বাংলা সিনেমার চিরাচরিত নায়িকাদের মতো নয়। বরং তাঁদের থেকে যেন অনেকটাই আলাদা। অভিনয়ে তো বটেই, পারিবারিক প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে তাঁর শিক্ষাদীক্ষা, মননে— অন্য অনেক নায়িকার থেকেই যেন একটু ভিন্নতর ছিলেন ললিতা চট্টোপাধ্যায়। বুধবার চলে গেলেন ষাটের দশকের সেই নায়িকা। বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। মঙ্গলবার রাতে সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়েছিল। এর পর লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। বুধবার বেলা আড়াইটে নাগাদ হাসপাতালেই মারা যান তিনি।

ললিতাদেবীর শুরুটা হয়েছিল খানিকটা যেন স্বপ্নের মতো। নায়িকা হিসেবে তাঁর প্রথম ফিল্মেই বিপরীতে পেয়েছিলেন ম্যাটিনি আইডল উত্তমকুমারকে। সালটা ১৯৬৪। ‘বিভাস’ নামের সেই ফিল্ম বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ধ্রুপদী জায়গা করে নেয়। তবে এর পর বেশ কয়েকটি ফিল্মে তাঁর কোনও উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল না। পাড়ি দিলেন বম্বে। সেখানেও ছোটখাটো রোল। তবে তাতেও নজর কেড়েছিলেন। ‘রাত অন্ধেরি থি’, ‘আপ কি কসম’, ‘তলাশ’, ‘ভিক্টোরিয়া নম্বর ২০৩’, ‘পুষ্পাঞ্জলি’— ষাট এবং সত্তরের দশকে একের পর এক তাঁর অভিনীত ফিল্মগুলিতে সহ-অভিনেতা হিসেবে পেয়েছেন ফিরোজ খান, মনোজ কুমারদের মতো তারকাদের।

রাজেশ খন্না, তনুজার বন্ধু ললিতাদেবী শুধু বাংলা সিনেমাই নয়, রেডিয়ো বা যাত্রাপালার মতো অন্য মাধ্যমেও কাজ করেছিলেন। বম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে ফের বাংলায় ফিরে আসা। এ বার একেবারে যাত্রায়। সেখানেও তাঁর অভিনয়ে তিনি একটু অন্য রকমের। করেছেন ইন্দিরা গাঁধী থেকে ওফেলিয়ার মতো চরিত্র।

‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-তে উত্তমকুমারের সঙ্গে ললিতা চট্টোপাধ্যায়।

এই বৈচিত্র তাঁর জীবনেও ছিল। কোনও ফিল্মি প্রেক্ষাপট নয়। বরং পারিবারিক সূত্রে বাড়িতে ছিল শিক্ষার আবহ। মাস কয়েক আগে একটি সাক্ষাৎকারে নিজেই জানিয়েছিলেন, ফিল্মে আসার কথা ছিল না তাঁর। ১০ বছর বয়সে অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে প্রথম কাজ করার সুযোগ হয়। ১১ বছর বয়সে প্রথম অভিনয়। কাননদেবীর ছেলেবেলার চরিত্রে। ফিল্মের নাম ‘অনন্যা’।

ললিতাদেবী নিজেই জানিয়েছিলেন, তাঁর নাম আসলে রুণু। তা হলে কী ভাবে ললিতা নাম হল? ‘বিভাস’-এর পর দ্বিতীয় ফিল্মের সেটে কাজের ফাঁকে ডুবেছিলেন ভ্লাদিমির নোবোকভের ‘লোলিটা’-য়। কয়েক জন সাংবাদিক এসে জানতে চান, তাঁকে কী নামে ডাকবেন। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন, ললিতা!

পাকাপাকি ভাবে অভিনয়ে আসার আগে শিক্ষকতাও করেছেন ললিতাদেবী। ইংল্যান্ডের স্কুলে কিছু কাল পড়াশোনা। সেখান থেকে ফিরে বিয়ে সোমু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তখন তাঁর বয়স মাত্র পনেরো। এর পর দুই সন্তানের মা হওয়া। তবে পড়াশোনাটা চালিয়ে গিয়েছেন বরাবরই। প্রাইভেটে ম্যাট্রিকুলেশনে প্রথম হয়েছেন। এর পর লে়ডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট। প্রেসিডেন্সি থেকে স্নাতকোত্তর। সেখানেও প্রথম স্থান পেয়েছেন।

সাম্প্রতিক কালে তাঁকে ফের দেখা গিয়েছিল ২০১৩-য় গৌতম ঘোষের ফিল্ম ‘শূন্য অঙ্ক’-তে। দেখা গিয়েছে আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তর ‘জোনাকি’-তে। করেছেন অরিন্দম শীলের ফিল্ম ‘আসছে আবার শবর’-এ।

ইচ্ছে ছিল আত্মজীবনী প্রকাশ করার। তবে সে ইচ্ছে অপূর্ণই থেকে গেল ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের।