banner

শেষ আপডেট ২৬ জুন ২০১৯,  ২১:১৬  ||   বৃহষ্পতিবার, ২৭ই জুন ২০১৯ ইং, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬

বেলুচিস্তানে গণহত্যা চলছে : বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হোক!

বেলুচিস্তানে গণহত্যা চলছে : বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হোক!

২১ নভেম্বর ২০১৬ | ১৮:০১ |    নিজস্ব প্রতিবেদক

রণেশ মৈত্র : পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতন কতটা নিষ্ঠুর কতটা বর্বর কতটা অমানবিক ও
নির্মম হতে পারে, বাঙালি জাতিই সম্ভবত: তা সর্বাপেক্ষা বেশি জানে। সেই
১৯৪৭ এর আগস্ট থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর তাদের রাজত্বের শেষ দিনটি শেষ
মুহূর্তটি পর্যন্ত আমরা তা দেখেছি। তার উপযুক্ত জবাবও বাঙালি জাতি
দিয়েছে। ২৩ বছরব্যাপী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনজীবনের নানা
দাবিতে, বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জাতীয়
আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি ন্যায় সঙ্গত দাবিতে তীব্র
গণ-আন্দোলন করেছে। রাজনৈতিক নেতা, হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী ছাত্র
আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর চলেছে বিরামহীন নির্যাতন। একের পর এক
সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, তাদের ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
১৯৫০ সালে সাতজন কমিউনিস্ট নেতাকে রাজশাহী জেলে এ অত্যাচারের ফিরিস্তি
বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না।বিশ্ববাসীর অজানা নেই, ১৯৪৮ এ ভাষা আন্দোলনের
পর শত শত ছাত্র যুবকর্মীকে বিনাবিচারে কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছিল
-১৯৫২ সালে ঐ আন্দোলন তীব্রতা অর্জন করলে ঢাকার রাজপথে মিছিলরত
শান্তিপূর্ণ সুশৃঙ্খল আন্দোলনকারীদেরকে নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা
করার মর্মান্তিক ঘটনাও তারা ঘটিয়েছিল।১৯৭১ এ ৯ মাসব্যাপী সশস্ত্র
মুক্তিযুদ্ধে পরিচালনাকালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তাদের বাংলাদেশি
দোসরেরা মিলে যে ভয়াবহ গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, অপহরণ, লুটপাট চালিয়েছিল তা
এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। পাকিস্তানি সরকার ও
সেনাবাহিনীর হাত রক্তরঞ্জিত, তাদের মন ও আচরণ নিষ্ঠুর অমানবিক সম্পূর্ণ
মানবতাবিরোধী বিবর্জিত।সেদিন জানতাম, বাঙালিদেরকেই শুধুমাত্র তারা তাদের
শত্রু মনে করে। আজ জানতে পারছি। পাকিস্তানের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সব
জাতিসত্তাকেই সেখানকার পাঞ্জাবি শাসক ও শোষকগোষ্ঠী একই দৃষ্টিতে দেখে এবং
তাদের প্রতি তাদের ব্যবহারও সমপরিমাণ নিষ্ঠুর। কিছুদিন ধরে বিভিন্ন
সূত্রে জানতে পারছি- পাকিস্তানের অন্যতম ক্ষুদ্র প্রদেশ বেলুচিস্তানের
মানুষেরা যাদের মাতৃভাষা বালুচ- দীর্ঘদিন যাবৎ পাকিস্তানের পাঞ্জাবি
