banner

শেষ আপডেট ১৮ মে ২০১৯,  ২২:৩৮  ||   রবিবার, ১৯ই মে ২০১৯ ইং, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

মানব দেহের বিভিন্ন রোগে উপকারী আলকুশী

মানব দেহের বিভিন্ন রোগে উপকারী আলকুশী

৯ জুন ২০১৮ | ২০:১৭ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • মানব দেহের বিভিন্ন রোগে উপকারী আলকুশী

 

আজ মহা শক্তির আধার, অজত্নসম্ভূত একটি ভেষজ উদ্ভিদ সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করছি‌।আত্মরক্ষার অসাধারন অস্ত্র সম্বল করে লতানে এই গাছটি সাধারণত লোকালয়ের বাইরে, ঝোপে ঝাড়ে প্রায় এক‌ই জায়গায় বছরের পর বছর জন্মায়।
শাঁখ‌আলু কিমবা তরুকলা সদৃশ এর পাতা ৬–১০ ইঞ্চি লম্বা, পূষ্পদন্ড নিচের দিকে মুখ করে ঝুলে থাকে। সিমফুলের মত লালচে বেগুনী ফুল সেপ্টেম্বর–অক্টোবরে ফোটে। শুঁটি ২.৫ – ৪ ইঞ্চি লম্বা, ঈষৎ বাঁকা, বানরের গায়ের রঙ সদৃশ লালচে-খয়েরী ভেলভেটের মত সূক্ষ রোঁয়ায় আবৃত। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে বীজ পূষ্ট হয়, শুঁটি পাকে। এই সময় রোঁয়াগুলো খুব সহজেই শুঁটির গা থেকে আলগা হয়ে বাতাসে উড়তে থকে। ফল, গাছের ধারে কাছে যাওয়াই দূষ্কর হয়ে পড়ে। বীজ চ‍্যাপ্টা, গোলাকৃতি, হলদে পাটকিলে খয়েরী রঙের ওপর বহুবর্ণে রঞ্জিত, মুখের কাছটা গাঢ় খয়েরি আথবা কালো।শুঁটি ফেটে মাটিতে ঝরে পড়বার পর সামান্য বৃষ্টিতেই অঙ্কুরোদ্গম হয়। বীজ সংগ্ৰহে এই সময়টা খুব‌ই গুরুত্বপূর্ণ।
আলকূশীর বৈজ্ঞানিক নাম Mucana pruriens Linn., Synoname. Mucana pruritus, ইংরাজীতে Cowhage, বাঁকুড়া–মেদিনীপুরে এর নাম নিঙ্গুশ, উড়িষ্যা ও সংলগ্ন অঞ্চলে – নেঙ্গুচ্, হিন্দিতে – কৌঞ্চ, গুঞ্জা, উপজাতীয়রা বলেন – আলকূশি, ইতিকা। ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতিতে আলকূশি বীজকে বলে – তুখ্মে কোঁচ।
আয়ূর্বেদে আলকূশীর ব্যবহারঃ
বাগভটঃ বীজ ভেঙ্গে ডালের মত রান্না করে ওপরের জলটা নিয়মিত পান করলে ও পাতা শাকের মত রান্না করে দুপুরে ভাতের সঙ্গে খেলে রক্তপিত্ত রোগ ভাল হয়।
চক্রদত্তঃ মূলের রস ১ চামচ পরিমান সকালে খালিপেটে নিয়মিত খেলে অববাহুক রোগ ভাল হয়। এ প্রসঙ্গে জানাই, চল্লিশোর্দ্ধ বয়সে অনেকেরই একটা বা দুটো হাত‌ই ওপর দিকে ওঠাতে বা পিছনদিকে ঘোরাতে কষ্ট হয়, এ রোগের‌ই নাম অববাহুক বা Frozen shoulder.
