banner

শেষ আপডেট ২ জুলাই ২০১৭,  ২০:১২  ||   সোমবার, ২৫ই সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং, ১০ আশ্বিন ১৪২৪

রোহিঙ্গা সমস্যা: ইন্দিরা গান্ধী যেখানে সফল শেখ হাসিনা সেখানে ব্যর্থ :: দি ক্রাইম :: অপরাধ দমনে সহায়ক ::

রোহিঙ্গা সমস্যা: ইন্দিরা গান্ধী যেখানে সফল শেখ হাসিনা সেখানে ব্যর্থ

২৯ নভেম্বর ২০১৬ | ২০:১৯ |    নিজস্ব প্রতিবেদক

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী : বদ্বীপ এই বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই দুই পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশীদেশের সমস্যায় আক্রান্ত। একদিকে ভারতের আধিপত্যবাদী কৃষ্ণথাবা, সীমান্ত-সমস্যা আর অন্যদিকে বার্মার আরাকান প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর বর্মী সরকারের নির্যাতনহেতু বাংলাদেশে অনুপ্রবেশোত্তর শরনার্থী হিসাবে বসবাস এদেশের স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বলাবাহুল্য, ১৯৮২ সালে বার্মার সামরিক সরকার নতুন নাগরিকত্ব আইন করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের অনাগরিক ঘোষণা করে সকল নাগরিক-অধিকার কেড়ে নিলে রোহিঙ্গা-সমস্যার মূল অধ্যায় শুরু হয়। যা হোক, এখন সেই সমস্যার সবচেয়ে মর্মান্তিক ও অমানবিক পরিণতি পরিগ্রহ করছে। দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশের নীতি ছিলো নির্যাতিত
রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত উম্মুক্ত রাখা এবং এই ভূখণ্ডে তাঁদের আশ্রয় দেয়া। ফলে আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানরা নির্যাতিত হলে অধিকতর নির্যাতন এড়াতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে পারতো। বর্মী সামরিক সরকারও বাংলাদেশের এই
মানবিক সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারের প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতো যেন তাঁরা আরাকান ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসে। আন্তর্জাতিকমহলও বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয় নি। সরকার পরিবর্তনের পালায় আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ক্ষমতায় এলে শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা-আশ্রয়ের নীতি থেকে সরে আসে। ফলে, আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমরা নির্যাতনের শিকার হয়ে এখন আর বাংলাদেশে ঢুকতে পারছে না। এমন
পরিস্থিতিতে একদিকে রোহিঙ্গাদের উপর বর্মী সরকারের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরতম গণহত্যা, ধর্ষণ ও অপহরণের সমকালিন দৃ্ষ্টান্ত এবং অপরদিকে শেখ হাসিনা সরকারের সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গাদের ঢুকতে বাধা দেয়া থেকে ইতিহাসের
এক অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্মী সেনাবহিনীর নির্যাতনে দেশান্তরী রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকতে না পেরে নাফ নদীতে, সাগরবক্ষে অনাহারে-অর্ধাহারে ভাসছে; অভুক্তশিশুদের ক্রন্দনে ভারী হয়ে আছে আকাশ; ধর্ষিতানারীদের
কাতর আর্তনাদ তৈরি করেছে এক নতুন কারবালা। বাংলাদেশের সীমান্ত-বাহিনী যাদের পুশব্যাক করছে কেউ জানে না তারা বেঁচে আছে কিনা। এমন পরিস্থিতিতে দেশ-বিদেশ ও জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সংস্থা থেকে রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে শরনার্থী হিসাবে আশ্রয় দেবার আহ্বান জানানো হলেও শেখ হাসিনা সেই আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন না। তিনি সাম্প্রতিককালে কাতারভিত্তিক সংবাদসংস্থা আলজাযিরার সাথে এক সাক্ষাতকারে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন: এই সমস্যা বার্মার আভ্যন্তরীণ, বাংলাদেশের নয়। তিনি কোনভাবেই রোহিঙ্গাদের এদেশে ঢুকতে দিতে নারায। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা মুসলিমসমাজ বর্মী বৌদ্ধদের অবাধ হত্যা-নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিকমহলেও  লাদেশের এমন ভূমিকায় সমালোচিত হচ্ছে।
