banner

শেষ আপডেট ১৫ জুন ২০১৯,  ১৯:২৩  ||   সোমবার, ১৭ই জুন ২০১৯ ইং, ৩ আষাঢ় ১৪২৬

আচরণবিধি ভঙ্গ রোধে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা

আচরণবিধি ভঙ্গ রোধে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা

২৭ ডিসেম্বর ২০১৫ | ১৫:৩১ |    নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আচরণবিধি ভঙ্গ রোধে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা

এ এম এম শওকত আলী :

কয়েক দিন ধরে পৌরসভার নির্বাচন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক ধরনের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এসব তথ্যের মধ্যে প্রধান ছিল আচরণবিধি ভঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতার করুণ দৃশ্যপট। এক. আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ তদন্তে ধীরগতি। দুই. ক্রমাগত এ ধরনের বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের কারণে একটি দৈনিক প্রশ্ন করেছে নির্বাচন কমিশন কি অসহায়? প্রথমোক্ত বিষয়ে জানা যায় যে অভিযুক্তদের মধ্যে মন্ত্রী ও হুইপও রয়েছেন। আরো জানা যায় যে বিধি ভঙ্গের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কমিশন বা মাঠপর‌্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যে একেবারেই হাত গুটিয়ে বসে রয়েছেন তা নয়। কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানাও করেছেন। তবে ধারণা করা যায় যে অভিযোগের আধিক্যের তুলনায় তা অতি নগণ্য। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি মনে রাখা প্রয়োজন তা হলো, রিটার্নিং অফিসাররা ইচ্ছা করলেই তাত্ক্ষণিক কোনো অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে ক্ষমতাবান নন। তাত্ক্ষণিক শাস্তি শুধু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দিতে সক্ষম। তা না হলে শাস্তি তাত্ক্ষণিকভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়েও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু দুর্বলতা রয়েছে। যেমন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যার স্বল্পতা। এ ছাড়া রয়েছে মোবাইল কোর্টকে সহায়তা প্রদানের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি। এ বিষয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা অতীতে অনেক অভিযোগ করেছেন এই বলে যে পুলিশের সহযোগিতা তাঁরা সময়মতো পান না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। অন্যথায় ম্যাজিস্ট্রেটসহ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হবে। এ ক্ষেত্রে যে অতীতে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে সে তথ্য কারো অজানা নয়।

তদন্তে ধীরগতির বিষয়ের সঙ্গে ওপরে বর্ণিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাই অন্যতম প্রধান কারণ। এ কারণেই বিধিতে বর্ণিত নিয়ম পালন করা অনিবার্য হয়ে পড়ে। এ নিয়মের মধ্যে রয়েছে এক. অভিযোগের লিখিত বিবরণ; দুই. অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ; তিন. নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তের জবাব পর‌্যালোচনা; চার. প্রয়োজনে সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ এবং পাঁচ. এ বিষয়ে রায় লেখা ও ঘোষণা করা। এ প্রক্রিয়া যে সময়সাপেক্ষ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জানা গেছে, গত সপ্তাহে ৫০ জন রিটার্নিং অফিসারকে কমিশন আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়ে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ লিখিতভাবে দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার পর্যন্ত ১৮ জন রিটার্নিং অফিসার এ বিষয়ে কমিশনের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। আরো জানা গেছে যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে রিটার্নিং অফিসাররা অভিমত প্রদান করেছেন। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে পাল্টা অভিযোগ করেছেন। তাঁদের মতে, নির্বাচনের প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন উত্তর পাঠানোর কোনো সময় বেঁধে না দেওয়ার কারণেই বিলম্ব হচ্ছে। তবে তদন্তপ্রক্রিয়া যে সময়সাপেক্ষ তা বলা হয়নি। বিষয়টি তাদের অজানা নয়। অবশ্য সময়সীমা উল্লেখ করলে তদন্ত প্রতিবেদন ত্বরান্বিত করা সম্ভব ছিল। এ কথাও জানা গেছে যে অনেক প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। এ জন্য কমিশন অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কমিশনের মত হলো, রিটার্নিং অফিসাররা এ বিষয়ে আন্তরিক নন। এ মন্তব্যের সপক্ষে কিছু প্রমাণও প্রকাশ করা হয়েছে। ৩ ডিসেম্বর তথ্যমন্ত্রী ও ধর্মমন্ত্রী ফুলপুর পৌরসভার প্রচারণা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেছেন মর্মে অভিযোগ ছিল। রিটার্নিং অফিসার প্রতিবেদনে বলেছেন যে উভয় মন্ত্রী শোভাযাত্রায় বক্তব্য দিয়েছেন; কিন্তু মেয়র প্রার্থীর পক্ষে কোনো কথা বলেননি। এ যে অনেকটা খোঁড়া যুক্তি, তা বোঝা যায়। কারণ বিধি অনুযায়ী এ পর‌্যায়ের ব্যক্তিরা কোনো প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন না। অন্য একটি বিষয় নিয়েও নির্বাচন কমিশন কিছুটা বিপাকে। তা হলো হাইকোর্ট একটি মামলার রায়ে ২০০ জন মেয়র-কাউন্সিলর প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণার বিষয়ে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। অতীতে এত অধিকসংখ্যক প্রার্থীর বিষয়ে মামলা হয়নি। কমিশন এ বিষয়ে উচ্চতর আদালতে আপিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। গত মঙ্গলবার অর্থাৎ ২২ ডিসেম্বর একটি দৈনিকে বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে একজন নির্বাচন কমিশনারের ভিন্নমত ছিল। তাঁর মতে, আপিল করা হলে নির্বাচনী জটিলতার সৃষ্টি হবে। কারণ নির্বাচন মাত্র আট দিন পরে। এ সময়ের মধ্যে উচ্চতর আদালত আপিল নিষ্পত্তি করতে পারবেন কি না সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।

