banner

শেষ আপডেট ১৬ অক্টোবর ২০১৮,  ২২:০১  ||   মঙ্গলবার, ১৬ই অক্টোবর ২০১৮ ইং, ১ কার্তিক ১৪২৫

বিএনপির গঠনতন্ত্রে হঠাৎ পরিবর্তন ঈশান কোণে আঁধারের লক্ষণ

বিএনপির গঠনতন্ত্রে হঠাৎ পরিবর্তন ঈশান কোণে আঁধারের লক্ষণ

৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ১২:৩৫ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • বিএনপির গঠনতন্ত্রে হঠাৎ পরিবর্তন ঈশান কোণে আঁধারের লক্ষণ
খবরটি মিডিয়ায় আকস্মিকভাবেই উপস্থিত হয়েছে। সবাই আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের জন্য এক ধরনের অপেক্ষা করছে, একই সঙ্গে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা কী বলছেন, কেমন রায় হলে কেমন প্রস্তুতি নিচ্ছেন—সেটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিএনপি নেতাদের কথাবার্তায় মনে হয়, তাঁরা অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে রায়ে চেয়ারপারসনের কোনো না কোনো দণ্ডাদেশ হতে পারে। এটি অন্তত নেতাদের উত্তেজনাকর বক্তব্য শুনে অনুমান করা যায়। যেখানে একদিকে তাঁরা এটিকে মিথ্যা ও রাজনৈতিক মামলা বলে অভিহিত করছেন, অন্যদিকে তাঁরাই আবার ‘আদালতের রায় আগেই লেখা হয়ে আছে’, প্রধানমন্ত্রী যেমন রায় চাইবেন, তা-ই লেখা হবে, দেওয়া হবে—এমন দাবিও করছেন—এ ধরনের স্ববিরোধী বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েছেন। এমন একটি বহুল আলোচিত এবং অন্যতম প্রধান দলের চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে মামলার রায়কে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এত দিন আমরা বিএনপির বাঘা বাঘা আইনজীবীর বক্তব্য মিডিয়ার মাধ্যমে শুনেছি। তাঁদের মতামত সঠিক হলে রায় নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু দেখি না। কিন্তু ৮ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতা, ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মামলার বিবরণ তুলে ধরা, নেতাকর্মীদের নানা ধরনের কঠোর হুঁশিয়ারি, সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখার আরজি ইত্যাদি উদ্যোগের পাশাপাশি হঠাৎই সংগঠনের সপ্তম ধারার পুরোপুরি পরিবর্তন ঘটিয়ে যে অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে, তাতে রাজনীতি সচেতন মহল ধরেই নিচ্ছে যে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দলের ঈশান কোণে কোনো ভয়ানক ঘনঘটার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছে। সে কারণে তারা দলের সম্মেলন ছাড়াই (বিএনপির গঠনতন্ত্রে মৌলিক কোনো পরিবর্তনের জন্য জাতীয় কাউন্সিলের প্রয়োজন পড়ে না, দলের চেয়ারপারসন এককভাবেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন) গঠনতন্ত্রের পুরোপুরি সপ্তম ধারার চারটি উপধারায়ই পরিবর্তন করা হয়। নতুন গঠনতন্ত্রের ৭খ(৪) উপধারায় দলের চেয়ারপারসনের ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করা হয়।
নতুন গঠনতন্ত্রের ৭খ(৫) উপধারায় দলের চেয়ারপারসন দলের জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভাগুলোয় সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব অন্য কাউকে দিতে পারবেন—৭গ(৩) উপধারায় দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব, কর্তব্য ও ক্ষমতা সম্পর্ক বলা আছে, দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বহাল থাকবেন। এখানে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের বিধানটি জুড়ে দেওয়া হলো। মৌলিক যে পরিবর্তনটি বিএনপির গঠনতন্ত্রের সপ্তম ধারায় আগে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির দলের পদ হারানোর বিধান বিলুপ্ত করা হয়েছে। বিএনপির নেতারা আশঙ্কা করছেন যে ৮ ফেব্রুয়ারির রায়ে তিনি যদি দণ্ডিত হন, তাহলে দলের চেয়ারপারসন দলের গঠনতন্ত্রের সপ্তম ধারা অনুযায়ী দলীয় সদস্য পদই হারাবেন, সে ক্ষেত্রে তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা হারাতে পারেন। বিএনপি নিকট অতীতের ১/১১-পরবর্তী অভিজ্ঞতা থেকে দলে চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে যেহেতু দলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টও দেশে নেই, মামলার রায়ে দণ্ডিত, তাই দলে বড় ধরনের কোনো ফাটল সৃষ্টির আশঙ্কা থেকে এসব সংশোধনীর উদ্যোগ জরুরি ভিত্তিতে নিয়েছে। বিএনপির অবস্থান থেকে দেখলে তারা প্রস্তুতি নিতেই এসব ব্যবস্থা নিয়েছে। বিএনপি গঠনতন্ত্রের ৭ ধারার পাশাপাশি আরো বেশ কিছু পরিবর্তনসহ নতুন সংশোধিত গঠনতন্ত্রের কপি নির্বাচন কমিশনেও জমা দিয়েছে। যদিও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রহুল কবীর রিজভী গঠনতন্ত্রের সপ্তম ধারার পরিবর্তন সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তাঁর জানা নেই বলেছেন, তবে নির্বাচন কমিশনে দলের অপর সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম খানসহ জমা দিতে গিয়েছেন।
