banner

শেষ আপডেট ২০ অগাস্ট ২০১৮,  ২১:৫৩  ||   মঙ্গলবার, ২১ই আগষ্ট ২০১৮ ইং, ৬ ভাদ্র ১৪২৫

তামাক ও হৃদরোগ বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস

তামাক ও হৃদরোগ বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস

২৯ মে ২০১৮ | ১৯:৩২ |    নিজস্ব প্রতিবেদক

হৃদরোগ বিশে^র এক নম্বর মরণব্যাধি।  হৃদরোগজনিত মৃত্যু ও অসুস্থতা এতোটাই দ্রুত বাড়ছে যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে পৃথিবীব্যাপী মহামারি বা ‘প্যানডেমিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর সারা বিশ্বে ২০ লক্ষ মানুষ তামাক ব্যবহারের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। বাংলাদেশে এই মৃত্যুহার ৩০ শতাংশ, যা খুবই আশংকাজনক। কাজেই হৃদরোগ সমস্যার টেকসই সমাধান এবং জনস্বাস্থ্যের কার্যকর উন্নয়নের জন্য তামাক নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই।

 তামাক ও হৃদরোগ: বিজ্ঞান যা বলেঃ
দেহের রক্তবাহী নালিগুলো যখন কোলেস্টেরল বা চর্বি জমে সরু হয়ে আসে কিংবা বন্ধ হয়ে যায়, তখনই দেখা দেয় হৃদরোগ। গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকে থাকা নিকোটিন ও অন্যান্য প্রায় ৭০০০ উপাদান রক্তবাহী নালিগুলোর গাত্রে অযাচিত পদার্থ জমতে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করে। প্রথমত, তামাক সেবনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেহের রক্তবাহী নালিগুলো নমনীয়তা হারিয়ে শক্ত হতে শুরু করে। এর ফলে এদের সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা কমে যায় এবং কোনো কারণে রক্তপ্রবাহ বেড়ে গেলে সেগুলো ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, নিকোটিন এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান ধমনিগাত্রের এন্ডিথেলিয়াম স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে  এবং প্লাক বা অযাচিত পদার্থ জমার সুযোগ করে দেয়। তৃতীয়ত, তামাক দেহের জন্য উপকারী কোলেস্টেরল ‘হাই-ডেনসিটি কোলেস্টেরল’কে কমিয়ে আনে এবং ক্ষতিকর ‘লো-ডেনসিটি কোলেস্টেরল’কে বাড়িয়ে দেয়। চতুর্থত, রক্তপ্রবাহের গতি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ায় এবং এভাবে উচ্চ রক্তচাপ তৈরিতে সাহায্য করে। এছাড়া বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা নিকোটিন এবং কার্বন-মনোক্সাইড রক্তকণিকায় অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেয় এবং দেহের ভেতরে রক্তকণিকায় অনাকাক্সিক্ষত জটের সৃষ্টি করে। ফলে দেহের অন্যান্য অঙ্গে রক্ত এবং অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যেতে পারে বা বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
ধূমপায়ীদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় দ্বিগুণ। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি ৩ গুণ, বুকের ব্যাথা বা অ্যানজিনার ক্ষেত্রে ২০ গুণ এবং দেহের কোনো পেশিতে রক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ৫ গুণ। নিজে ধূমপান না করলেও কেবল ধূমপায়ীদের সাথে থাকার কারণে একজন ব্যক্তি যে নিকোটিন শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করেন, এতে তার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়।  ধূমপান বা তামাক সেবন ত্যাগ না করে কেবল পরিমাণ কমিয়ে আনলে হৃদরোগ এড়ানো সম্ভব, এ ধারণাও পুরোপুরি ভুল। কারণ দিনে একজন একটি সিগারেট খেলেও শেষ পর্যন্ত হৃদরোগের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ এবং স্ট্রোক বা মস্তিস্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। এছাড়া ‘লাইট’/’মাইল্ড’ কিংবা ‘লো-নিকোটিন’ নাম দিয়ে বাজারে যেসব সিগারেট বা তামাকপণ্য বিক্রয় হয়, সেগুলো সেবনেও ক্ষতি কমানো যায় না। তবে দীর্ঘদিন ধরে যারা তামাক ব্যবহার করছেন, তামাক ছেড়ে দেয়ার এক বছরের মধ্যেই তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি অর্ধেক কমে যায়৷ আর টানা ১৫ বছর কেউ যদি তামাক সেবন থেকে বিরত থাকেন, তাহলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে একজন অধূমপায়ীর পর্যায়ে নেমে আসে ।

বিশ্ব পরিস্থিতিঃ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, মৃত্যুর একক কারণ হিসেবে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদরোগের অবস্থান শীর্ষে। বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৩১ শতাংশই হৃদরোগজনিত মৃত্যু এবং যার এক-তৃতীয়াংশই ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হৃদরোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১২ শতাংশের জন্য দায়ি তামাক ব্যবহার এবং পরোক্ষ ধূমপান। হৃদরোগের কারণ হিসেবে উচ্চ রক্তচাপের পরেই তামাক ব্যবহারের অবস্থান। তামাক মহামারি প্রতি বছর বিশ্বের ৭০ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। পরোক্ষ ধূমপানে মৃত্যুবরণ করে আরো ৯ লাখ অধূমপায়ী মানুষ। বর্তমানে বিশ্বে মোট তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১ বিলিয়ন, যার ৮০ শতাংশই বসবাস করে নিম্ন বা মধ্যম আয়ের দেশেগুলোতে ।
কেমন আছে বাংলাদেশ?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগজনিত মৃত্যুর ১৭ শতাংশের জন্য দায়ী হৃদরোগ।  স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত হেলথ বুলেটিন ২০১৭ এর তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সময়কালে জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৪১.৩ শতাংশ।  যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দ্য ইন্সটিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (আইএইচএমই)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৬ সময়কালে বাংলাদেশে অকাল মৃত্যুর কারণের তালিকায় হৃদরোগ ৭ম স্থান থেকে ১ম স্থানে উঠে এসেছে এবং এই পরিবর্তনের হার ৫২.৭ শতাংশ। আর এই মৃত্যুর জন্য দায়ি হিসেবে তামাকের অবস্থান ৪র্থ।  গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ৩০ শতাংশের জন্যেই দায়ি ধূমপান।  বাংলাদেশে তামাকের উচ্চ ব্যবহার এই ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। দেশের মোট প্রাপ্তবয়ষ্ক জনসংখ্যার প্রায় ৪৩.৩ শতাংশ (৪ কোটি ১৩ লক্ষ) তামাক ব্যবহার করেন।  টোব্যাকো অ্যাটলাসের (২০১৬) তথ্য অনুযায়ী, মধ্যম সারির মানব-উন্নয়ন সূচকে অবস্থানকারী অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারজনিত রোগে মৃত্যুর হার ২৫.৫৪ শতাংশ বেশি।
করণীয় যা হতে পারে
বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারজনিত হৃদরোগের প্রকোপ ভয়াবহ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তামাককে টেকসই উন্নয়ন অর্জনের পথে অন্যতম বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে ২০৪০ সালের পূর্বেই বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করতে হবে: ক্স    পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপান, তামাকপণ্যের মোড়কে আইন অনুযায়ী সচিত্র সতর্কবার্তা মুদ্রণ, তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন-প্রচারণা ও পৃষ্ঠপোষকতাসহ তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারাসমূহ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন;
ক্স    তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক খসড়া নীতিসমূহ (জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি, তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ নীতি) দ্রুত চুড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়ন;
ক্স    আর্টিক্যাল ৫.৩ এর আলোকে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য কোড অব কন্ডাক্ট তৈরি, বিক্রয় কেন্দ্রে তামাকপণ্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ, খোলা তামাকপণ্যের বিক্রয় বন্ধ, বিদ্যালয়-কলেজের নিকটে তামাকপণ্য বিক্রয় নিষিদ্ধ করে আইন/নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নসহ এফসিটিসি’র আলোকে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে যুগোপযোগী করা;
ক্স    তামাকজাত পণ্যের দাম ক্রমশ জনগণের ক্রয়-ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়া। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী একটি শক্তিশালী তামাক শুল্ক-নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যাতে জনগণের মধ্যে তামাকের ব্যবহার হ্রাস পায় এবং একইসাথে সরকারের শুল্ক আয় বৃদ্ধি পায়। এলক্ষ্যে আসন্ন ২০১৮-১৯ বাজেটে নিম্নলিখিত করপদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে প্রায় ৬.৪২ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছেড়ে দিতে উৎসাহিত হবে এবং সিগারেটের ব্যবহার ২.৭% ও বিড়ির ব্যবহার ২.৯% হ্রাস পাবে। দীর্ঘমেয়াদে ২.০১ মিলিয়ন বর্তমান ধূমপায়ীর অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে। একইসাথে ৭৫ থেকে ১০০ বিলিয়ন টাকা (অথবা জিডিপি’র ০.৪ শতাংশ) অতিরিক্ত রাজস্ব আয় অর্জিত হবে;
ড়    নিম্নস্তরের সিগারেটে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভাজন তুলে দেওয়া এবং উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরকে একত্রে একটি মূল্যস্তরে (উচ্চস্তর) নিয়ে আসা; নি¤œস্তরে ১০ শলাকা সিগারেটের সর্বনি¤œ মূল্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং উচ্চস্তরে ১০ শলাকা সিগারেটের সর্বনি¤œ মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করে ৬৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা; সকল ক্ষেত্রে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটে ৫ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ;
ড়    বিড়ির ফিল্টার এবং নন-ফিল্টার বিভাজন বাতিল করে প্রতি ২৫ শলাকা বিড়ির সর্বনি¤œ মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ এবং ৪৫% সম্পূরক শুল্ক ও ৬ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ;
ড়    ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের করারোপে ‘এক্স-ফ্যাক্টরি প্রাইস’ প্রথা বিলুপ্ত করে প্রতি ২০ গ্রাম ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের সর্বনিম্নমূল্য ৫০ টাকা নির্ধারণ এবং ৪৫% সম্পূরক শুল্ক ও ১০ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ;