banner

শেষ আপডেট ২০ এপ্রিল ২০১৯,  ১৮:৪৮  ||   বুধবার, ২৪ই এপ্রিল ২০১৯ ইং, ১১ বৈশাখ ১৪২৬

জঙ্গিমুক্ত দেশ চাই

জঙ্গিমুক্ত দেশ চাই

২৭ ডিসেম্বর ২০১৫ | ১৫:৩৫ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • জঙ্গিমুক্ত দেশ চাই

ইসহাক খান :
চাইলেই সব কিছু পাওয়া হয় না। তার জন্য সবার সহযোগিতা ও আন্তরিকতা দরকার। দেশজুড়ে সেটারই তীব্র অভাব। নতুন করে দেশে জঙ্গি তত্পরতা শুরু হয়েছে। শুরু না বলে বলা যায় বেড়েছে। বিশেষ করে কয়েকজন বিদেশি নাগরিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। সেই সঙ্গে দেশের মুক্তমনা ব্যক্তিদের হত্যা ও হত্যার হুমকি মানুষকে কিছুটা হলেও আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায় ঘটনাগুলো একই ধরনের। কাজের ধরন দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় সব কাজই একই গোষ্ঠীর কারসাজি। এর মধ্যে বেশ কিছু ঘাতক ধরা পড়েছে। তারা অনেকে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা স্বীকার করেছে, তারা জেএমবির সক্রিয় সদস্য। ঘটনার শুরু ইতালীয় নাগরিক তাভেল্লাকে হত্যার মধ্য দিয়ে। তারপর জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে। তারপর এ-জাতীয় ঘটনা চলতেই থাকে। মাজারে খাদেম হত্যা। বাউলদের আয়োজককে হত্যা। মন্দিরের পুরোহিতকে হত্যার চেষ্টা। গির্জার যাজককে হত্যার চেষ্টা—সবই যেন একই সুতায় গাঁথা। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর দিন রাজশাহীর আহমদিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট যে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো। যে কয়জন জেএমবির জঙ্গি ধরা পড়েছে তার বেশির ভাগকেই জনতা ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছে। পাবনার একজন মা তাঁর নিজের ছেলে জেএমবির সদস্য জানার পর তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। এখানে পুলিশের কোনো কৃতিত্ব নেই বললেই চলে।

পাবনার যে মায়ের কথা বলা হলো তাঁর নাম আজমিরা খাতুন। বাড়ি পাবনা সদর উপজেলার মজিদপুর গ্রামে। তিনি যখন জানতে পেরেছেন তাঁর ছেলে জঙ্গি খাতায় নাম লিখেছে, তিনি আর স্থির থাকতে পারেননি। মায়ের স্নেহ ভুলে তিনি দেশমাতৃকার রূপ ধারণ করেছেন। ছেলেকে কৌশলে ডেকে এনে গোপনে পুলিশে খবর দিয়ে তাদের হাতে নিজের বুকের ধনকে তুলে দিয়েছেন।

ইসকন মন্দিরে হামলার এক আসামি শরিফুল ইসলাম। সে দিনাজপুর শহরের খ্রিস্টান ধর্মযাজক পিয়েরো পিচমকে গুলি করার ঘটনায় জড়িত বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে শরিফুল বলেছে, সে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্য। সে আরো বলেছে, গত ১৮ নভেম্বর সকালে ধর্মযাজক পিয়েরো পিচমকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। ওই ঘটনায় এক মোটরসাইকেলে তিনজন অংশগ্রহণ করে। শরিফুল ইসলাম ছিল মোটরসাইকেলের চালক। ঘটনা ঘটিয়ে তারা দিনাজপুর ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। তিন সপ্তাহ পর তারা আবার দিনাজপুর ফিরে এসে কাহারোলে মন্দিরে হামলা চালায়।

১০ ডিসেম্বর রাতে দিনাজপুরের কাহারোলে ইসকন মন্দিরে গুলি ও বোমা হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে শরিফুল। পরদিন একটি একে-২২ রাইফেলসহ জনতার হাতে ধরা পড়ে মোছাব্বের নামের আরেকজন। পরে পুলিশ জানায় তারা দুজনই জেএমবির সদস্য।

ব্যাপারটি তাহলে অত্যন্ত পরিষ্কার যে পুলিশের এখানে কোনো ভূমিকা নেই। জনতা তাদের ধরিয়ে না দিলে পুলিশ তাদের টিকিটি ছুঁতে পারত কি না সন্দেহ। এ-ই যদি হয় আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, তাহলে জনগণ কার কাছে আশ্রয় চাইবে?