বিএনপির সপ্তম ধারায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের সদস্য পদে না থাকার বিষয়টি একসময় প্রশংসিত হয়েছিল। এখন দুর্নীতির দায়ে যদি কোনো ব্যক্তি আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হন, তাঁর সদস্য পদ না হারানোর বিধানটি বিএনপির রাজনীতির জন্য কালো মেঘের বড় ছায়া হয়ে দলের ওপর রেখাপাতই করবে না, আলো ঢেকে দিতে পারে। এখন বিশেষ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে বিএনপি দলের চেয়ারপারসনের সদস্য পদ রক্ষার জন্য এমন সংশোধনী আনতে হয়তো বাধ্য হয়েছে; কিন্তু ভবিষ্যতে এটিই দলকে গ্রাস করতে পারে, তখন বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। আসলে আমাদের দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ মনে হচ্ছে কালো গহ্বরেই প্রবেশ করেছে। রাজনীতিতে দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি, নেতার বিষয়টি এমনিতেই বহুল আলোচিত, প্রভাব বিস্তারকারী গোষ্ঠী বলেও স্বীকৃত। সাড়ে চার থেকে অন্তত তিন দশক আগেও যা ছিল অনেকটাই ঘৃণিত, প্রত্যাখ্যাত; গত তিন দশকে তাতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। রাজনীতিতে দুর্বৃত্ত, দুর্নীতিপরায়ণদের কর্তৃত্ব কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তা সবার কাছেই জানা বিষয়। একসময় তো দুর্নীতিবাজদের নিয়েই দল গঠিত হয়েছে; উগ্র, দল ও আদর্শত্যাগী হঠকারী ও পরিত্যাজ্য আদর্শের ধারকদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রে’র বুলি আওড়িয়ে। কিন্তু কার্যত রাজনীতিতে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র উদারবাদ, জাতীয়তাবাদ ও অর্থনৈতিক সাম্যবিরোধী শক্তিকেই সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে রাজনীতির মূলধারার শক্তিকে অবদমনের সব নীতি-কৌশল প্রয়োগ করা হয়। দেশ কার্যত আদর্শবিরোধী শক্তির জন্য উর্বর পলিমাটি পেতে থাকে। এরাই সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতির সর্বত্র প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে। গত তিন দশকে বাংলাদেশে এসব শক্তির প্রভাব শুধু ডানের শক্তিকেই নিয়ন্ত্রণের সব ক্ষমতা ও শক্তি অর্জন করেনি, মধ্যম পন্থাকেও কবজায় নিতে সক্ষম হয়। ফলে প্রান্তিক বামের উচ্ছেদ ঘটেছে; মধ্যম উদারপন্থা ও সুবিধাবাদ, আদর্শহীন, ভোগবাদ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে।
বিএনপির গঠনতন্ত্রের সর্বশেষ সংশোধনী সুবিধাবাদী ও দুর্নীতিবাজদের দ্বারা দেশের রাজনীতির মধ্যম-ডানদের অপসারণের মাধ্যমে নেতৃত্বকে গ্রাস করার সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, পুরো দলের আত্মসমর্পণ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এর প্রভাব মধ্যম উদারপন্থার ওপরও অচিরেই পড়তে পারে; সংগঠন, রাজনীতি, আদর্শ—প্রায় একই ধারায় অতীতের মতো অদূর ভবিষ্যতেই আত্মসমর্পণ করতে পারে। পাল্লার একদিক যখন ভারসাম্যহীনভাবে নেমে যায় তখন অন্য পাল্লায়ও ভারসাম্য রক্ষার নামে যা ওঠানো হয়, তা আসলেই নকলশক্তির উত্থান ছাড়া আর কিছু নয়। ১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে আদর্শ হটানোর নীলনকশা বানরের পিঠা ভাগাভাগির অপকৌশলেই মার খেয়েছে, দুর্বল হয়েছে; সেই জায়গায় সুবিধাবাদ, দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা গোষ্ঠীর উত্থানকে ক্রমাগতভাবে জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, অর্থবিত্ত ও শক্তিতে এরা সর্বময় হওয়ার মাধ্যমে এখন ডান, বাম, মধ্যম—রাজনীতির সব দিকেই তাদের কর্তৃত্ব প্রসারিত করে চলছে। তাদের উত্থান যে দক্ষিণ পন্থার বিএনপির হাত ধরে হয়েছে, সেটিকে এখন পুরোপুরি কবজায় নেওয়ার মাধ্যমে তারা মধ্যম-বাম, উদার ও মূলধারার শক্তির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মরণকামড় দিতে পারে। সেখানেও তাদের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষাকারী শক্তির অবস্থান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংহত অবস্থায় আছে।
সুতরাং মূলধারার আদর্শের রাজনীতির শক্তিগুলোকে এখনই সচেতন হতে হবে বিএনপির গঠনতন্ত্রের সপ্তম ধারার পুরোপুরি বিলোপ ঘটানোর পেছনের শক্তি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে। শুধু তা-ই নয়, দেশের রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রশাসন—সর্বত্র আদর্শের সংকট কাটিয়ে ওঠার উপায় উদ্ভাবন করতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্নীতিপরায়ণ ও দণ্ডিতদের নির্বাচনে সুযোগ দেওয়ার বিধান বিএনপির গঠনতন্ত্রে আনার বিষয়টি দেশের রাজনীতিতে নতুন অশনিসংকেত হিসেবেই দেখছি। বিএনপির আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যাওয়ার পর অন্যদেরও গ্রাস করার সংকেত হিসেবেই দেখছি। এখনই সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ না নিলে পরিণতি সবার জন্যই ভয়াবহ হতে পারে।
লেখক : মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়