ্চল হাঁটু থেকে কোমর সমান পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনায় পড়তে হয় ঈদের বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাদের। বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার কারণে তীব্র যানজটেরও সৃষ্টি হয়।
নগরের চকবাজার বাজারের দোকানদার নাসির উদ্দিন জানান, ভারী বর্ষণে পুরো চকবাজার এলাকা ডুবে যায়। সন্ধ্যার দিকে হাঁটু সমান পানি হলেও রাত পেরিয়ে সকালে কোমর পরিমাণ পানি জমে যায়।
লাগাতার বৃষ্টিতে বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, হালিশহর এলাকায় বেশিরভাগ বাসার নিচ তলা তলিয়ে যায়। ফলে এসব এলাকার বাসিন্দাদেরকে নিদারুণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
এদিকে আজ সকালে চকবাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে , ধনিরপুলের পরে কেবি আমান আলী সড়ক চাক্তাই খালের পানিতে ডুবে গেছে। কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে টইটম্বুর খালটি রাস্তার সঙ্গে মিশে গেছে। এ সড়কে পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। ফলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনাও। বাধ্য হয়ে কোমরপানি ভেঙে যাতায়াত করতে হয় এলাকার বাসিন্দাদের। নতুন অনেকে বুঝতে না পারে পড়ে যান খালে। এতে দুর্গতি বাড়ে তাদের। কেউ যাতে খালে পড়ে না যায় সেজন্য চাক্তাই খালের পাড়ঘেঁষে বাঁশ ও লাল ফিতা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কাগজ-কলমে এটিকে খাল বলা হলেও, জলাশয়ের চেহারা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে। বর্জ্যে ভরাট হয়ে গেছে খালটি। এখন রাস্তা আর জলাশয় বলে পৃথক কিছু নেই।
২০১৭ সালের জুলাই মাসে চাক্তাই খালে পড়ে ৮ বছরের এক শিশু মারা যায়। তাই বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে চকবাজার চাক্তাই খালের আশপাশের বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন জানান, বছরের পর বছর বর্ষার মৌসুমে চাক্তাই খাল ও পাশের রাস্তা পানিতে একাকার হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে কোমরপানি ভেঙে যাতায়াত করতে হয় এলাকার বাসিন্দাদের। নতুন অনেকে বুঝতে না পারে পড়ে যান খালে। এতে দুর্গতি বাড়ে তাদের।
চকবাজার কাঁচাবাজারের বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, বেঁচে আছি সেটি অনেক সৌভাগ্যের। যত্রতত্র বর্জ্য, রাস্তা সংস্কারের নামে খোঁড়াখুঁড়ি সব মিলিয়ে অসহ্য পরিস্থিতিতে দিন পার করতে হয় চকবাজারের বাসিন্দাদের। তার ওপর কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ডুবন্ত এলাকা। জীবন একেবারে অচল হয়ে গেছে!
একই অবস্থা নগরীর নীচু এলাকা বাদুরতলার। বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে তিন দিন ধরে পানিবন্দি বাদুরতলা এলাকাটি। সড়ক, অলি-গলিতে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে আছে। পানি ঢুকে পড়েছে অলি-গলি ছাড়িয়ে বাসা-বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকার হাজারো মানুষ। অফিসগামী লোকজন ও পথচারীরা অনেক কষ্টে এসব এলাকায় দিনাদিপাত করছেন।
জলাবদ্ধতার কারণে পবিত্র এ রমজান মাসে বাদুরতলা এলাকার শত বছরের পুরনো জঙ্গীশাহ আল কোরাইশী (র.) মসজিদে মুসল্লীরা নামাজ আদায় করতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
রিয়াদ নামে বাদুরতলা এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, বৃষ্টি হলেই এ এলাকায় পানি ওঠে যায়। অনান্য এলাকায় সড়ক সম্প্রসারণ ও উচূ করা হলেও মাজারগেটের সড়কে তেমন কোন কাজ হয়নি। যদিও মাঝে মধ্যে লোভ দেখানো নালা পরিষ্কার করা হয়। বাদুরতলা সংলগ্ন চাকতাই খালের ওপর বর্ষার আগ থেকে ব্রিজ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। ব্রিজ নিমার্ণের জন্য কাটা হয়েছে খালের পাড়। সেই পাড় দিয়ে জোয়ার পানি এলাকা ঢুকে পড়ছে।
লোকমান নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, পুরো সড়কে পানি আর পানি। লোকজন বাসা-বাড়ি থেকে বেরও হতে পারছে না। সড়কে কোমর সমান পানি জমেই আছে। সামনে ঈদ দোকানের জন্য মালামাল কিনে আনতে পারছি না। জলাবদ্ধতার কারণে আমাদের ব্যবসায়িক অনেক ক্ষতি হচ্ছে। বেচাকেনা কমে গেছে। এলাকার পানি নিষ্কাষণে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ জানান তিনি।
৮ নম্বর শুলকবহর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. মোরশেদ আলম বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। বৃষ্টি আর জোয়ার পানিতে বাদুরতলা জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। চাকতাই খালের ওপর ৩টি নিচু ব্রিজ ছিলো। যেগুলো পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতো। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে সিটি মেয়রের নির্দেশনায় সেই ব্রিজ তিনটি উঁচু করে নির্মাণ করা হচ্ছে।
একই চিত্র ব্যস্ততম আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা ও তার আশেপাশের এলাকায়। দেখাগেছে অব্যাহত বৃষ্টিপাতে এ এলাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ক্রমশ এ জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। সামান্য বৃষ্টিতে নদীতে পরিণত হয় পুরো এলাকা। জোয়ারের সময় ও বর্ষাকালে তো পুরো সমুদ্র সৈকতে পরিণত হয়।’
মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিণা বলেন বাবা সরকারি চাকরিজীবী। বাবার চাকরির সুবাদে ২০০৩ সাল থেকে বড় হয়েছেন আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে। ঈদের ছুটি কাটাতে গত সপ্তাহে এসেছেন বাসায়।
তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে এই পানির সঙ্গে বসবাস করে অভ্যস্ত আমরা। এই পানি মাড়িয়ে স্কুল-কলেজে গিয়েছি। কতবার খোস-পাঁচড়া হয়েছে তার হিসেব নেই।
মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, সরকারি কলোনি, বহুতলা কলোনি, সোনালী ব্যাংক অফিসার্স কলোনি, মা ও শিশু হাসপাতালসহ এলাকাগুলো পানির নিচে রয়েছে। আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা কলেজের প্রভাষক বিবি মরিয়মা বলেন, গত দুইদিন ধরে পানিবন্দি স্থানীয়রা।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসাপাতালের চাকুরীজীবি শহীদ রাসেল বলেন, প্রতিবছর বর্ষাকালে হাসপাতালে আগত রোগীরা সীমাহীন কষ্ট ভোগ করতে হয়। এছাড়াও জোয়ারের সময়ও হাসপাতালের নিচ তলায় পানি ঢুকে যায়। হাসপাতালের নিচতলা এখন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।আজ মঙ্গলবার দুপুর ২টায় হাসপাতালের নিচতলায় একহাঁটু পানি রয়েছে দেখা যায়। এছাড়া বহুতলা কলোনি, সোনালী ব্যাংক অফিসার্স কলোনি, সিডিএ আবাসিক এলাকায় একহাঁটু পরিমাণ পানি দেখা যায়।