বাহিনীর হাতে অমানবিক নিষ্ঠুরতায় নির্যাতিত হচ্ছেন। স্মরণে রাখা প্রয়োজন,
বেলুচিস্তানের মানুষ অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন, প্রগতিশীল এবং
ধর্মনিরপেক্ষতার অনুসারী। তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকেও নানাভাবে সমর্থন
জানিয়েছিল।বেলুচিস্তান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল- তাই পাকিস্তানি
সামরিক বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন তাদের ওপর অনেক বেশি। সিন্ধু এবং
পাখতুনিস্তানও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিল তখন বেলুচিস্তান ও
সীমান্ত প্রদেশে (পাখতুনিস্তান) ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতৃত্বাধীন
সরকার ক্ষমতাসীন ছিল তবে কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী ঐ সরকার দুটিকে ভুট্টোর
প্ররোচনায় বাতিল করে দেয়। আমার মনে আছে ন্যাপের সম্মেলন উপলক্ষে (নিখিল
গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন) পশ্চিম পাকিস্তত্মানের সব প্রদেশ থেকেই
অসংখ্য প্রগতিশীল নেতাকর্মী ঢাকায় আসেন। কেউ প্লেনে কিন্তু বিপুলসংখ্যক
আসেন ট্রেনে। আমরা তখন ঢাকার ফুলবাড়ী রেলস্টেশনে তাদের স্বাগত জানাই।
ট্রেন থেকে নেমেই তারা সেস্নাগান দেন ‘মাশরেকী আউর মাগরেবি পাকিস্তান কি
আওয়ামী কি ইত্তেহাদ’ অর্থাৎ ‘পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ঐক্য
জিন্দাবাদ’। সেটা ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসের শেষ দিককার খবর। বেলুচিস্তান
থেকে দুজন প্রথম সারির নেতা গউস বখ্স্ বেজেঞ্জো ও খায়ের বখ্স মারী
কর্মীদেরকে নিয়ে এসেছিলেন। এরা ছিলেন জাতীয়তাবাদী প্রগতিশীল নেতা।১৯৭০-এর
নির্বাচনে পাকিস্তান গণ-পরিষদে বেলুচিস্তানের সবকটি এবং প্রাদেশিক
পরিষদেরও সব আসনে ন্যাপ জয়ী হয়ে গউস বখ্স্ বেজেঞ্জোর নেতৃত্বে সরকার গঠন
করেছিলেন তেমনি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও ঐ নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ
সংখ্যাধিক্য পেয়ে ন্যাপ সভাপতি খান আবদুল ওয়ালী খানের নেতৃত্বে সেখানে
সরকার গঠন করেছিল ন্যাপ। পূর্ব বাংলার বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ পাঞ্জাবে
পিপল্স পার্টি, সিন্ধে জিয়ে সিন্ধ (যতদূর মনে পড়ে) এবং ফ্রন্টিয়ার ও
বেলুচিস্তানে ন্যাপ। পাঞ্জাব বাদে অপরাপর প্রদেশে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন দিয়েছিল।’সংবাদ’ এর বার্তা সম্পাদক তখন তোয়ব
খান- আর আমি ছিলাম পাবনার সংবাদদাতা। তোয়ব ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে
বেলুচিস্তানের দুই নেতা গউস বখ্স বেজেঞ্জো ও খায়ের বখ্স মারীর সাক্ষাৎকার
নিয়েছিলাম ঢাকার গ্রিন হোটেল থেকে ‘সংবাদ’ এর জন্য। রীতিমত লম্বা
ইন্টারভিউ। ‘সংবাদ’ এ তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ওতে ছিল ঐ
প্রদেশের রাজনৈতিক ও সমাজজীবনের প্রগতিশীলতার নানা অজানা চিত্র। আজ সেই