ভাবপ্রকাশঃ মধ্যবয়সের পর মেয়েদের যোনিচ্যূতি বা যোনিবিবৃদ্ধি রোগে ( Prolapse of uterus, bulky uterus ) আলকূশীর মূল জলে ফুটিয়ে সেই জলসিক্ত কাপড়ের প্যাড নিয়মিত ধারন করলে যোনিমুখ সংঙ্কুচিত হয়ে রোগের উপশম হয়।
লোকায়ত ব্যবহারঃ
হস্তমৈথুনের কূঅভ্যাস বা অন্য কোন কারনে ঘন ঘন অসাড়ে বীর্যস্খলন, লিঙ্গশৈথিল্য, ধাতুদৌর্বল্য ও ক্ষীনবল হয়ে পড়লে ৫–৬ টি বীজ সামান্য থেঁতো করে ১০০মিঃলিঃ দুধে অল্প চিনি বা মিছরি সহ ফুটিয়ে শোবার আগে সেদ্ধ বীজ ও দুধ উভয়‌ই ১০- ১২ দিন টানা খেলে দারুন সুফল পাওয়া যায়। এ রোগে পার্শ প্রতিকৃয়াহীন এটাই সহজতম চিকিৎসা পদ্ধতি।
স্লীপদ বা গোদ রোগে ( Elephantiasis) মূলের রস ১ চামচ পরিমান সকালে খালিপেটে নিয়মিত খেলে এবং সামান্য জলসহ বাটা মূলটি স্ফীত স্থানে লাগালে রোগের উপশম হয়।
মূল চূর্ণ প্রস্রাবকারক ( Diuretic ), মূত্রকৃচ্ছতায় গোলমরিচ সহ সেব্য। শোথ রোগে ( Dropsy) এক টুকরো টাটকা মূল পায়ের গোড়ালীতে বা হাতে বেঁধে রাখলেও কিছু কাজ হয়।
আলকূশী বীজ ও অশ্বগন্ধা মূল দুটিই সমপরিমানে, ৩০০ মিলিগ্ৰাম মাত্রায়, ১ চামচ মধু সহ অথবা দুটিকে একত্রে জলে সেদ্ধ করে জলটা মধুসহ খেলে প্রাপ্ত বয়সেও যাদের যৌবনপ্রাপ্তি হয় না তারা নিশ্চিত ফল পাবেন – এটি পরীক্ষিত সত্য।
আদিবাসী চিকিৎসাপদ্ধতিতে আলকূশীর গুরুত্ব অসীম। তার কিছু এখানে জানাচ্ছি।
বাচ্চাদের তড়কায় আলকূশীর মূল পিপুল চূর্ণ সহ সেদ্ধ করে জলটা খাওয়ানো হয়। আচ্ছন্ন- অচৈতন্য অবস্থায় নুনসহ বীজসেদ্ধ জল খাওয়ানো হয়।মুখমন্ডলের পক্ষাঘাতে ( Facial paralysis ) শুঁটির রোঁয়া ঘি বা দুধের সরের সঙ্গে মিশিয়ে মলমের মত মালিশ করা হয়। ওঁরাও উপজাতিরা পাতা বেটে বাহ্যিক প্রয়োগ করেন। এতে দ্রুত ফেটে বা বসে গিয়ে ফোঁড়ার ব্যথা যন্ত্রনা দূর হয়ে যায়।
আদিবাসী বিভিন্ন সম্প্রদায়ে এর টাটকা বীজ থেঁতো করে আদা সহ জলটা ফুটিয়ে খাওয়ানো হয় ক্রিমিনাশক হিসাবে। গোদ রোগে টাটকা মূল বেটে নুন মিশিয়ে ফোলা জায়গায় লাগানো হয়। আলকূশীর বীজ মিশিয়ে “খাসুমা” নামে একরকম উত্তজক মদ তৈরি হয় যা প্রধানত কামোদ্দীপক।