স্মরণ করা যেতে পারে, অতীতে ও এবারও নির্বাচন পরিচালনায় ডেপুটি কমিশনারদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব প্রদানের বিপক্ষে অনেকেই অভিমত দিয়েছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল যে ডেপুটি কমিশনাররা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে সক্ষম নন। এ কারণে কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদেরই এ দায়িত্ব দেওয়া শ্রেয়। কমিশন এ অভিমত গ্রহণ করেনি। তার যুক্তি ছিল কমিশনের সব কর্মকর্তাই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট অভিজ্ঞতার অধিকারী নন। এ কারণে কিছু ডেপুটি কমিশনার ও কমিশনের কিছু কর্মকর্তাকে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। যে ২০০ জন প্রার্থীকে হাইকোর্ট যোগ্য ঘোষণা করেছেন তাঁদের অযোগ্য হওয়ার বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, রিটার্নিং অফিসার ও ডেপুটি কমিশনাররা প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে তাঁদের অযোগ্য ঘোষণা করেছেন। এ থেকে বোঝা যায় না কতজন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা ও কতজন ডেপুটি কমিশনার। এ সংখ্যার তুলনামূলক চিত্র পাওয়া গেলে কোন শ্রেণির রিটার্নিং অফিসার পক্ষপাতদুষ্ট তা বোঝা যেত। এ ক্ষেত্রে ভারতের চিত্র বিপরীতধর্মী। ওই দেশে সরকারি কর্মকর্তারাই অর্থাৎ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেটরাই রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি কমিশনের আঞ্চলিক পর‌্যায়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাও রয়েছেন। পক্ষপাতদুষ্টের বিষয়ে কোনো অভিযোগ যে হয় না তা নয়। এ ধরনের অভিযোগ হলে নির্বাচন কমিশনই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বাংলাদেশে অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু কোনো সমাধান কেউ দিতে পারেনি। তবে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে জনমনে যে সন্দেহ রয়েছে তার উৎস হলো প্রশাসনকে রাজনৈতিকীকরণ। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, সে যে দলেরই হোক না কেন, এ বিষয়ে যদি সচেতন হয়, তাহলেই এ সন্দেহ দূর হবে।

প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায় যে কমিশন কিছুসংখ্যক ওসির বিষয়েও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তিন জেলার এসপিদের তিনজন ওসির আচরণ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। এর আগে তিনজন ওসিকে প্রত্যাহার করারও নির্দেশ দিয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত মাঠপর‌্যায়ে কার্যকর করা হয়েছে কি না তা অবশ্য জানা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পক্ষে অনৈতিক বা বিধিবহির্ভূত কাজ করার বিষয়টি অনেকাংশে আপেক্ষিক। সরকারি কর্মচারী আচরণবিধিতে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিষয়টি কেউ মানেন, কেউ মানেন না। যাঁরা মানেন না তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কমিশন এককভাবে নিতে সক্ষম নয়। কারণ সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধি ভঙ্গের জন্য এ বিষয়ে শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়া একমাত্র সরকারই করতে পারে। এ জন্য কমিশনকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়। এ প্রক্রিয়াও দীর্ঘ। কমিশন যা করতে পারে তা হলো, অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার। এ ধরনের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর অবশ্যই কার্যকর করে। আচরণবিধি ভঙ্গের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা প্রতিরোধ করতে কমিশন অনেকাংশে ব্যর্থ হয়, যদিও কিছু সংসদ সদস্যকে কমিশন সতর্ক হওয়ার বাণী পাঠিয়েছে। কমিশনের অসহায় হওয়ার প্রমাণও প্রকাশ করা হয়েছে। এ ধরনের অশুভ প্রবণতা রোধে শেষ পর্যন্ত কমিশন প্রধানমন্ত্রীর ‘হস্তক্ষেপ’ কামনা করে। ২১ ডিসেম্বর এ সংবাদ প্রকাশ করা হয়। তবে কমিশনের একজন কমিশনার এহেন উক্তি করেন। পূর্ণাঙ্গ কমিশন নয়। বক্তব্যটি হলো : ‘আমরা সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে আরো দায়িত্বশীলতা আশা করি। এ বিষয়ে আমরা সরকারের সহায়তা কামনা করি। সরকারপ্রধানকে অনুরোধ জানাই তিনি যেন এ বিষয়টি দেখেন।’

সংবাদমাধ্যমে নির্বাচন আচরণবিধি ভঙ্গের ক্রমাগত ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর ২৪ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায় যে ২৬ জন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কমিশন। ঠিক পরের দিনই সংবাদ সূত্রে জানা যায় যে মাত্র দুজনের বিরুদ্ধে কমিশন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ সংবাদ যদি সঠিক হয়, তাহলে দুটি বিষয় বলা যেতে পারে। এক. কমিশন শেষ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে বাকি ২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে মনে করে এবং দুই. কমিশন সূত্রে প্রকাশ পূর্ববর্তী সংবাদ পূর্ণাঙ্গ কমিশনের ছিল না। স্মরণ করা যায় যে অতীতেও এ ধরনের ঘটনা বিরল ছিল না। শেষোক্ত বিষয়টি কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারই পরিচয় দেয়, যা বিভ্রান্তিমূলক। এর একমাত্র কারণ আগে থেকেই ব্যক্তিগত ধারণাকে কমিশনের সামষ্টিক সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রকাশ করা। এর ফলে কমিশনের ভাবমূর্তি যে ক্ষুণ্ন হচ্ছে সে বিষয়টি ভেবে দেখা হয় না।