এখন প্রশ্ন হলো, হঠাৎ করে বিদেশি ও নিরীহ-নিরপরাধ লেখক-প্রকাশককে হত্যা করতে জেএমবি এতটা উন্মত্ত হয়ে উঠল কেন? শুধু হত্যাই নয়, তারা বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে চিঠি ও মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে ত্রমাগত। প্রখ্যাত লেখক হাসান আজিজুল হক, ড. আনিসুজ্জামানসহ আরো অনেকের নামে তারা হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এর রহস্য কী? কী পাবে তারা? এভাবে মানুষ হত্যা করে কি তারা তাদের আদর্শ কায়েম করতে পারবে? নাকি সরকার পরিবর্তন করতে পারবে? তাহলে তাদের উদ্দেশ্য কী?

সোজা কথায় তারা বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে সারা পৃথিবীর কাছে পরিচিত করতে চায়। তাতে তাদের কোনো লাভ নেই। লাভ হবে তাদের গডফাদারদের। তারাও গডফাদারদের ইশারায় এসব করে যাচ্ছে। আর এর জন্য গডফাদাররা মোটা অঙ্কের টাকা ঢালছে তাদের পেছনে। যেমন ঢালছে বাইরের দেশে লবিস্ট নিয়োগ করে, তেমনি ঢালছে এই জঙ্গিদের পেছনে। জঙ্গিরা নিজেরা মানুষ খুন করে প্রচার করছে আইএসের নামে। বোঝাতে চাইছে এ দেশে আইএস আছে। আর আমাদের সরকার তাদের কথায় কান দিয়ে অযথা চিত্কার করছে এ দেশে আইএস নেই। এসব বলার তো কোনো প্রয়োজন নেই। সরকারকে কাজে বুঝিয়ে দিতে হবে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, সরকার কাজের চেয়ে আওয়াজ দিচ্ছে বেশি। তাকে বুঝতে হবে তার ঘরে-বাইরে শত্রু। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে মৌচাকে ঢিল ছোড়া হয়েছে। তাকে নানাবিধ সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু সেই বোধের কাছে না গিয়ে যদি তারা শুধু আওয়াজ দিয়ে বেড়ায়, তাতে জঙ্গিদেরই লাভ হবে। হচ্ছেও তা-ই। এরই মধ্যে জঙ্গিরা সেই লাভ কিছুটা হলেও ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তারা চেয়েছিল দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে। সে কাজে তারা কিছুটা হলেও সফল হয়েছে।

আমরা চাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বলিষ্ঠ ভূমিকা। শুধু মুখে মুখে জিরো টলারেন্স বললে হবে না। জিরো টলারেন্স কাজে প্রমাণ করতে হবে। কাজটি খুব সহজ সেটা বলা ঠিক হবে না। আবার খুব যে কঠিন তা-ও কিন্তু ঠিক নয়। আমরা দেখেছি বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে সাধারণ নাগরিকরা ধরিয়ে দিয়েছে। সাধারণ নাগরিকরা যদি জঙ্গি পাকড়াও করতে পারে, তাহলে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পারবে না কেন? তাহলে কি আমরা ধরে নেব এ কাজ তাদের?

আন্তরিকতার অভাব, নাকি দক্ষতার অভাব? তা-ই বা বলি কী করে? নিরস্ত্র জনগণ যদি জঙ্গিদের পাকড়াও করতে পারে, তাহলে তারা সশস্ত্র হয়েও জঙ্গিদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারবে না কেন?

আমরা বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবটা আড়ালে রেখে নিজেদের মতো জনগণকে সচেতন ও সতর্ক থাকার বিষয়ে ভাবতে পারি। পরিবার, সমাজ, সব দিক থেকে যদি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়—আমার বিশ্বাস, জঙ্গিরা এ দেশে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। তাই নিজেদের কাজ নিজেদেরই করতে হবে। জঙ্গি নির্মূল শুধু রাষ্ট্র ও সমাজকে নিরাপদ করা নয়, ধর্মকেও নিরাপদ করার ব্যাপার। জঙ্গিরা পবিত্র ধর্ম ইসলামের নামে যা করছে তা শুধু ইসলামের ভাবমূর্তিই ধ্বংস করছে না, ইসলামের শাশ্বত বাণীকে তারা প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে। তাদের অনৈতিক ও ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে ইসলামকে রক্ষা করা প্রত্যেক ইমানদার মুসলমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি ও প্রয়োজনীয় কাজ। সেই কাজে এগিয়ে আসা দেশের প্রত্যেক নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব।

লেখক : গল্পকার, টিভি নাট্যকার