এখন এই বিষয়টি নিয়ে আমরা একটি ঐতিহাসিক ঘটনার ছায়ায় পর্যালোচনা করতে পারি। ঘটনাটি ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। বর্তমান বার্মা সরকারের হাতে রোহিঙ্গাদের নির্যাতিত হওয়ার সাথে ৭১-এর ঘটনার অনেকটাই মিল পরিলক্ষিত হয়। সেদিন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী তৎকালিন পূর্বপাকিস্তানী জনসাধারণের উপর ঠিক বর্মী বাহিনীর মতোই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো।
রোহিঙ্গাদের মতো আমাদের জানমাল, নারী, শিশু, যুবা, বৃদ্ধ কেউই রেহাই পায় নি। আমাদের বাড়িঘরও জ্বালিয়ে দেয়া হয়। নিখোঁজ হয় অসংখ্য ভাই-বেরাদর। কতো  নারী তাঁদের সম্ভ্রম হারায় তার পরিসংখ্যান ছিলো না। রোহিঙ্গাদের মতো
আমরাও হয়েছিলাম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অবাধ শিকার। তবে ভিন্নতা ছিলো অন্যখানে। আজকের আরাকানের প্রতিবেশীদেশের যেমন একজন নারী সরকার-প্রধান ছিলেন তেমনি এই নির্যাতিত পূর্বপাকিস্তানের প্রতিবেশীদেশ ভারতের সরকার প্রধান ছিলেন মিসেস ইন্দিরা গান্ধী। তার সম্পর্কে যারা জানতেন তারা স্বীকার করেছেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইন্ধিরা গান্ধীর বিজ্ঞতা ছিলো পরীক্ষিত। তিনি সেদিনকার প্রতিবেশীদেশের অশান্ত পরিস্থিতিকে
বুঝতে পেরেছিলেন তার প্রাজ্ঞতা দিয়ে যা শেখ হাসিনার মতো অনভিজ্ঞ ও অসচেতন নারীর পক্ষে বর্তমান পরিস্থিতিকে বোঝা সম্ভব হয় নি। ইন্দিরা গান্ধী সেদিন অত্যন্ত সচেতনভাবে পূর্বপাকিস্তানের নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে সীমান্ত পেরিয়ে
ঢুকে আশ্রয় নিতে দিয়েছেন; শরনার্থী শিবির গড়ে তাতে এদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। শুধু তাই নয়, সেদিন ইন্দিরা গান্ধী এদেশের নির্যাতিত মানুষদেরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আন্তর্হাতিকমহলের কাছে। পাকিস্তান সরকারের জুলুম-নির্যাতনের চিত্র নিয়ে তিনি তার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। পাকিস্তানী শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সমর্থন জোগাড় করেছেন। এসব দিক বিবেচনায় ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানী শাসকবর্গের চেয়ে অনেক বেশি বিজ্ঞতা আর পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন। এবং পরবর্তীতে সেনা পাঠিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ইতিহাস এই সত্যকে স্বীকার করে নিয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইন্দিরা গান্ধীর এই দৃষ্টান্তকে ব্যবহার করতে পারেন নি আঞ্চলিক ও  ন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রবলভাবে অপরিপক্ষ শেখ হাসিনা। তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছেন, আশ্রয়প্রার্থীদেরকে জোর করে অমানবিকভাবে পুশব্যাক করে দিচ্ছেন।
সর্বোপরি এই সমস্যাকে বার্মার আভ্যন্তরীণ সমস্যা বলে উল্লেখ করে চরম ভুল করেছেন যা ১৯৭১-এ ইন্দিরা গান্ধী করেন নি। শেখ হাসিনা যদি এই ভুল না করে ঠিক ইন্দিরা গান্ধীর দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে এগিয়ে
যেতেন তাহলে দেশের ভেতরে এবং বাইরে বিশাল একটা নাম্বার পাওয়ার সুযোগ পেতেন যা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতো।
ইতিহাসও তাকে সেভাবে স্মরণ করতো। কিন্তু ঘটনা তেমনটা ঘটে নি। তাই শেখ হাসিনা তার বিজয়লাভে একটি নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয়ে পরাজয়ের দ্বাপ্রান্তে চলে গেছেন। ইতিহাসও তাকে ক্ষমা করবে না। অন্তত রোহিঙ্গা
মুসলিমসমাজের আগামী প্রজন্মের কাছে তিনি থাকবেন একজন খল-নায়িকা হয়ে।
ইতিহাস বলবে যেখানে ইন্দিরা গান্ধী সফল হয়েছেন শেখ হাসিনা সেখানে ব্যর্থ আর পরাজিত হয়েছেন।

 

Leave a Reply