বেলুচিস্তানের অল্প কিছু লোককে পাকিস্তানের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা
আইএসআই জঙ্গিপনায় উদ্বুদ্ধ করেছে, প্রশিক্ষণ দিয়ে সশস্ত্র করেছে এবং
সেখানকার সব প্রগতিশীল শক্তির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে।বেলুচিস্তান থেকে
অতি সম্প্রতি পাওয়া কিছু তথ্য এবং শান্তিপ্রিয় বেলুচাবাসীর ওপর পরিচালিত
পাকিস্তানের নির্যাতনের করুণ কাহিনীর কিছু অজানা তথ্য পাঠক-পাঠিকার
অবগতির জন্য নিচে তুলে ধরছি : ফারজানা মজিদ ও মামা কাদির কোয়েটার শহর
থেকে ইসলামাবাদের জাতিসংঘ কার্যালয় পর্যন্ত এক লংমার্চে নেতৃত্ব দেন।
তাদের উদ্দেশ্য গুম হয়ে যাওয়া বেলুচদের উদ্ধারে পাকিস্তান সরকারকে বাধ্য
করতে জাতিসংঘের নজরে দাবিটি উত্থাপন করা। ফারজানার ভাই স্বয়ং কয়েক বছর
যাবৎ গুম হয়ে আছে এবং অন্তত্মত আরও ২০,০০০ বেলুচির জীবনে একই অত্যাচার
নেমে এসেছে। তারাও গুম। এদের মধ্যে ৬,০০০ বেলুচকে পরবর্তী সময়ে হত্যা করা
হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে এবং তাদের দেহ হেলিকপ্টার যোগে নিয়ে অজানা স্থানে
পুঁতে রাখা হয়েছে। খনন করা হয়েছে গণকরব। এমন কি এ ব্যাপারে পাকিস্তানের
সুপ্রিমকোর্টের মন্তব্য প্রকাশ হলে জানা গেল যে মাননীয় বিচারপতিরা এই
‘ঘটনাকে বাধ্যতামূলক নিরুদ্দেশ বা অপহরণ’ বলে উল্লেখ করলেও সরকার তাদের
উদ্ধারে বিন্দুমাত্র পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।মানবাধিকার কর্মী ফারজানা আরও
বলেন, ‘তাদের লংমার্চ ছিল সুবিচার, স্বাধীনতা ও প্রিয়জনদের উদ্ধারের দাবি
সংবলিত এবং যাদেরকে গুম করা হয়েছে তাদের পরিবার-পরিজনরাই ছিলেন ঐ
লংমার্চের আয়োজন। তিনি বলেন, আক্ষরিক অর্থেই হাজার হাজার বেলুচ রাজনৈতিক
নেতাকর্মী মানবাধিকার কর্মী বেলুচ বেসামরিক জনগণ ও সাধারণ সচেতন
নাগরিকদের নিরাপত্তা কর্মী, ইসলামী জঙ্গিরা এবং জিহাদপন্থিরা সন্ত্রাসী
কর্মকা- পরিচালনা করছে।এই জাতীয় অপহরণ বেলুচিস্তানে চালানো হচ্ছে ১৯৪৮
সাল থেকে যখন শাসকগোষ্ঠী নিষ্ঠুরভাবে বেলুচিস্তান দখল করে নেয়। বেলুচ
জনগণের স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করতে ধর্মীয় উগ্রবাদী পাকিস্তানি
সেনাবাহিনী এবং সন্ত্রাসীরা সম্মিলিতভাবে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে আসছে।
তাদেরকে যেন লাইন্সে দেয়া হয়েছে যখন খুশি যে কোন বালুচকে মারতে, খুন
করতে, ধর্ষণ করতে কোন বাধা নেই। যে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল
শিক্ষার্থীদেরকে অপহরণ করা হয়েছে তাদের মধ্যে ১৩ বছর বয়স্ক মজিদ জেহারির
পচা-গলা দেহ উদ্ধার হয় ২০১০ সালের অক্টোবর তারিখে, নাদির বালুচের
নির্যাতিত দেহ ১৪ জানুয়ারি, ২০১২; ওয়াহিদ বালাচ বালুচের অত্যাচারিত ও
পচা-গলা দেহ উদ্ধার হয় ২০১২ সালে ২ এপ্রিলে, মীর খান মারির মৃতদেহ উদ্ধার
হয় ২০১১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারিতে (মীর খানের বয়স ছিল ১৫); ১৭ বছর বয়স্ক
আরাফাত বালুচের দেহ ২০১১ সালে ৬ অক্টোবর; ১৮ বছর বয়স্ক আরজ মুহাম্মদ
পিরকানীর দেহ উদ্ধার হয় ২০১০ সালের ২১ আগস্ট ইত্যাদি। কলেবরের দিকে
তাকিয়ে এই অপহরণ, নির্যাতন ও উদ্ধারকৃতদের তালিকার বর্ণনা দীর্ঘায়িত করা
থেকে বিরত থাকলাম।তবুও সংক্ষেপে নির্যাতিতের মোট প্রাপ্ত সংখ্যাগুলোর
উল্লেখ করে রাখছি। বেলুচিন্তান নিয়ে পাকিস্তানে এখন বড্ড বেকায়দায়।
সেখানে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ এখন সে দেশের সংবাদ মাধ্যমেই প্রকাশিত
হয়েছে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী গত ছয় বছরে বেলুচিস্তান থেকেই প্রায় ১,০০০
মানুষের গুলিবিদ্ধ দেহ উদ্ধার হয়েছে। যেগুলো অধিকাংশই ছিন্নবিচ্ছিন্ন।
তার মধ্যে ৫১% বেলুচ, ২২% পাখতুন। পাঞ্জাবি আফগান শরণার্থীদের দেহও
মিলেছে। অনেক মৃতদেহই শনাক্ত করা যায়নি। সন্ত্রাসী কার্যকলাপ রুখতে গত
বছর একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করে ইসলামাবাদ। সেই কাজে নিযুক্ত জনৈক
আধিকারিকই সমীক্ষাটি সামনে এনেছেন। দেখা গিয়েছে বেলুচিস্তানের বিভিন্ন
জায়গা থেকে ৯৪০টির বেশি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত
কয়েকটা জেলা থেকে উদ্ধার হয়েছে ৩৪৬টি দেহ- নিখোঁজ ১১২ জন। ২০১১ সালে
এলাকা নিয়ে অশান্তির জেরে পরিকল্পনা মাফিক ঠা-া মাথায় হত্যাকা- চালানো
হয়। তাতে এখন পর্যন্ত ১৮৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে- গত কয়েক বছরের
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে আহত হন প্রায় ৪,০০০।বেলুচিস্তান থেকে গত কয়েক
বছরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিহত ৪৯টি দেহ উদ্ধার হয়েছে- পাখতুন ১৫৯-
কালটি থেকে ২৬৮টি দেহ উদ্ধার করা গেছে। ১৭৫টি দেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এমন ভয়াবহ নির্মমতা চালাচ্ছে পাকিস্তানের পাঞ্জাবি সেনা ও মৌলবাদ।
বেলুচরা বলছেন ১৯৭১ এ পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালিদের ওপর যেমন অত্যাচার
চালিয়েছিল আজ পাঞ্জাবিরা তাদের ওপর তেমনই অত্যাচার চালাচ্ছেন। কয়েক দশক
যাবৎ ছাত্র, আইনজীবী, শিক্ষক এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন নেতাকর্মীরাই মূলত:
এই হত্যালীলার শিকার।ফলে প্রতিবাদস্বরূপ ফারজানাসহ হাজার হাজার মানুষ
ইতিহাসের লংমার্চ অভিযান চালান কোয়ের্টার শাল এলাকা থেকে শুরু করে
বালুচিস্তানের রাজধানী। যেখান থেকে সিন্ধু প্রদেশের রাজধানী করাচি এবং
করাচি থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ পর্যন্ত দীর্ঘতম পথ তারা
পদযাত্রায় অতিক্রম করেন শুধু ঐ অত্যাচারের অবসানের দাবিতে। পাকিস্তানি
মিডিয়ায় তা তেমন একটা প্রকাশ করতে দেয়া হয়নি। এমন কি, পাকিস্তানের যে সব
বুদ্ধিজীবী ঐ আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন- তাদেরও
রেহাই দেয়া হয়নি। অত্যাচার আজ নির্মমতার ভয়াবহতম পর্যায়ে পেঁৗছেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই গণহত্যা বন্ধে ও তার বিচার দাবিতে
আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলে সহমর্মিতা জাগাবেন এটাই প্রত্যাশা।(সংগৃহীত)