আলকূশীর শুঁটির লোম ও পাকা তেঁতুলের কাই প্রতিটি ২গ্ৰাম পরিমানে একত্রে মিশিয়ে সকালে খালিপেটে কয়েকদিন খাওয়ানো হয় ফিতে ক্রিমি (Tape worm ) মারার জন্য। এ তথ্যের ফলিত প্রমান নেই। অত্যন্ত বিপদজনক এই রোঁয়া, সামান্য গায়ে লাগলেই চুলকানিতে অস্থির হতে হয়। সুতরাং আভ্যন্তরীণ ব্যবহারে দশবার ভাবা উচিৎ।
বীজচূর্ণ মধুসহ কলেরা বা ঐ ধরনের মারাত্মক পেটখারাপে ঘন ঘন খাওনো হয় এবং রোগের উপশম‌ও হয়। এছাড়াও হঠাত হাত পা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঝিন ঝিন করা, কাঁপতে থাকা ও অসাড় হয়ে য‌ওয়া এবং শেষে একেবারে জড়ভরত হয়ে যাওয়া – এক্ষেত্রে ৬–৮ টি বীজ থেঁতো করে ছাগল দুধে ফুটিয়ে অল্প মধু সহ খাওয়ানো হয় সকাল-সন্ধ‍্যা দিনে দুবার। মাসখানেক খাওয়ালেই রুগীর অনেক উন্নতি হয়।
আলকূশীর বীজ থেকে সামান্য লালচে স্বচ্ছ তেল নিষ্কাশনকরা হয়, পরিমান ৪ শতাংশের মত। বীজ থেকে নিষ্কাশিত প্রধান দুটি উপেক্ষার (Alkaloid) হল Pruriens ও Pruriens, এ ছাড়াও আরো পাঁচটি উপেক্ষার পাওয়া গেছে।
প্রসঙ্গত একটা কথা বলা একান্ত প্রয়োজন। নর ও বানর উভয়েরই আগ্ৰাসী হাত থেকে বাঁচাতে প্রকৃতি এই মহামূল্যবান ভেষজটিকে দিয়েছে সুরক্ষাকবজ, অসাধারণ এক হাতিয়ার–তীব্র চুলকানি সৃষ্টিকারী ভয়ঙ্কর রোঁয়া। সেজন্য এর মূল ও বীজ সংগ্ৰহ করা খুব‌ই কষ্টসাধ্য। এই ভেজাল-সর্বস্ব যুগে আলকূশীর বীজ ও মূল বলে বাজারে যা বিক্রি হয় তার অধিকাংশ‌ই এর‌ই প্রায় সমগোত্রীয় সবজী তরুকলার ( Mucana utilise Wall.) বীজ -মূল। মূলের পার্থক‍্য সাদা চোখে ধরা না পড়লেও বীজের পার্থক‍্য সহজেই বোঝা যায়। তরুকলার বীজ আকারে দু-তিন গুন বড়, গাঢ় খয়েরী রঙের, গায়ে অন রঙের কোন ছোপ নেই।খাদ্যগুণ সমৃদ্ধ হলেও তরুকলার এবংবিধ কোন ভেষজগুণের কথা জানা নেই। এটির পাতাও আলকূশী সদৃশ। সুতরাং আলকূশীর মূল বীজ ও পাতা যথেষ্ট নিশ্চিত হয়ে তবেই ব্যবহার করা উচিত।
সবশেষে, দূরারোগ্য এবং প্রায় অসাধ্য – আ্যলঝাইমা ও পারকিনসন্স রোগের কথা মাথায় রেখে আধুনিক ভেষজ বিজ্ঞানীরা আলকুশীর লোকায়ত চিকিৎসা পদ্ধতির থেকে কিছু আশার আলোর সন্ধান পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে একান্তভবে ভারতীয় উপমহাদেশের ভেষজ আত্মগুপ্তা–আলকূশী হয়তোবিশ্বের দরবারে ভাস্বরভাবে আলোকপ্রাপ্তা হবে।